চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

কালভার্ট বন্ধ করে পিএইচপির কারখানা!

প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৫ ২৩:৪৪:৪৩ || আপডেট: ২০১৮-১০-২৫ ২৩:৪৬:১৬

কারখানা নির্মাণের জন্য বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কালভার্ট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পিএইচপি গ্রুপের বিরুদ্ধে। ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার ঘোপাল ইউনিয়নের নিজকুঞ্জরা এলাকায় পিএইচপির এ কর্মকাণ্ডের কারণে বেশকিছু ফসলি জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষকে। খবর শেয়ার বিজ

সরেজমিনে নিজকুঞ্জরা এলাকা পরিদর্শন করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারখানা নির্মাণের সুবিধার্থে পানি নিষ্কাশনের তিনটি কালভার্ট বন্ধ করে দিয়েছে পিএইচপি। এতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে ১০ একরেরও বেশি কৃষিজমিতে। এছাড়া আরও ১০০ একরের বেশি জমির চাষাবাদ বিঘিœত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান চৌধুরী জানান, পিএইচপির কারখানা নির্মাণকাজের কারণে প্রায় ১৫০ একর জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মানববন্ধন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। তার অনুলিপি ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরিন আখতারকেও দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও অবহিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পানি নিষ্কাশনে পিএইচপি কর্তৃপক্ষ নর্দমা নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা নিরসন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেন ওই এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান। তার ৫৫ শতক জমি জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম রায়হান জানান, গত কয়েক মৌসুম এসব জমিতে ফসল হয় না। তিনি বিষয়টি জেনে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

এছাড়া রাস্তাঘাট ও স্কুলের মাঠ ডুবে যাওয়ায় এবং বাড়িতে পানি ওঠায় দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হয়েও কোনো ফল পাননি।

এ বিষয়ে স্থানীয় নাগরিক নয়ন চৌধুরী জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই পিএইচপির নির্মাণাধীন কারখানা এলাকায় বাড়িঘর ও সড়ক তলিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে বাড়ির সামনে রাস্তা কেটে অন্য ফসলি জমির ওপর দিয়ে পানি সরাতে হয়। পানির কারণে গোয়ালঘর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকে গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

দিদারুল আলম নামে একজন জানান, পিএইচপির কারখানায় চলমান পাইলিংয়ের কারণে তার নবনির্মিত বাড়িটিতে ফাটল ধরেছে। যে কোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত রোববার সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে নিজকুঞ্জরার বিশাল এলাকাজুড়ে পিএইচপি কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। বিকল্প ব্যবস্থা না করেই তিনটি কালভার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় নিজকুঞ্জরা পশ্চিম পাড়া এলাকার তিনটি মাঠে ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি উপচিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি।

স্থানীয় ঘোপাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল হক মানিক বলেন, এটি ঠিক যে পিএইচপির কারণে মানুষের জমির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। পানি দ্রুত অপসারণে ড্রেন নির্মাণের জন্য পিএইচপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি করছে।

ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল জানান, বিষয়টি তার জানা নেই।

সূত্র আরও জানায়, পিএইচপির কারখানা তৈরি করতে গ্রামীণ সড়ক দখল করা হয়েছে। ওই সড়কে থাকা বনবিভাগের শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কারখানার সামনে ফেলা হচ্ছে স্যান্ড ওয়াশিং প্লান্টের বর্জ্য।

এ ব্যাপারে মুঠোফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে পিএইচপি নির্মাণাধীন কারখানার প্রকল্প পরিচালক বিন্দু দাস কথা বলতে রাজি হননি। পরে তাদের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জনসংযোগের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা দিলশাদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতিবেদন না লেখার জন্য অনুরোধ জানান।

কারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে। পিএইচপির এ কারখানার ক্ষেত্রে তা নেওয়া হলেও পরিবেশ রক্ষাসংক্রান্ত শর্ত উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটি কারখানা নির্মাণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সিনিয়র কেমিস্ট সুকুমার সাহা বলেন, পিএইচপি ছাড়পত্র নিয়ে কাজ শুরু করেছে। যদি তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষিত করার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেনী জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আমরা কালভার্ট বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।