চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

নিরাপদ খাদ্য

প্রকাশ: ২০১৮-১১-১১ ১০:৩০:৫৩ || আপডেট: ২০১৮-১১-১১ ১৭:০৮:০১

ফজলুর রহমান

বিল গেটস বলে কথা! অন্য কেউ করলে কি ঘটতো কে জানে? ‘ওয়াক থু, ওয়াক থু’ পড়তো। বা বমিতে সয়লাবও হতে পারতো। তবে কেতাদুরস্ত পোশাকে বেশ আয়েশেই কাজটি করে গেলেন বিশ্বের এই শীর্ষ ধনী।

এটি ৬ নভেম্বর, ২০১৮ এর কথা। মলভর্তি বয়াম নিয়ে বক্তৃতা মঞ্চে উঠে তাক লাগিয়ে দেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটে। নতুন টয়লেট প্রযুক্তিবিষয়ক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে ওই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ প্রদর্শনীতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও রোগপ্রতিরোধী ২০টি স্যানিটেশন প্রযুক্তি স্থান পেয়েছে। সম্মেলনে মজা করে গেটস বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এক দশক আগেও আমি ভাবিনি যে মল সম্পর্কে আমি এত কিছু জানব। এটাও চিন্তায় ছিল না যে খাবার টেবিলেও এ নিয়ে আমি কথা চালাতে থাকব। মেলিন্ডা (স্ত্রী) বাধ্য হয়ে খাবার সময় এসব কথা থামাতে বলে।’ প্রযুক্তি মহারথী বিল গেটস পাশে রাখা বয়ামভর্তি মল দেখিয়ে বলেন, ‘এতে ২০০ ট্রিলিয়ন রোটা ভাইরাস কোষ, দুই হাজার কোটি শিগেলা ব্যাকটেরিয়া এবং এক লাখ পরজীবী কীট থাকতে পারে।’

আসলে সারা বিশ্বেই এখন জীবাণু কিংবা অনুজীব নিয়ে নানা কাজ হচ্ছে সচেতনা বাড়ছে। এটি এখন আর লুকানোর বিষয় নয়। বরং যতটা সম্ভব এটিকে ফোকাস করে ক্ষতি এড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এবার আসি খাদ্যের বেলায়। ব্যাকটরেয়িাই সম্ভবত অণুজীবদের মধ্যে খাদ্যবাহিত রোগের প্রধান কারণ। খাদ্যবাহিত রোগের অন্য সংঘটদের মধ্যে আছে বভিন্নি পরজীবী কৃমি, প্রাণী দেহনি:সৃত বিষ, রাসায়নিক বর্জ্য, পরবিশেদূষক, পরষ্কিারক দ্রব্যাদি, জীবাণুনাশক ইত্যাদি। এছাড়া পরিবেশ আক্রান্ত হয় এরকম বিষ বা বিষাক্ত পদার্থ দ্বারাও খাদ্যবাহিত রোগ ছড়াতে পারে।

এদিকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য একটি উদ্যোগের খবর প্রকাশ করে একটি জাতীয় দৈনিক। গত ৬ নভেম্বর দৈনি কালের কন্ঠ-এর প্রথম পাতায় খবরটি পাওয়া যায়। এতে বলা হয়,‘‘ যেকোনো রেস্তোরাঁয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান মানেই শাস্তি অবধারিত। অনেক চকচকে তকতকে রেস্তোরাঁয় গিয়েও দেখা যায়, রান্নাঘরের অবস্থা যাচ্ছেতাই। নোংরা পরিবেশে খাবারের ওপর দিয়ে তেলাপোকার অবাধ চলাফেরা যেন নিয়মিত স্বাভাবিক ব্যাপার। নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্রিজের মধ্যে রাখা হচ্ছে কাঁচা ও রান্না করা খাবার। মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই যাচ্ছে এসব হোটেল-রেস্তোরাঁয়। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ছাড়া সত্যিকার অর্থে এগুলোকে একটা কাঠামোর মধ্যে আনা বা একটা নির্দিষ্ট মান তৈরির জন্য কোনো আইন এত দিন ছিল না। এই পরিস্থিতিতে এবার শুধু খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্যই একটি নীতিমালা তৈরির কাজ করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। পাশাপাশি হোটেল ও রেস্তোরাঁর কোনটা ভালো কোনটা খারাপ, তা বোঝার জন্য লাগানো হবে ‘ফুড স্টিকার’। উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের গুণগত মান যাতে ঠিক থাকে, তা নিশ্চিত করতেই নিরাপদ খাদ্য (খাদ্য ব্যবসায়ীদের বাধ্যবাধকতা) প্রবিধানমালা, ২০১৮-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁ সব ধরনের স্ট্যান্ডার্ড মেনে পরিচালিত হবে সেগুলোকে সবুজ, যেগুলোতে কিছু সমস্যা থাকবে, তবে একটু সময় নিয়ে উন্নয়ন করা সম্ভব সেগুলো হলুদ এবং যেগুলোর মান ভালো নয় এবং সহজে ঠিক করাও সম্ভব নয় সেগুলোকে লাল চিহ্নিত করে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে। এই ‘ফুড স্টিকার’ দেখে মানুষ হোটেল-রেস্তোরাঁয় ঢোকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। বিএফএসএ বলছে, ছড়ি ঘুরিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা নয়, বরং একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরির জন্য খাদ্য ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নিতে হবে। নতুন যারা এ ব্যবসায় যুক্ত হবে তাদেরকে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড মেনে তবেই আসতে হবে। আর পুরনোদেরকে পর্যায়ক্রমে ব্যবসার স্থাপনা, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন পরিবেশ এবং মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। প্রবিধানমালার খসড়ায় পাঁচ বছর মেয়াদে লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থাপনা ও ব্যবসার জন্য আলাদা আলাদা ফরমে রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করতে হবে।’’

