চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে বিএনপিতে গ্রেফতার আতঙ্ক

প্রকাশ: ২০১৮-১০-৩১ ২০:৩৪:৩৬ || আপডেট: ২০১৮-১১-০১ ১২:৩২:৪৯

গত ২১ অক্টোবর আইসিটি মামলায় বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে কারাগারে পাঠান আদালত। ওই রায়ের পর পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে নগর বিএনপির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেনসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের ১৫০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেয় পুলিশ।

মামলার পরের দিন গত সোমবার (২২ অক্টোবর) ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তুতি সভা থেকে গ্রেফতার করা হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করকে। তবে বিএনপি বলছে, রায়ের দিন আদালত ভবনে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

গতকাল মঙ্গলবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে নগরের কাজীর দেউড়ি নুর আহমদ সড়ক এলাকা থেকে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, আকবরশাহ থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ওয়াশিমুল গণি ও কাট্টলী ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি আলী আজমী মাহবুবুরকে গ্রেফতার করা হয়। এবারও পুলিশের সেই আগের অভিযোগ, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে বিএনপি নেতারা।

ওই ঘটনার পাঁচ ঘণ্টারও কম সময়ে মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে শিল্পগ্রুপ এস আলমের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আলোচনায় আসা বিএনপি নেতা মো. লিয়াকত আলীকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরও লিয়াকতকে গ্রেফতারের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। পরে গণমাধ্যমের চাপাচাপিতে বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম স্বীকার করেন যে, নগর গোয়েন্দা পুলিশ লিয়াকত আলীকে গ্রেফতার করেছে।

গত ৯ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ চার নেতার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেদিন তাদের গ্রেফতার করতে না পারলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা গ্রেফতার হন। ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশের আগে ২৩ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে মিরসরাই উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের ১৩ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ।

এক সংবাদ সম্মেলনে নগর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুলিশের মামলা থেকে মৃত ব্যক্তিরাও রেহাই পাচ্ছেন না। নগরের বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন নামে এক নেতার মৃত্যু হয়েছে ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর। এক বছর পর গত ১০ অক্টোবর সেই মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা দিয়েছে পুলিশ। বলা হয়েছে যে, জসিম উদ্দিন পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছুঁড়েছে।

সে সময় বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ১৩ অক্টোবর রাতে বজ্রপাতের পরদিন নগরের বায়েজিদ থানায় বজ্রপাতের শব্দকে ‘বোমা বিস্ফোরণ’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে পুলিশ। মামলা দেয়া হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

নগর বিএনপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের এক সপ্তাহে নগরের সাত থানায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অন্তত সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলাকে ‘গায়েবি মামলা’ বলছে বিএনপি। মামলায় শ’খানেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও দাবি দলটির।

সূত্র জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর নগরের আকবরশাহ থানায় ৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের হয়। মামলায় থানা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস ছাত্তার সেলিমসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই সময় বায়েজিদ বোস্তামি থানায় দায়ের করা একটি পুরনো মামলায় গ্রেফতার করা হয় নগর বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী, সহ-শ্রম সম্পাদক আবু মুছা ও জোনাব আলীকে।

১১ সেপ্টেম্বর বন্দর থানায় সাতজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় গ্রেফতার করা হয় যুবদল নেতা এরশাদকে। ১৫ সেপ্টেম্বর পতেঙ্গা থানায় ৭৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের হয়। একই সময় নগরের ডবলমুরিং থানার একটি পুরনো মামলায় নগর বিএনপির চার নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর নগরের হালিশহর থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় গ্রেফতার করা হয় নগর বিএনপির সদস্য আজিজুর রহমান বাবুলকে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে নগরের পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, খুলশী, ইপিজেড ও বন্দর থানায় পাঁচটি মামলা হয়। এতে বিএনপির ১২৪ নেতাকর্মীকে আসামি করে পুলিশ। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয় দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে।

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে একের পর এক মামলা হচ্ছে। কিন্তু হামলার খবর মিডিয়ায় আসছে না। একটি-দুটি নয়, শত শত মামলা হচ্ছে, কিন্তু যেসব হামলার কথা বলা হচ্ছে সেসব ঘটনার কোনো অস্তিত্বই নেই। আমাদের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। বাসাবাড়িতে থাকতে পারছেন না।’

তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগমের দাবি, ‘গায়েবি মামলা বলতে কিছু নেই। যার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করছে।’

বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীকে গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে লিয়াকত আলীকে নগরের স্টেশন রোড থেকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, খুন, অস্ত্র আইনসহ ২৪টি মামলা আছে। সেসব বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।’