চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

আন্দোলন ও সংলাপের পথে সমাধান চায় ঐক্যফ্রন্ট

প্রকাশ: ২০১৮-১১-০৩ ১১:০৬:৩৮ || আপডেট: ২০১৮-১১-০৩ ১৭:৫৮:২৩

বাংলাদেশে সরকারের সাথে সংলাপের ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল শরিক বিএনপি এখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পিছিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, তফসিল পিছিয়ে এই সময়ের মধ্যে তারা সরকারের সাথে ছোট পরিসরে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নেত্রীর মুক্তি এবং নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে একটা সমাধান চান।

বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট তাদের দাবিতে কর্মসূচিও অব্যাহত রাখার কথা বলছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ৬ নভেম্বর রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই জোট জনসভা করতে যাচ্ছে। সেখান থেকেই দাবি আদায়ে নতুন কর্মসূচি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেতারা।

আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার পাশাপাশি কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখবেন তারা।

সংসদ ভেঙে, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবি তোলা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রোববার (২৮ অক্টোবর) সংলাপের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি পাঠান।

পরদিন সোমবার (২৯ অক্টোবর) সংলাপে রাজি হওয়ার কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মঙ্গলবার (৩০ অক্টোবর) সকালে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গোলাপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন কামাল হোসেনকে।

বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় সংলাপ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দল। সংলাপ শেষে গণভবন থেকে বের হয়ে রাত ১১টায় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ড. কামাল হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করেন। বাড়ির আঙ্গিনায় সংবাদকর্মীরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় থাকলেও ভেতরে নেতারা বসেন পরবর্তী অবস্থান নিয়ে আলোচনায়।

জানা গেছে, গণভবনের আলোচনা থেকে তারা তেমন কিছুই পাননি। পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। ফের সংলাপে বসলেও তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। এ অবস্থায় তারা মনে করেন আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। মাঠে নেমেই দাবি আদায় করতে হবে। কাজেই মাঠে নামার ওপরই তারা গুরুত্বারোপ করেন।

এদিকে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেন। শনিবার (৩ নভ্ম্বের) সন্ধ্যায় আবারও ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় বৈঠকে বসবেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা সফল করার পাশাপাশি আগামী ৯ নভেম্বর রাজশাহীতে জনসভা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হবে। এর বাইরে আর কি কি কর্মসূচি দেয়া যায়- তা চূড়ান্ত হতে পারে।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসার মধ্য দিয়ে আলোচনার দ্বার উন্মোচন হলেও আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আমরা আমাদের কথা বলেছি। তিনি শুনেছেন। অনেক কথা বলেছেন। দু-একটি বিষয় ছাড়া দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেননি। আমরা আলোচনার পথ খোলা রাখব। পাশাপাশি দাবি আদায়ে রাজপথে নামব, জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে কাজ করব।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আন্দোলনই এখন দাবি আদায়ে আমাদের একমাত্র ভরসা। আন্দোলন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, আমাদের কিছু দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। বাকি দাবিও তাদের মানতে হবে। দাবি আদায়ে আমরা এবার চূড়ান্ত আন্দোলনে নামব। আমাদের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে তা মানব না। সরকার চাইলে যা খুশি করবে- তা হতে দেয়া হবে না।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা আশাহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদ না ভাঙার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেন। যে সরকার আছে সেই সরকারই বহাল থাকবে- এটাও প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার করে বলেছেন। এ অবস্থায় ফ্রন্ট নেতারা ভাবছেন আন্দোলনই এখন একমাত্র ভরসা। সেভাবেই তারা তৈরি হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সংসদ এবং সরকার বহাল রেখে নির্বাচন হলে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হওয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাদের কি লাভ হবে? ফলাফল তো আগে থেকেই তৈরি করা থাকবে। দাবি আদায় করতে হলে এখন আন্দোলনে নামতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র জানায়, সংলাপে ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সাত দফা উত্থাপন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর এ নিয়ে একে একে আলোচনায় অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, ড. মঈন খান, জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। প্রত্যেকেই সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সায় দেন।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারটি আদালতের বিষয়। এখানে তার হাত নেই। সংলাপে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবিও জানায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবেও সায় দেননি।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, সরকার এবং বিরোধী জোট, দুই পক্ষেরই রাজনৈতিক কারণে এই সংলাপ প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনের আগে দু’পক্ষই দেখাতে চেয়েছেন যে, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চেয়েছিলেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধীদল বিএনপি দুই দলেই সংলাপ বিরোধী অংশও রয়েছে। বিএনপি দলটি মনে করছে, সংলাপে তাদের দাবিগুলো কার্যত নাকচ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে, সেটা তারা বলতে রাজী নয়। তারা সরকারের সাথে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইছে বলে মনে হয়।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলন যে সহিংস রুপ নিয়েছিল। সেই দায় এখনও বিএনপিকে বইতে হয়।

দলটি এবার সে ধরনের পরিস্থিতিতে যেতে চায় না। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চেয়েছে। তাতে তারা অনেকটা সফল হয়েছে বলে মনে করে বিএনপি।