চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

সনদের স্বীকৃতি : হেফাজতের ভাঙ্গন

প্রকাশ: ২০১৮-১০-১০ ১৪:০৭:২৪ || আপডেট: ২০১৮-১০-১০ ২১:২২:৪১

আখতার হোসাইন

দীর্ঘদিন থেকে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ আলেমদের মাঝে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব চলে আসলেও তা কখনো প্রকাশ্যরূপ ধারন করতে দেখা যায়নি। ক্ষোভের আগুনে পুড়লেও হেফাজতে ইসলামের অনেক শীর্ষ আলেম ওলামা এবং নেতৃবৃন্দ মুখ খুলেনি। একটি সনদের স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে দেশের আলোচিত হেফাজতে ইসলামের বিশাল শক্তির ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। এই সনদের স্বীকৃতির ফলে হেফাজতের অস্থিস্ত সংকটে পড়বে বলে ধারণা করছে শীর্ষ আলেমরা।

নীতি আদর্শের প্রশ্নে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে দেশের হক্কানী আলেমদের এই দলটি। দলের সবচেয়ে আস্থাভাজন নেতা আল্লামা শাহ আহমদ শফির সাম্প্রতীক ভুমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন হক্কানী আলেমরা। দেওবন্দের উসুলে হাসতেগানা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ তুলে তারা দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। শাপলা চত্ত্বরের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানী করার অভিযোগেও আলেম সমাজের একাংশ চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন। একারনে হেফাজতে ইসলামে ভাঙ্গনের ঢেউ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

একপক্ষ বলছে সরকার কওমী সনদের স্বীকৃতি দিয়ে কওমীদের সাথে প্রতারণা করেছে। কারণ তারা বলছে যে কোন সরকারী চাকুরী করতে গেলে মাধ্যমিক লেভেল থেকে সর্বোচ্চ সনদ প্রদর্শন করতে হয়। কিন্তু একটি মাত্র সনদ দিয়ে সরকারী তো দূরের কথা প্রাইভেট কোন চাকুরীও পাওয়া যাবে না। বরাবরের মতোই কওমী আলেমদের কাওমী মাদরাসা বা ফোরকানিয়ার শিক্ষক বানানোর এই সনদের কোন মূল্যায়ন হবে না বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।

হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী অভিযোগ করে বলছেন, দেওবন্দের উসুলে হাসতেগানা আদর্শ বিসর্জন দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম ।

হেফাজতে ইসলামের একটি নির্ভরযোগ্য এবং ঘনিষ্ঠ সুত্র জানিয়েছে, হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতে ইসলাম থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। আল্লামা শফির পরই হেফাজতে ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজত থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় চরম হতাশা বিরাজ করছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর অসংখ্য ছাত্রের মধ্যেও এই ক্ষোভ বিরাজ করছে।

হক্কানী আলেমগণ আশংকা ব্যক্ত করে বলেছেন,হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমীর মহিবুল্লাহ বাবুনগরী দল থেকে সড়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে কার্যত দুই ভাগ হয়ে পড়বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

মুফতী আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই নেতা ইসলামী ঐক্যজোট থেকেও পদত্যাগের মৌখিক ঘোষণা দিয়েছেন।

এবিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী জানান, হাটহাজারীর অনুষ্ঠানে কওমি স্বীকৃতি ইস্যুতে আল্লামা শাহ আহমদ শফী যে সব কথা বলেছেন, তা কেন বলেছেন আমার বুঝে আসছে না। শাপলা চত্ত্বরে শহিদদের কথা ভুলে গিয়ে তিনি কিভাবে এমন কথা বলেন ?’

উল্লেখ্য, হাটহাজারীতে বেফাকের অনুষ্ঠানে আল্লামা আহমদ শফী বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ বলেন আমি আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি। তারা কমবখত (নির্বোধ), তারা মিথ্যা কথা বলছে। তবে আওয়ামী লীগ হতেও আমার আপত্তি নেই। কারণ আওয়ামী লীগেও এমন লোক আছে যারা দ্বীনকে ভালবাসে। আওয়ামী লীগের অনেক লোক আমাদের মোটা অংকের অর্থ সাহায্য করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এমনি মহব্বত করে কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আহমদ শফীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেন, তার সাথে আওয়ামী লীগের কি হয়েছে আল্লাহ ভালো জানেন। অথচ সরকার হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার এক দফাও মানেনি। তারপরেও তাদের সঙ্গে কিসের সুসম্পর্ক আমার বুঝে আসে না।’

মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, আমি এখন বেফাকের সাথে সম্পর্ক রাখছি না এবং আমীরও (আল্লামা আহমদ শফি) আমার সাথে যোগাযোগ করছেন না। এছাড়াও আমার প্রতিষ্ঠান (জামিয়া ইসলামিয়া বাবুনগর) বেফাক এর অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংসদে পাস হওয়া কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি বিলে দেওবন্দের আদর্শ বিসর্জন দিয়েছে বলে মনে করেন বাবুনগরী। তিনি বলেন, দেওবন্দের উসুলে হাসতেগানায় সরকারের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক না রাখার কথা বলা আছে কিন্তু এখন বেফাক ও আল্লামা শফি সরকারের সাথে সুসম্পর্ক করছেন, তাদের প্রশংসা করছেন।

অন্যদিকে মুহিব্বুল্লা বাবুনগরী পদত্যাগের পর সারাদেশে আলোচনার ঝড় উঠে। মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীদের মাঝে সৃষ্টি হয় মতভেদ। কওমী মাদরাসা গুলোতেও বিভাজনের প্রভাব। ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে দ্বন্দ্বও ক্রম:শ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা দাবীদার মুফতি ইজহারুল ইসলামও প্রতিনিয়ত আল্লামা শফির সমালোচনা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সভা সমাবেশে তিনি হেফাজতের পথভ্রষ্টতার কথা তুলে ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন। সোস্যাল মিডিয়াতেও হেফাজতের নেতা-কর্মীদের মাঝে বাকবিতন্ডা চলছে।

নাম প্রকাশ না করেন হেফাজতের এক প্রভাবশালী নেতা বলেন, হাতে গুনা সাত আট জন ইসলামী ঐক্যজোটের নেতার কারণে আজ কওমী আলেমদের মাঝে বিভাজন হচ্ছে। সরকারের সাথে আতাতের মাধ্যমে ঐক্যজোটের কয়েকজন নেতা হেফাজতের ভাঙ্গনে মূখ্যভূমিকা পালন করছে বলেও তিনি দাবী করেন। এই কয়েক জন নেতাই চলচাতুরী মাধ্যমে সরকারী সুবিধাভোগ করার জন্য আল্লামা শাহ আহমদ শফিকেও বিভ্রন্তি করছে। তবে তিনি হুশিয়ার করে বলেন, যারা এই কাজে লিপ্ত হয়েছে তাদেরকে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাদের স্থান ইসলামী দলের কোথাও হবে না।