চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮

ল্যাব টেকনিশিয়ান হয়েও রোগী দেখেন তিনি!

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৯ ১৭:২৩:০২ || আপডেট: ২০১৮-১০-৩০ ১০:১৫:০১

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

প্রাতিষ্ঠানিক কোন সনদপত্র নেই, নেই কোন দক্ষতা, তারপরও চিকিৎসক সেজে রোগী দেখেন তিনি। তার নাম রুহি দাশ। বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার সুলতানা মন্দির এলাকায়। পেশায় একজন ল্যাব টেকনেশিয়ান। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সহজ সরল রোগীদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে রুহি দাশ নামের ল্যাব টেকনিশিয়ান। রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেয়ার বৈধ কোন প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র না থাকলেও মিরসরাই পৌরসদরের মিরসরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিন পার্শ্বস্থ মাস্টার মেডিকেল ফার্মেসীর পেছনে চেম্বারে বসে দেদারসে রোগী দেখছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রুহি দাশ মিরসরাই সদরের ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান। রোগীর কাছ থেকে ফি বাবদ ১০০ টাকা নিলেও রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেন তিনি সাদা কাগজে। সেই ব্যবস্থাপত্রে লিখা থাকেনা কি নাম ডাক্তারের ও কি ডিগ্রি রয়েছে তার। এছাড়া রোগীর ওই ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেয়া হয় অনেকগুলো রক্ত পরীক্ষার নাম। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেই পরীক্ষাগুলো করতে গিয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

সরেজমিনে ওই ফার্মেসির চেম্বারে রবিবার (২৮ অক্টোবর) সাড়ে এগারোটায় গিয়ে দেখা যায়, রুহি দাশ ডাক্তার সেজে ষাটোর্ধ এক রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছেন। কিছুক্ষন পর ওই রোগী চেম্বার থেকে বের হয়ে আসলে রোগীর কাছ থেকে রুহি দাশের দেয়া ব্যবস্থাপত্রটি নিয়ে দেখা যায়, একটি সাদা কাগজে চার ধরনের ঔষুধ লিখে দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের নাম ও ডিগ্রী লেখা নেই, আছে শুধু একটি দুর্বোধ্য স্বাক্ষর! তাছাড়া ওই রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেয়া হয়েছে কয়েকটি টেস্ট।

রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের নাম ও পদবী কেন লিখা নেই জানতে চাইলে রুহি দাশ বলেন, আমি রোগীটিকে গরীব হিসাবে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিয়েছি। তাই ব্যবস্থাপত্রে কোন নাম লেখা হয়নি। আমার নামে ছাপানো প্যাড আছে, এই মুহূর্তে নেই কিন্তু পরে দেখাতে পারবো। এসময় রুহি দাশের কাছে ডাক্তার হিসাবে কোন প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে চট্টগ্রামস্থ “কন্টিনেন্টাল ইন্সিটিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি” নামক প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছর মেয়াদী প্যারামেডিকেল কোর্সের সনদপত্র আছে। এসময় তাকে এই সনদপত্রটি দেখানোর জন্য বলা হলে অনেকক্ষন সময় নিয়েও তিনি এই সংক্রান্ত কোন সনদপত্র দেখাতে পারেননি।

রুহি দাশ ডাক্তার কিনা জানতে চাইলে কন্টিনেন্টাল ইন্সিটিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজির পরিচালক ডা. সরোয়ার আলম জানান, রুহি দাশ আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যে কোর্স করেছে তাতে ডাক্তার হয়ে রোগী দেখার কোন সুযোগ নেই। তার ডাক্তার সেজে রোগী দেখা অবৈধ।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে “ভার্ক” এর চট্টগ্রাম এরিয়া কোর্ডিনেটর আলহাজ্ব মিয়া বলেন, রুহি দাশ মিরসরাই সদরের ভার্ক মা ও শিশু হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান। রুহি দাশ ডাক্তার নন। সে ভার্ক হাসপাতালের বাইরে কোথাও গিয়ে ডাক্তার সেজে রোগীদের সাথে প্রতারনা করলে সেই দায় দায়িত্ব আমরা নেবোনা।
জানতে চাইলে রুহি দাশের চেম্বারে আসা রোগী খুরশিদ আলম (৬০) বলেন, ভাই আসল নকল ডাক্তার চেনার ক্ষমতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই। ওই চেম্বারে ডাক্তার আছে জেনেই আমি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রুহি দাশের কাছে গিয়েছিলাম। এখন শুনছি উনি ডাক্তার নন। আমাদের তো এই বিষয়ে কিছু করার নেই, আমরা অসহায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিরসরাইয়ের গাইনি বিশেষজ্ঞ বলেন, দুই বছর আগে এই রুহি দাশ আমার স্বাক্ষর নকল করে একটি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা শুরু করেছিলো। পরে বিষয়টি আমি জানতে পেরে তাকে সর্তক করেছিলাম। এছাড়া তার ব্যবস্থাপত্রে দেয়া ঔষধের অতিরিক্ত মাত্রার কারণে একটি শিশুর শারিরীক অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, আমি বিষয়টি জানার পর তাকে এই ধরনের কাজ না করার জন্য বলেছিলাম।

এই ব্যাপারে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ নুরুল আফছার বলেন, একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান কোনভাবেই ডাক্তার সেজে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে না। এটা অবৈধ কাজ। উপজেলা প্রশাসন চাইলে এই বিষয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

এই বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, এই ভাবে রোগী দেখা অবৈধ। বিষয়টি আমি দ্রুত খতিয়ে দেখবো। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।