চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮

চাচা-ভাতিজির সংলাপে প্রত্যাশা অনেক, কিন্তু পিছু ছাড়ছে না সংশয়

প্রকাশ: ২০১৮-১১-০১ ১০:৩৮:০৯ || আপডেট: ২০১৮-১১-০১ ১৩:২১:০৬

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। মাঠের রাজনীতিতে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে রাজৈনিতক দলগুলো। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হওয়া সবার প্রত্যাশা। কিন্তু এক্ষেত্রে সঙ্কটের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে নির্বাচন ব্যবস্থা। আর এই সঙ্কট দূর করতেই শুরু হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংলাপ।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের মধ্য দিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সংলাপ শুরু হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে আরো বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে অংশ নিবে। যদিও সঙ্কট নিরসনের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় রয়েছে বিরোধী শিবিরে এরপরও প্রত্যাশা এর মাধ্যমে ভাল কিছু বয়ে আনবে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যে সংলাপটি হতে যাচ্ছে তাতে আওয়ামী লীগের পক্ষের নেতৃত্বে থাকবেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে থাকবেন ড. কামাল হোসেন। ইতোমধ্যেই উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করে হোমওয়ার্ক সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।

সংলাপটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে হলেও এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ড. কামাল হোসেনর সম্পর্কটাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা, ড. কামলা হোসেন এমন এক ব্যক্তি যার হাত দিয়ে রচিত হয়েছে দেশের প্রথম সংবিধান। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়াও বর্তমানে দেশের সবচেয়ে প্রবীণ ও সম্মানী নাগরিক। যাকে শেখ হাসিনা সব সময় চাচা বলেই ডাকেন। ড. কামাল হোসেনও শেখ হাসিনা অনেক স্নেহ করেন। ফলে এই সংলাপের ফলাফল যাই হোক উভয়পক্ষকে কথা-বার্তা বলতে হবে খুবই সতর্কভাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের ২৩ জন প্রতিনিধি অংশ নেবেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, মো. আবদুর রাজ্জাক, কাজী জাফর উল্লাহ, রমেশ চন্দ্র সেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডাক্তার দীপু মনি, আবদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ, আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং জাসদের একাংশের সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল।

ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ১৬ জন প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নেবেন। তারা হলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সহ-সভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, এসএম আকরাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাকসু’র সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আ ব ম মোস্তফা আমিন।

সাত দফা ও ১১ লক্ষ্য নিয়ে কথা বলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যদিও আওয়ামী লীগ থেকে বলা হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের দফাগুলো মানার মতো নয়। তবে শেষ পর্যন্ত সংলাপ হতে যাওয়ায় ঐক্যফ্রন্ট অনড় না থেকে খোলা মনে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের দলগুলোর নেতারা মনে করছেন সংলাপের টেবিলে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য ৭ দফা বা অন্য কোনো বিকল্প ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে পারে।

ঐক্যফ্রন্টের চিঠির জবাবে জোটটির নেতাদের গণভবনে সংলাপ ও নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণভবনে যাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। কিন্তু সংলাপে বসলেও গণভবনে নৈশভোজে অনীহা প্রকাশ করেছেন তারা। নৈশভোজের ব্যাপারে নিজেদের অনাগ্রহের কথা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে থাকা গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু।

নৈশভোজ না করার পেছনে কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আলাপ-আলোচনার জন্য দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে। আমরা চাই নৈশভোজে সময় নষ্ট না করে সে সময় আলোচনায় ব্যয় করতে।’

তবে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সূত্র জানায়, মূলত বিএনপির চাপেই ঐক্যফ্রন্টের নেতারা গণভবনে নৈশভোজ করবেন না। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি গণভবনে নৈশভোজ চায় না বলে বিএনপির একটি সূত্র জানায়।

