চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮

দুই নেতার দ্বন্দ্বে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় দিশেহারা জামায়াত!

প্রকাশ: ২০১৮-১১-২৪ ১৩:৩৩:১৭ || আপডেট: ২০১৮-১১-২৫ ১২:৩০:৫০

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর ফল বলছে, এখানে বিএনপি ও জামায়াত ভোটের হিসেবে এগিয়ে আছে। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বয়কট করায় ১৯৭৩ সালের পর আবার আসনটি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। 

একাদশ সংসদ নির্বাচনে (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আওয়ামী লীগ থেকে আটজন, বিএনপিতে চার ও জামায়াতের দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। সাতকানিয়ার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও লোহাগাড়ার ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-১৫ আসনটি গঠিত। এ আসনে ১০টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুইবার, বিএনপি তিনবার, জামায়াত তিনবার ও জাতীয় পার্টি দুইবার জয়লাভ করেছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) প্রার্থিতা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন জামায়াতে ইসলামীর হেভিওয়েট দুই নেতা। তারা হলেন- কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক নায়েবে আমির শাহজাহান চৌধুরী। কারাগারে থেকেও ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ছড়াচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানো জামায়াতের গুরত্বপূর্ণ এই দুই নেতা। দলীয় প্রার্থিতা নিয়ে এই দুই সাবেক এমপির বিরোধের জের ধরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও।

সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক থাকায় এ আসনে বেশ দাপট রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত ধর্মভিত্তিক দলটির। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী নির্বাচনে এই আসনটি দখলে নিতে চায় জামায়াত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১০ ও ১৬ আসন নিয়েও ছক কষছে জামায়াত। শামসুল, শাহজাহানসহ দলটির তিনজন নেতা স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থিতার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছেন।

জামায়াতের রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকারের আমলে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরুর পর বাংলাদেশের কোথাও জামায়াত ইসলামীর নেতাদের মধ্যে এত বিরোধ তৈরি হয়নি। কোথাও বিরোধ হলেও সেটা প্রকাশ্যে আসেনি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের দুই নেতার এই বিরোধ জামায়াতকে আরও সংকটে ফেলেছে।

চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে তিনটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোলেও চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে জামায়াত আশাবাদী। এই আসনে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত থাকায় দলীয় প্রার্থী সহজে জয়ী হতে পারবেন বলে ধারণা তাদের। তাই এই আসনে ছাড় দিতে নারাজ শামসুল ও শাহজাহান। বিষয়টি নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের কপালেও।

জামায়াতপন্থি বুদ্ধিজীবী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, ‘জামায়াতের জন্ম পাকিস্তানে। একই নামে একই আদর্শের দল বিশ্বের আরও অনেক দেশে আছে। ভিন্ন নামে একই আদর্শের দলও আছে। কোথাও জামায়াতের মধ্যে এই ধরনের নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের ইতিহাস নেই। বিরোধটা যদি চট্টগ্রামের দু’জন নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে সংকট বেশি হতো না। কিন্তু সেটা কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে। জামায়াত এমনিতেই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। এই অবস্থায় বিরোধ সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, শামসুল-শাহজাহানের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েও সুফল মেলেনি। সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় শামসুলকে একক প্রার্থী হিসেবে নিশ্চিত করতে শাহজাহান চৌধুরীকে চট্টগ্রাম-১০ আসনে (হালিশহর-ডবলমুরিং) প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু দলের এ সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নন শাহজাহান। ছাড় দিতে চান না শামসুলও। চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা জামায়াতের পদধারী অধিকাংশ নেতা শামসুলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পদবিহীন অধিকাংশ নেতাকর্মী আবার শাহজাহানের পক্ষে। কারাগার থেকে নিজ নিজ অনুসারীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে ভোটের মাঠে অনড় অবস্থানের জানান দিচ্ছেন দুই নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জামায়াত নেতা জানান, শাহজাহান চৌধুরী দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় শামসুল ইসলামকে দিয়ে নির্বাচন করানো হয়। তখনও শাহজাহান চৌধুরী মাঠে থেকে তাঁকে বিজয়ী করান। কিন্তু শামসুল ইসলাম এই আসনে নিজেকে স্থায়ী করার জন্য তাঁর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে শাহজাহান চৌধুরীকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার দলীয় কর্মকাণ্ডে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর সাবেক এই দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শামসুল ইসলামের পাশাপাশি শাহজাহান চৌধুরীও মনোনয়ন চাইবেন।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আমার গড়া মাঠ। নেতাকর্মীরা চায় আমি ভোট করি। দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। তবে দল মনোনয়ন না দিলে নির্বাচন করব না।’

দুই নেতার দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির জাফর সাদেক বলেন, সাংগঠনিকভাবে চট্টগ্রামের তিনটি আসনে প্রার্থিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শামসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১০ আসনে শাহজাহান চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৬ আসনে (বাঁশখালী) জহিরুল ইসলাম জামায়াতের প্রার্থী হবেন। সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল ফয়েজও দলীয় এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাফর সাদেক বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষে কারা দুটি আসনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, তা জানা নেই।

এদিকে, গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিভিন্ন এলাকায় আগাম নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে পোস্টারিং শুরু করেন শাহজাহান। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানও ওই আসনে প্রার্থীতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সর্বশেষ ওই আসন থেকে প্রার্থিতার জন্য বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির প্রভাবশালী দুই নেতা মাঠে থাকায় ওই আসনের আশা ছেড়ে দিয়ে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় প্রার্থী হওয়ার জন্য শাহজাহান চৌধুরী তোড়জোড় শুরু করেছেন বলে মনে করেন জামায়াতের সংশ্নিষ্ট নেতাকর্মীরা।

লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় সর্বমোট ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা রয়েছে। আসনটিতে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮ শ’৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩ হাজার ৭ শ’৩ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ১ শ’ ৬ জন।

আরো……