চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ইভিএমে ভোট : কী বলছেন চট্টগ্রামের ভোটাররা?

প্রকাশ: ২০১৮-১১-২৭ ১২:০১:২৫ || আপডেট: ২০১৮-১১-২৭ ২০:৩৭:৪১

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনসহ দেশের ছয়টি আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দেয়া নিয়ে চট্টগ্রামের ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বিশেষ করে তরুণ ও নবীন ভোটাররা প্রযুক্তির সহায়তায় ভোট দেয়া নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও অধিকাংশ বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটার এ ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। খবর জাগোনিউজ

চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে হাইভোল্টেজ আসন এই কোতোয়ালি (চট্টগ্রাম-৯)। সিলেটের মতো চট্টগ্রামেও কথা চালু আছে, ‘কোতোয়ালি আসন যারা জেতে, তারাই সরকার গঠন করে’। এখনও এর স্বাভাবিক পুনরাবৃত্তি চলছে।

১৯৯১ সাল থেকে পাঁচ দফা নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমান দু’বার বিজয়ী হয়েছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ মান্নান (প্রয়াত)। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন নুরুল ইসলাম বিএসসি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু এমপি নির্বাচিত হন।

সিটি কর্পোরেশনের ৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম–৯ সংসদীয় আসনটি গঠিত। এই আসনে ১৪৪টি ভোট কেন্দ্রে মোট দুই লাখ ৩৯ হাজার ৯১৪ জন ভোটার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট দেবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩০ হাজার ১৪৭ এবং নারী ভোটার এক লাখ নয় হাজার ৭৬৭ জন।

নগরের পোর্ট সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা মাসুকুর রহমান বলেন, ‘এর আগে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম, তবে সেটা ব্যালটে। এবার আমাদের (কোতোয়ালী) আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হবে। দেশে ডিজিটাল হয়েছে তাই ভোটের সিস্টেমও ডিজিটাল হবে এটাই স্বাভাবিক। এখন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছি ৩০ ডিসেম্বরের জন্য।’

তবে অধিকাংশ বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটাররা ইভিএম নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ইভিএমে ভোট নেয়ার আগে যথেষ্ট প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের দাবি করেছেন তারা।

নগরের আন্দরকিল্লা এলাকার হেমসেন লেনের বাসিন্দা মিলন কান্তি দে বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে নগরবাসী পুরোপুরি অন্ধকারে। পত্রিকা থেকে জেনেছি জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড ছাড়াও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তার আঙুলের ছাপে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যালট ইস্যু করতে পারবেন? এই অবস্থায় ভোট যে শতকরা শতভাগ নির্ভেজাল থাকবে, তার নিশ্চয়তা কী ?’

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক দিদারুল আলম নগরের নন্দনকানন এলাকার বাসিন্দা। নিজের জীবনে তিনটি সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বলেন, ‘একজন ভোটার ব্যালটে সিল মারার পর নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেন ভোটটি তার পছন্দের প্রার্থীই পাচ্ছেন। কিন্তু প্রথমবার ইভিএমে ভোট দিয়ে একজন ভোটারের মনে প্রথম প্রশ্ন হবে,তার প্রার্থী ভোটটি পাচ্ছেন তো? ঠিকঠাক মতো পছন্দের ব্যক্তিকে ভোট দেয়ার পরেও ভোটটা গেল কই সেটা বুঝতে না পারার কারণে তার মনে সন্দেহ কাজ করবে।’

একই এলাকার নারী ভোটার জেসমিন আরা। তিনি বলেন, ‘কাগজের ভোট দিতে গিয়েও আমাদের নানা ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হয়। ইভিএমে প্রথম প্রথম ভুল হবে সেটা নিশ্চিত। তাই এর আগের সিটি নির্বাচনে যদি এ আসনে ইভিএমে ভোট নেয়া হতো, তাহলে ভালো হতো। কনফিডেন্সের অভাবে অনেক ভোটার নিজের ভোট দিতে বেশি সময় নেবেন। এতে ভোটগ্রহণ বিলম্বিত হতে পারে। সবকিছুর পরেও আমি ইভিএমে ভোট গ্রহণের পক্ষে। কারণ একটা না একটা সময় এই সিস্টেমে আমাদের যেতেই হবে। আশা করি, নির্বাচন কমিশন পর্যপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেবেন।’