গত ১৩ অক্টোবর গণফোরাম, বিএনপি, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। এ জোট হওয়ার পর একাধিক বৈঠক করেছেন নেতারা। সিলেটে ২৪ অক্টোবর ও চট্টগ্রামে ২৭ অক্টোবর সমাবেশও করে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল এবং সবাই বলছিল আলোচনার চেষ্টা করতে। তারাও সাড়া দিয়েছে। উভয় পক্ষই মনে হয় চাচ্ছে একটা কিছু হোক। সাত দফা ছাড়াও অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা হতে পারে। বারবার যেন বসতে না হয়, কোনো ঝামেলা যাতে না হয় সেভাবেই আলোচনা হতে পারে।’

দাবির বিষয়ে সমঝোতা প্রসঙ্গে মন্টু বলেন, ‘আমাদের তরফ থেকে সমঝোতার জন্য সবাই আমরা উদ্যোগী। একদম গ্রহণযোগ্য না হলে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যেসব শর্ত আমরা দিয়েছি। সেসবের ক্ষেত্র যদি প্রস্তুত না হয় তাহলে বিকল্প কোনো ক্ষেত্র যদি প্রস্তুত করে দিতে পারে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে এমন যেকোনো কিছু অবশ্যই আমরা মেনে নেব।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি, সংসদ বাতিলসহ কয়েকটি দাবি প্রসঙ্গে সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান কেমন হতে পারে-সে বিষয়ে গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মন্টু জানান, অবস্থা বুঝে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

ঐক্যফ্রন্টের এক নেতা বলেন, সাত দফার একটি বাদে প্রায় সবগুলোই বিবেচনা করার মতো। তবে এখানে ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি বিএনপিরও গণতান্ত্রিক মনোভাব থাকতে হবে। বিএনপিকেও এ সংলাপে নিজেদের প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। দেশের স্বার্থে যেসব বিষয়ে সমঝোতা সম্ভব সেগুলোতে একমত হতে হবে। তবে সরকারের কাছে নিজেদের দাবি দাওয়া আরও আগেই তুলে ধরা উচিত ছিল বলে মনে করেন ওই নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই সদস্য বলেন, সংলাপ চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে দ্রুত সাড়া পেয়েছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা করেছেন। তার গণতান্ত্রিক মনোভাব রয়েছে এবং তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু অনেক আগে থেকেই ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। জোটের এই নেতা বলেন, ‘টেবিলে বসে শুধু কমিটি করলে হবে না। আলোচনার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সেখানেই সমাধান হয়। দাবি যেমন থাকে. দাবির বিকল্পও থাকে।’

ঐক্যফ্রন্টের এক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বিএনপিসহ সব দলকে খোলা মনে আলোচনা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। সুযোগের কোনো কিছু যেন ঐক্যফ্রন্টের মনোভাবের কারণে নষ্ট না হয় সে ব্যাপারে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো একমত হয়েছে।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির মওদুদ আহমেদ বলেছেন, সংলাপের আগে তারা কিছু বলতে চান না।

নাম না প্রকাশের শর্তে অন্য সদস্য বলেন, এটা ঠিক ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে বিএনপি যে ভুল করেছিল সেই ভুল দলটি এবার করতে চায় না। সংলাপ সফল হোক বা না হোক এর দায় যেন বিএনপির ওপর না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে। জনগণের কাছে তারা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সতর্ক থাকবে।

অবশ্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ রয়েছে। এই সংলাপে আওয়ামী লীগ কতটুকু আন্তরিক, সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা জনগণ বুঝতে পারছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘মিথ্যা’ মামলায় সাজা ও সাজার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে সংলাপ সফলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের সাত দফাকে আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রীরা অসাংবিধানিক ও মানা সম্ভব নয় বলে আসছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে পাঠানো চিঠিতেও বলা হয়েছে, সংবিধানসম্মত সব বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। এ ছাড়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে জানিয়ে আসছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সম্পূর্ণ আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতেই সংলাপে বসতে যাচ্ছি আমরা। এই সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হবে। সংলাপে সংকটের বরফ গলবে। যারা সংশয় প্রকাশ করেছিল, সংলাপের মধ্য দিয়ে তাদের সংশয় কেটে যাবে।’