আসলে টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্যতম অপরিহার্য হলো সুস্বাস্থ্য। আর এই সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। এভাবে সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠন করা যায়। উন্নত বিশ্বে তাই নিরাপদ খাদ্যের উপর অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়। এজন্য এসব দেশে কড়া আইন ও অনুশাসন আছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি কঠিন করে তুলে অধিক মুনাফালোভী একটি শ্রেণীর ব্যবসায়ী। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থা সময়ে সময়ে অভিযান চালিয়েও বেশি সফল হতে পারছে না।

আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, ফরমালিন ফুসফুস ও গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য ফরমালিনকে দায়ী করেছে। টেক্সটাইল কালারগুলো খাদ্য ও পানীয়ের সঙ্গে মিশে শরীরে প্রবেশের পর এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই যার ক্ষতি করে না। তবে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ক্ষতিগুলো হয় আমাদের লিভার, কিডনি, হৃৎপিন্ড ও অস্থিমজ্জার। ধীরে ধীরে এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চা ও বৃদ্ধদের বেলায় নষ্ট হয় তাড়াতাড়ি। খাদ্যপণ্য ভেজালের কারণেই দেশে বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেলিউর, হৃদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানি, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, খাদ্য বিষক্রিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেন স্ট্রোক এগুলো অনেক বেড়ে যাচ্ছে। কেমিক্যাল মিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো- পেটব্যথাসহ বমি হওয়া, মাথাঘোরা, মল পাতলা বা হজম বিঘ্নিত মল, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়া, পালস্ রেট কমে বা বেড়ে যেতে পারে।

এসব দিক লক্ষ্য রেখে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-এর স্টিকার লাগানোর উদ্যোগটি অত্যন্ত যুগান্তকারী। এতে করে আগেই জানা যাবে, কোন হোটেল বা রেস্তোরাঁর মান কোনটা কি রকম। তবে কেবল আইন নয়। অনুশাসনও দরকার। যাতে করে এ বিষয়টি মনেই ধারণ করা যায়। ইসলামের ইতিহাসে একটি অনুশাসনের ঘটনা উল্লেখ আছে। যা কেবল ইসলাম নয়, সকল ধর্মেও লোকজনের নিকটও অনুকরণীয় হতে পারে। নিচে ঘটনাটি উল্লেখ করা হলো।

হযরত ওমর (রা.) খলিফার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায়ই রাতের অন্ধকারে জনগণের খবরাখবর নিতে বেরোতেন। এক ঘরে রাতে বাতির আলো দেখে ভাবলেন, এত রাতে বিশেষ কারণ ছাড়া বাতি জ্বলার কথা নয়। কাজেই তিনি কারণ জানতে সেদিকে রওয়ানা হলেন। কুঁড়ে ঘরের পাশে দাঁড়াতেই এক দাদী এবং নাতনীর কথোপকথন শুনতে পেলেন। নাতনী বলছে ‘দাদী আজ ছাগল দুধ কম দিয়েছে, কিভাবে গ্রাহকদের দুধ দেবো।’ জবাবে দাদী বলছে, ‘এতে চিন্তার কারণ নেই, কিছু পানি মেশালেই চলবে।’ নাতনী বললো, ‘দুধে পানি মেশাতে আমিরুল মোমেনিন-এর নিষেধ আছে।’ দাদী বললো, ‘এত রাতে আমিরুল মোমেনিন কিভাবে জানবেন বা দেখবেন দুধে পানি মেশানো হয়েছে।’ সঙ্গে সঙ্গে নাতনীর স্পষ্ট জবাব, ‘আমিরুল মোমেনিন না দেখলেও আল্লাহ তো দেখছেন।’ ওই কথোপকথন শুনে হযরত ওমর (রা.) নিজ ঘরে ফিরে এলেন এবং পরদিন সকালে সেই ছাগল চরানেওয়ালী মেয়েটির কাছে নিজের ছেলের বিবাহের প্রস্তাব দিলেন এবং শুধু সততার জন্য সমগ্র ইসলাম জগতের খলিফা হয়েও সাধারণ ছাগল চরানেওয়ালী বেদুঈন মেয়ের সাথে নিজের ছেলের বিবাহ দিলেন।

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।