চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮

নীতিমালা অনুমোদনের পরও ‘অবৈধভাবেই’ চলছে রাইড শেয়ারিং সেবা

প্রকাশ: ২০১৮-১১-২১ ২২:৫৬:৫৭ || আপডেট: ২০১৮-১১-২২ ১২:২০:২৫

সরকার ‘রাইড-শেয়ারিং’ নীতিমালা অনুমোদন করার পর এক বছর হতে চললেও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় একটি কোম্পানিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তালিকাভুক্তির সনদ পায়নি। খবর বিডিনিউজ

ফলে অল্প দিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো অবৈধভাবেই ঢাকার রাস্তায় চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। স্মার্টফোন অ্যাপনির্ভর এই সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগও দিন দিন বাড়ছে।

উবার, স্যাম, পাঠাওয়ের মত কয়েকটি কোম্পানি ২০১৬ সালে যখন ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা দেওয়া শুরু করল, তখন এ ধরনের সেবার কোনো নীতিমালা দেশে ছিল না। কিন্তু যানজট আর গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শহর ঢাকায় মোবাইল অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি ‘রাইড-শেয়ারিং’ নীতিমালা সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

ব্যবসা শুরুর আগে ‘রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নামে বিআরটিএ থেকে ‘এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’ এবং মোটরযানের মালিকের নামে ‘রাইড শেয়ারিং মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয় সেখানে।

বিএরটিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, নীতিমালা হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১২টি কোম্পানি এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছে, তবে একটিও তা পায়নি।

কোম্পানির তালিকাভুক্তি না হওয়ায় যানবাহনকেও রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে না। আবার কয়েকটি কোম্পানি ব্যবসা চালিয়ে গেলেও নিবন্ধনের আবেদনই করেনি।

আবেদন করা রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- উবার বাংলাদেশ লিমিডেট, পাঠাও লিমিটেড, সহজ লিমিটেড, চাল ডাল লিমিটেড, আকাশ টেকনোলজি লিমিটেড, গোল্ডেন রেন লিমিটেড, ওভাই সলিউশনস লিমিটেড, রাইডার রাইডশেয়ার ইনক লিমিটেড, পিকমি লিমিটেড, ইজিয়ার টেকনোলজিস লিমিটেড, আকিজ অনলাইন লিমিটেড এবং কম্পিউটার সিস্টেম নেটওয়ার্ক লিমিটেড।
বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান, আবেদন পাওয়ার পর তারা এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু নীতিমালার শর্ত পূরণ করতে না পারায় কোনো কোম্পানিকে তারা এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট দিতে পারেননি।

নীতিমালা অনুযায়ী রাইড শেয়ারিং অ্যাপে এসওএস সুবিধা চালু না করা, চালকের হালনাগাদ তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না করা, কল সেন্টার পুরোপুরি চালু না হওয়া এবং ডেটা সার্ভার বাংলাদেশে না থাকার মত কারণে এনলিস্টমেন্ট আটকে আছে বলে জানিয়েছেন তারা।

এ অবস্থায় সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে একটি চিঠি দিচ্ছে বিআরটিএ। ওই চিঠির খসড়ায় বলা হয়েছে, এনলিস্টমেন্ট না হওয়ায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো ‘অবৈধভাবেই’ সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

নিবন্ধন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে সেবা দিচ্ছে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব-এ-রব্বানী বলেন, নীতিমালা চালু হওয়ার আগেই রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হয়ে গেছে। মানুষও তাদের গ্রহণ করেছে।

“তারা চলছে, কারণ আমরা কিছু বলছি না। সরকার কিছু বলছে না, যেহেতু এটা মানুষের প্রয়োজন। এ কারণে হয়তো তাদের একটু সময় দিচ্ছে।”

পূরণ হয়নি শর্ত
‘রাইড শেয়ারিং’ নীতিমালায় বলা আছে, সেবাদানকারী প্রতিটি কোম্পানির অ্যাপে ‘এসওএস’ সুবিধা রাখতে হবে। কোনো ভুক্তিভোগী যাত্রী এসওএস মেনু স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে মোটরযান চালক এবং যাত্রীর তথ্য এবং যাত্রীর অবস্থানের জিপিএস কোঅর্ডিনেটস স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাবে জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে।