এই সংলাপ সফল হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে যে চিঠি দিয়েছে, সেখানে তারা সাত দফা দাবি এবং ১১ দফা লক্ষ্য সংযুক্ত করে দিয়েছে।

আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, তাদের সাত দফা দাবির মধ্যে কিছু আছে সংবিধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিছু রয়েছে আইন-আদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিছু আছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আলোচনার মাধ্যমেই এগুলোর সুরাহা হবে।’

‘যেমন তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চেয়েছে, এটা আমাদেরও বক্তব্য। তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন, সরকার শুধু তাদের সহযোগিতা করবে,’ বলছিলেন ওবায়দুল কাদের।

এ সময় সংলাপ অত্যন্ত প্রাণবন্ত, খোলামেলা পরিবেশে এবং সফল হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এখানে একদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবং অন্যদিকে ড. কামাল হোসেন অংশ নেবেন, যাকে শেখ হাসিনা সব সময় চাচা বলে ডাকেন।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা সমুন্নত রাখতেই এই সংলাপ হচ্ছে। সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা হবে অত্যন্ত খোলামেলা। এতে কোনো শর্ত থাকবে না।’

গত ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সংলাপে বসার জন্য আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং সাধারণ সম্পাদক বরাবর দুটি চিঠি দেওয়া হয়। ঐক্যফ্রন্টের আহ্বানে সংলাপে বসার ক্ষেত্রে দ্রুতই সাড়া দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

মঙ্গলবার সকালে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠি নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় গিয়ে তার হাতে চিঠি পৌঁছে দেন।

আগামী সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণা হতে পারে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোট হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা সে ব্যাপারে সরাসরি কিছু না বললে জোটগতভাবেই অংশ নেওয়ার কথা ভাবছেন নেতারা। এ জোটের এক নেতা জানান, ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে নির্বাচনের জন্য। এই জোট নির্বাচনে যাবে। সেভাবেই এগোচ্ছে। আর সরকারের তরফ থেকেও জোটকে নির্বাচনমুখী করতে হবে। নয়তো সরকারেরই বদনাম হবে। তবে ওই নেতা জানান, সবার চোখই এখন সংলাপের দিকে। আলোচনার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ঐক্যফ্রন্টের নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, জোট নির্বাচন কেন্দ্রিক। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে তখন সিদ্ধান্ত হবে নির্বাচনের যাওয়ার ব্যাপারে। সেটা জোটগতভাবে বা আলাদাভাবেও হতে পারে।

এ সংলাপে শুধু দেশবাসীর দৃষ্টি নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এ সংলাপকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট বলেছেন, সরকারের কথা অনুযায়ী আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয় কি না, সেদিকে দৃষ্টি রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।

মঙ্গলবার তার শেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সরকার ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে অনুষ্ঠেয় সংলাপে রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা মনে রাখবেন বলে প্রত্যাশা বার্নিকাটের।

প্রায় চার বছর এ দেশে দায়িত্ব পালন করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তারই আলোকে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নজর রাখবে।’

বার্নিকাট বলেন, ‘সরকারের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহনমূলক হয় কি না, সেদিকে গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রার্থী, দল কিংবা জোটকে সমর্থন করে না। সমর্থন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মূল্যবোধকে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সেই স্বাধীনতা থাকতে হবে যেখানে তারা গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক ছাড়াই তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। তবে সেই কর্মসূচি অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে।’

বিদায়ী এই সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে হতে যাওয়া সংলাপকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করলেন বার্নিকাট।

বার্নিকাট বলেন, ‘আসন্ন সংলাপ রাজনীতিতে একটি বড় অর্জন। তবে খেয়াল রাখতে হবে সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের কথা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন। একজন ব্যক্তি ও একটি রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করে সংলাপ হওয়া উচিত হবে না।’

সংলাপের অতীত কী বলছে
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একমাত্র ২০০১ সালের নির্বাচন ব্যতীত অন্য সব নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে।

