চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে চরম দুর্ভোগ: রাস্তায় গাড়ি নেই, হেঁটেই গন্তব্যে

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৮ ১৭:৪৮:২০ || আপডেট: ২০১৮-১০-২৮ ১৭:৫৭:৪০

সড়ক পরিবহন আইন বাতিলের দাবিতে শ্রমিকদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট চলছে দেশজুড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

রবিবার ভোর ছয়টা থেকে শুরু হয়েছে ধর্মঘট। সকালে রাস্তায় নেমে যাত্রীরা বাস না পেয়ে পড়েন ভোগান্তিতে। অফিসগামী যাত্রীরা গণপরিবহন না পেয়ে বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে রওয়ানা করেন।

সকাল থেকে বন্দরনগীর চট্টগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে আমাদের প্রতিবেদকেরা জানান, প্রতিটি পয়েন্টে শত শত যাত্রী অপেক্ষা করছে, কিন্তু কোনো গণপরিবহন নেই। বাধ্য হয়ে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশা-ভ্যানে করে, আবার কেউ বিকল্প কোনো মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কর্মজীবী মানুষ নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, জিইসি, নিউমার্কেট ও আগ্রাবাদ এলাকায় ভিড় করলেও গণপরিবহন নেই বললেই চলে। দু-একটা সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া আর কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। রাস্তায় হাজারও যাত্রী গাড়ির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় দেখা যায়, শ’খানেক অফিসগামী লোকজন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থী দাঁড়িয়ে আছেন। দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের অনেকেই কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিতে দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে পরীক্ষার্থীদের। তাদের অনেককেই পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

নগরের মোহরা এলাকা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা নাজমুল ইসলাম  বলেন, ‘সিএনজিতে করে বাড়ি থেকে বহদ্দারহাট এলেও, এরপরে আর গাড়ি যাচ্ছে না। এখান থেকে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাবো বুঝতে পারছি না। ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশ করতে হবে।’

এদিকে নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, বিআরটিসি, অক্সিজেন দামপাড়া ও একে খান এলাকা থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি বলে খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে আগ্রাবাদ যাবেন সাহেরা বেগম। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। কোনো ধরনের গাড়ি নেই। ৯টার মধ্যে অফিসে যাওয়ার কথা। কিন্তু আজ হয়তো অফিসে যাওয়া হবে না।

কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে বাস না পেয়ে হতাশ শাহরিয়ার। গন্তব্য জিইসি। বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে অটোরিকশা। শাহরিয়ার অভিযোগ করেন, সড়কে অটোরিকশার পরিমাণ কম। কিন্তু ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ।

শাহরিয়ার বলেন, ‘মানুষ বিপদে পড়েছে, এরাও সুযোগ নিচ্ছে। কিছু বলার নেই। সিএনজি চালকরাও ধর্মঘটকারীদেরই অংশ।’

এদিকে শ্রমিকরা শুধু ধর্মঘট ডেকেই ক্ষান্ত হয়নি, অন্য পরিবহনও চলতে দিচ্ছে না। মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশা থেকে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গতঃ পরিবহন শ্রমিকরা এবার ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে তাদের এই কর্মসূচি শেষ হবে। তবে দাবি আদায় না হলে এরপর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এই কর্মসূচি তারা বাধ্য হয়ে নিয়েছেন। এই আইনের বেশ কিছু ধারা শ্রমিক স্বার্থের বিরুদ্ধে করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদরে। এর মাধ্যমে পরিবহন শ্রমিকদের চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

শ্রমিকদের আপত্তির কারণ, আইনে সড়ক দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য না করে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। আর দুর্ঘটনা যদি ইচ্ছাকৃত হত্যা প্রমাণ হয়, তাহলে বিচার হবে ৩০২ ধারায়, সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ফাঁসি।

পরিবহন শ্রমিককের কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, এমনিতেই প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় গাড়ি চালান। তার ওপর আবার বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুর ঝুঁকি। এ কারণে শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা শুরু করে দিয়েছেন।

এ অবস্থায় এই আইনের সংশোধন করা ও বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা নিরসনে আট দফা দাবি জানায় শ্রমিক ফেডারেশন। এর মধ্যে আছে: ১. সড়ক দুর্ঘটনায় সব ধরনের মামলা জামিনযোগ্য করা; ২. শ্রমিকদের অর্থদ- পাঁচ লাখ টাকা করা যাবে না; ৩. সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে; ৪. ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা; ৫. ওয়াস্কেলে (ওজন স্কেল) জরিমানা কমানো ও শাস্তি বাতিল করা; ৬. সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ; ৭. গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকের নিয়োগপত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকা; ৮. সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা এবং লাইসেন্স ইস্যুও ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করা।