এছাড়া প্রতিটি ট্রিপ যেন পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সরাসরি দেখা যায়, সে ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে নীতিমালায়। পুলিশ এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর যৌথভাবে এ কাজটি করার কথা। কিন্তু কোম্পানিগুলো এখনও তা শেষ করতে পারেনি বলে বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান।

নীতিমালা অনুযায়ী, রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা কোম্পানি চালকের হালনাগাদ সব তথ্য সংরক্ষণ করবে। তাদের ‘যাচাইকৃত’ জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপিও রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তথ্যভাণ্ডারের সহায়তা নিয়ে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা কোম্পানি তথ্য যাচাইয়ের কাজটি করবে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন গত ২৫ অক্টোবর বিআরটিএকে একটি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট হওয়ার পর তারা বিআরটিএ এবং রাইডশেয়ারিং সেবাদাতা কোম্পানিকে চালকের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের সুযোগ দেবে, তার আগে নয়।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানির কল সেন্টার ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। সেজন্য তাদের বিটিআরসি থেকে অনুমতি নিতে হবে। যারা সেই অনুমতি পেয়েছে, তারা এখনও কল সেন্টার চালুই করতে পারেনি। বাকিগুলো এখনও অনুমতির অপেক্ষায়। এটি দেখার কথা বিটিআরসি এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর। কিন্তু এখনও এর সুরাহা হয়নি বলে বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান।

রাইডশেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে রাইড শেয়ারিংয়ের যাবতীয় তথ্য বাংলাদেশের মধ্যেই প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো তথ্য কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। সেক্ষেত্রে সকল রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ডেটা সার্ভার হতে হবে দেশে।

কিন্তু সবগুলো রাইড শেয়ারিং কোম্পানির ডেটা সার্ভার দেশের বাইরে বলে বিআরটিএ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়টিরও নিষ্পত্তি হয়নি।

এরকম বেশ কিছু কারণে আবেদনকারী কোম্পানিগুলোকে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট দেওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে বিআরটিএর পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেনি।

“ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ নীতিমালার প্রজ্ঞাপন হয়েছে। এখন পর্যন্ত তো আমরা পাইলাম না। নীতিমালার আলোকে যেসব জিনিস দরকার, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তথ্য তারা আমাদের দিতে পারে নাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপত্তার বিষয়টা। এসব নিয়ে তারা কাজ করছে। কিন্তু কোনো কোম্পানিই আমাদের পূর্ণাঙ্গ কিছু দিতে পারে নাই।”

উত্তর মেলে না প্রশ্নের
নীতিমালা না মানা এবং গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় চারটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে গণমাধ্যম।

এর মধ্যে আন্তর্জাতিক কোম্পানি উবার একটি বিবৃতি পাঠালেও পাঠাও, ওভাই এবং সহজ ডটকমের কোনো সাড়া  পায়নি।

ইমেইলে পাঠানো বিবৃতিতে উবার বলেছে, “বাংলাদেশে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি হিসেবে উবার সরকারের প্রচলিত নিয়ম এবং প্রক্রিয়া মেনে কাজ করতে চায়। সেজন্য রাইড শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে উবার।”

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গত ১৭ নভেম্বর পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী ইলিয়াস এম হুসাইনকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।

পরে মাস্টহেড পিআরের টিম লিডার পরিচয় দিয়ে মো. রাকিব উদ্দিন নামে একজন ফোন করে বলেন, পাঠাওয়ের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তাকে সেগুলো জানানো যাবে। এরপর ১৭ নভেম্বর তাকে মেইলে প্রশ্ন পাঠানো হলে দুদিন পর তিনি বলেন পাঠাও এসব বিষয়ে কোনো কথা বলবে না।

ওভাইয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক (ব্র্যান্ডিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শাফায়েত রেজাকেও একই দিনে ইমেইল করা হয়। ১৯ নভেম্বর তিনি বলেন, “এ বিষয়ে ওভাইয়ের নির্বাহীরা কোনো কথা বলবেন না।”

সহজ ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম কাদিরের কাছ থেকেও ইমেইলের কোনো জবাব পায়নি ।