অতীতে এর আগ অন্তত তিনবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা কিংবা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে দুবার হয়েছে বিদেশীদের মধ্যস্থতায়। খবর বিবিসি’র।

কী হয়েছিল সেসব আলোচনায়?
১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি সংসদীয় উপ-নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে আনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে আনে আওয়ামী লীগ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। হরতাল এবং সহিংসতায় জনজীবন তখন বিপর্যস্ত। তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্র সংহত করতে কমনওয়েলথ-এর তরফ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়।

কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় আসেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টেফান। কিন্তু সে আলোচনাও সফল হয়নি। স্টেফান তখন ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে দফায়-দফায় বৈঠক করেন।

এক পর্যায়ে তিনি সর্বদলীয় একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সে সরকারে সরকার এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

এছাড়া একজন টেকনোক্রেট মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের দূত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে ফর্মুলা মানেনি।

স্যার নিনিয়ান স্টেফানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছিল আওয়ামী লীগ। কোন রকম সমাধানে না আসার কারণে ফিরে যান স্টেফান। এরপর আওয়ামী লীগ তাদের আন্দোলন আরো জোরদার করে এবং বিএনপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা এবং বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য সে নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধনের করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

এর মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যেই আবারো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সংসদ ভবনে সংলাপে বসেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সংস্কারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ একটি প্রস্তাব তুলে ধরে।

প্রথম দিনের আলোচনা শেষে বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া বলেন, ‘১৪ দলের পক্ষ থেকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের যে দাবিগুলো আছে সেগুলো আমার কাছে হস্তান্তর করেছেন। আমি তাদের প্রত্যেকটি দাবি সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছি। তিনি ব্যাখ্যা ব্যাখ্যা করেছেন। আমি এ ব্যাখ্যাগুলো নিয়ে আমার দলের কাছে ফেরত যাব এবং দলের সাথে আলোচনা করবো।’

এ সময় আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার পাশে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। জলিলও একই কথা বলেছেন। প্রথম বৈঠকের পর তারা জানিয়েছেন যে আলোচনা আরো চলবে। তখনকার সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দুটি দাবিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়।

প্রথমত: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের না থাকা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে এমএ আজিজের পদত্যাগ।

কিন্তু এ দুটি বিষয়ে কোন বিএনপির দিক থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া আসেনি। একদিকে আওয়ামী লীগ রাস্তায় আন্দোলন করতে থাকে এবং অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি ২০০৭ সালের ২২শে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখ বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ফলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে নেন। এক পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোট নির্বাচন থেকে সরে যায়।

শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। ফলে প্রায় দুই বছর সেনা-সমর্থিত সরকার দেশ পরিচালনা করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে।

এরপর থেকে সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির দিকে আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়।

২০১৩ সালের শুরুতে সে আন্দোলন জোরালো রূপ নেয়। বিরোধী দলে বিএনপির ডাকা হরতাল অবরোধের কারণে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দেয়। দেশজুড়ে এ সময় সহিংসতাও হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো।

ততদিনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। তারানকো ঢাকা অবস্থানকালে বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনাকে সরকার প্রধান রেখেই নির্বাচনের একটি ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করছেন জাতিসংঘের প্রতিনিধি। কিন্তু বিএনপি সে বিষয়ে কোন আগ্রহ দেখায় নি।

তারানকো তার সফরের সময় বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছেন। এর পাশাপাশি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সাথেও তিনি বৈঠক করেন।

এর পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সাথে নিয়ে একটি বৈঠক করেন।

কিন্তু উভয়পক্ষ তাদের দাবিতে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত কোন সমাধান ছাড়াই ফিরে যান তারানকো। যাবার আগে সোনারগাঁও হোটেলে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, উভয়পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজী হয়েছে।

কিন্তু তারানকোর কথায় পরিষ্কার আভাস মিলেছিল যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোন সমাধান সূত্র বের হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে আসে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত এক নির্বাচন।