ব্যাংক কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম চট্টগ্রাম-৯ আসনে ভোটার হলেও তিনি এখন থাকেন নগরের চাঁদগাও আবাসিক এলাকায়। তিনি বলেন, ‘আমার মতো অনেক ভোটার আছে যারা কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনের ভোটার হলেও গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন করণে নগরের বিভিন্ন স্থানে বা গ্রামে থাকছেন। তাই ভোটারদের ইভিএম বিষয়ে ধারণা দিতে নির্দিষ্ট আসনের পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন এলাকায় কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে।’

এদিকে চট্টগ্রামের এই আসনে ইভিএমে ভোটের কথা বলা হলেও নগর বিএনপির নেতারা এ সীদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে যে ইভিএম ব্যবহার করেছে তাতেও কোনো জায়গায় ইভিএম কখনও কখনও বন্ধ হয়ে গেছে। একজনের ভোট আরেকজন দিয়েছে। কোথাও ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালট পেপারেও ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে হয়েছে। এ ছাড়া ইভিএমে সহজেই কারসাজি করা যায়। প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারা চাইলে নিজের বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে ভোটার ছাড়াও ইভিএমকে ভোটদানের উপযোগী করতে পারে। ফলে অসাধু প্রিজাইডিং/সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের মাধ্যমে যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে সহজেই ভোট কাস্ট করা সম্ভব।

তবে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট দেয়ার পক্ষে। কোতোয়ালী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। ভারতেও বেশ কয়েকটি নির্বাচন ইভিএমের মাধ্যমে হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ৬টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ হবে। আসনগুলো হলো ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, খুলনা-২, রংপুর-৩ ও সাতক্ষীরা-২। গতকাল সোমবার (২৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন ভবনে লটারির মাধ্যমে এই ছয়টি আসন নির্ধারণ করা হয়।

ইভিএমে ভোট দেবেন যেভাবে :

এই পদ্ধতিতে প্রথমে আঙ্গুলের ছাপ, ভোটার নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা স্মার্ট পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভোটার শনাক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোটকক্ষে একজন করে ভোটার ভেরিফিকেশন করেন পোলিং অফিসার। ডাটাবেজে ভোটার বৈধ হিসেবে শনাক্ত হলেই ভেরিফিকেশনের সঙ্গে যুক্ত প্রজেক্টের মাধ্যমে তা পোলিং এজেন্টের কাছে দৃশ্যমান হবে।

মেশিনটিতে কুইক রেসপন্স কোড কিউআর কোডসহ আরও কিছু তথ্য সম্বলিত টোকেন মুদ্রণ করে ভোটারকে দেয়া হয়। এরপর ভোটার ওই টোকেন নিয়ে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে যাবেন। তিনি ভোটিং মেশিনের কিউআর কোড স্ক্যানারের মাধ্যমে শনাক্ত করে গোপন কক্ষে থাকা তিনটি পদের জন্য ব্যালট ইউনিটে ব্যালট ইস্যু করবেন।

এবার ভোটার তার পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীক দেখে বাম দিকে বোতামে চাপ দিয়ে সিলেক্ট করবেন এবং ওই ব্যালট ইউনিটের সবুজ রংয়ের কনফার্ম বোতাম চেপে তার ভোট শেষ করবেন।

কখনো ভুলবশত কোনো প্রতীক সিলেক্ট করা হলে, ব্যালট ইউনিটের লাল রঙয়ের ক্যানসেল বোতাম চেপে পরবর্তীতে যেকোনো প্রার্থীকে আবার সিলেক্ট করা যাবে। এভাবে দুইবার ক্যানসেল করা যাবে, তৃতীয়বার যেটি সিলেক্ট করা হবে সেটি বৈধ ভোট হিসেবে গৃহীত হবে।