চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

‘চট্টগ্রামে হবে আধুনিক ট্যানারি ও স্বতন্ত্র চামড়া শিল্প অঞ্চল ’

প্রকাশ: ২০১৮-১১-২২ ২০:৫৪:০০ || আপডেট: ২০১৮-১১-২৩ ১৩:৪৭:৩৮

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার পুনরায় নির্বাচিত হলে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে আধুনিক ট্যানারি ও স্বতন্ত্র চামড়া শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।

সরকার ইতোমধ্যে শিল্পাঞ্চলের উপযোগী স্থান নির্ধারণে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল পুনঃনির্বাচিত হলে চামড়া শিল্পাঞ্চল ও ট্যানারি নির্মিত হবে।

বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ লেদার ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডস ইন্টারন্যাশনাল সোর্সিং শো’ উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা চামড়া শিল্প নেতৃবৃন্দকে বলেন, আমি নির্বাচিত হলে শিল্পাঞ্চল ও ট্যানারি নির্মাণ করব। অন্যথায় আপনারা নিশ্চিত করবেন যে নতুন সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

প্রধানমন্ত্রী নবনির্মিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রত্যেকটিতে বিশেষ করে চামড়া শিল্পের জন্য একটি করে স্থান রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শুভাশিষ বসু, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারাস অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সফিউল ইসলাম ।

দেশে বিভিন্ন চামড়া শিল্প গড়ে তোলায় ব্যবসায়ীদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে, যেগুলো তারা তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে ফিনিশিং দিয়ে মার্কেটে দিচ্ছে।

তিনি চামড়া ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই কাজগুলো যেন আরো ভালভাবে করা যায় আপনারা তা খেয়াল রাখবেন। এজন্য যা কিছু সহযোগিতা দরকার, আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে, আমরা তা করবো।

সরকার প্রধান বলেন, ‘এই সেক্টরটিকে আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সেই সম্ভাবনাটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। সেইদিকে দৃষ্টি দিয়েই আমাদের সবরকম ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি রপ্তানি বাস্কেট বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘সব সময় আপনাদের মাথায় রাখতে হবে আরো কোন কোন দেশে আমরা রপ্তানি করতে পারি। কোন দেশের চাহিদা কি, কোথায় আমরা আমাদের রপ্তানিটা বাড়াতে পারি। তাহলে আমাদের উৎপাদনও যেমন বাড়বে, দেশের মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে, ব্যবসায়ীদের ব্যবসা এবং রপ্তানি উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।’

‘এজন্য আমাদের বাজেটও বাড়াতে হবে এবং প্রণোদনাও দিতে হবে,’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার নিজেরা ব্যবসা করে না বরং ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।’

তিনি জানান, এই বিষয়ে ইতোমধ্যেই তার সরকার সকল দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারদের বাংলাদেশে ডেকে তাদের করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক সময় কূটনীতি ছিল পলিটিক্যাল আর এখন হয়ে গেছে ইকোনমিক্যাল। কি ধরনের বিনিয়োগ আমাদের দেশে আসতে পারে সেটাকেই খুঁজে নিয়ে আসা এবং সেভাবেই কাজ করতে হবে।’

তার সরকার রপ্তানির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত যে চারটি খাতের উন্নয়নে ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার মধ্যে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্প অন্যতম।

রাজধানীর হাজারীবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছিটিয়ে থাকা ট্যানারি শিল্পসমূহকে একটি পরিবেশবান্ধব জায়গায় স্থানান্তরের জন্য ঢাকার সাভারে ধলেশ্বরীর নদীর তীরে ২০০ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে ১১৫টি ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। তবে, এটাকে আরো আধুনিকায়ন করা দরকার।

এ সময় চামড়া সংগ্রহে কসাইদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্যোগী হবার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাহলে সংগ্রহকালে একটি বড় অংশ যে নষ্ট হয়ে যায়, তা আর নষ্ট হতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে আনা জার্মান ব্র্যান্ড পিকার্ডের তৈরি চামড়ার ভ্যানিটি ব্যাগ দেখিয়ে বলেন, এটি বাংলাদেশে তৈরি এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকেও তিনি এটা দেখিয়েছেন যে, এসব পণ্যও বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। তিনি বিদেশে যেখানেই যান এসব বাংলাদেশি পণ্য সাথে করে নিয়ে যান বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের জনগণ অনেক মেধাবী একটু প্রশিক্ষণ দিলেই তারা সুন্দর কাজ করতে পারে, বিশেষ করে মহিলারা চমৎকার হাতের কাজ করতে পারে। কাজেই এভাবে ব্র্যান্ডগুলোকে আমরা আরো সুন্দর রূপ দিতে পারি।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, দেশে আরো বেশি বেশি পাদুকা শিল্প গড়ে উঠুক, দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ড এখানে আসুক, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসুক এর ফলে একদিকে আমাদের যেমন কর্মসংস্থান হবে অন্যদিকে যারা কাজ করাবেন তারা অত্যন্ত সস্তা শ্রমে এবং সুন্দর পরিবেশে কাজটা করিয়ে নিতে পারবেন।

বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করে এখানকার ব্যবসায়ীরা বিশ্বে একটি বিরাট বাজার সুবিধা পেতে পারেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা যাতে বেশি করে এদেশে আসে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে এবং বিমানগুলোতে রিফুয়েলিং করে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত পরিদর্শন করে সেজন্য তার সরকার কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে সম্প্রসারিত এবং আন্তর্জাতিক মানের করছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের খণ্ডচিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮৬ ভাগে উন্নীত করেছি। দেশে আভ্যন্তরীণ বাজার যেমন সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আমরা ইতোমধ্যে কানেকটিভিটি সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছি। যার ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশাল বাজারেও আমাদের প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি সুবিধা এবং বিভিন্ন দেশের ডিউটি ফ্রি এবং কোটা ফ্রিতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার থাকারও উল্লেখ করে বলেন, ‘এইভাবে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আমাদের প্রচেষ্টা শুভফল দেশের মানুষ যেমন পাচ্ছে তেমনি আপনারা ব্যবসায়ীরাও পাচ্ছেন।’

তার সরকার দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের কর্মক্ষম যুবসমাজই আমাদের সবথেকে বড় শক্তি। যে কারণে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুমুখিকরণ করে যুবকদের প্রশিক্ষিত করে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তার সরকারের সময় দেশে একের পর এক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিটাইম ও ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং টেনিক্যাল ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে সময়ের প্রয়োজনটা জেনে নিয়ে সেভাবে আমাদের হালনাগাদ হওয়ার দরকার।’

তিনি বলেন, আমি এক্ষেত্রে আহবান জানাব, আমাদের ব্যক্তি খাতগুলোও যেন আরো বেশি করে এগিয়ে আসে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগটা সরকারের পাশাপাশি তারাও যেন গ্রহণ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যুব সমাজকে একটি দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। কারণ, আমাদের তরুণ মেধাবী যুবশক্তিকে একটু সুযোগ করে দিলে তারা নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলে তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারে।

তথ্যসূত্র : বাসস