চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

আতঙ্ক কাটেনি গ্রামবাসীর, আঞ্জুমানে দাফন সম্পন্ন দুই জঙ্গির

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৭ ১৪:১২:১৮ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৭ ১৪:১২:৪৯

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জঙ্গি আস্তানায় নিহত দুই জঙ্গির লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছে। শনিবার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা রাতে দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জোরারগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মুক্তার হোসেন।

এদিকে জঙ্গি আস্তনায় অভিযানের ৪৮ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামের বাসিন্দাদের। জঙ্গি আস্তানায় বোমার আঘাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গিদের দেহের অবশিষ্ঠাংশের পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামের জঙ্গি আস্তানা চৌধুরী ম্যানশনে গিয়ে দেখা যায় শুনশান নীরবতা। জোরারগঞ্জ থানার পুলিশ কনষ্টেবল রাজিব দে ও আনসার ভিডিপি সদস্য আকতারুজ্জামান বাড়িটির নিরাপত্তায় সকাল ৮টা থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। গত শুক্রবার বিকেল থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আরেকটি টিম দায়িত্ব পালন করেছিলো। জঙ্গি আস্তানার ভেতরে এবং বাইরে জঙ্গিদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বাড়ির ভেতরের এবং বাইরে ছড়িয়ে থাকা মাংসের টুকরো অংশ থেকে পঁচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। জঙ্গিরা আইইডি (ইম্প্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরণের মাধ্যমে আত্মহত্যা করার পর ৫কক্ষ বিশিষ্ট টিন শেড ব্লিডিং ঘরটির ভেতরের অংশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে রয়েছে। ঘরের জানালার কাঁচগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঘরের ভেতর ইটের ২টি দেওয়াল বোমার আঘাতে ভেঙ্গে গেছে। ফাঁটল দেখা দিয়েছে বাড়ির চারপাশের ওয়ালেও। বাড়ির উপরে টিনের চাল উড়ে যাওয়ার কারণে ঘরের ভেতর থেকে আকাশ দেখা যাচ্ছে। চৌধুরী ম্যানশনের বাড়ির কয়েকটি টিন ১’শ গজ দূরে অবস্থিত পাশ্ববর্তী ইন্দু মিয়া প্রকাশ মুন্সী মিয়ার বাড়ির গাছের ডগায় ঝুলে থাকতে দেখা গেছে। বাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যাত্রাপথে যাত্রীবাহী গাড়িগুলো স্লো করে গাড়ি থেকে বাড়িটি দেখে যাচ্ছে।

চৌধুরী ম্যানশনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জোরারগঞ্জ থানার পুলিশ কনস্টেবল রাজিব দে জানান, শুক্রবার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান সমাপ্তির পর থেকে বাড়িটির নিরাপত্তায় একজন পুলিশ সদস্য ও একজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করে আসছে। রাত্রেও একটি টিম ডিউটি করেছে। আমরা সকাল থেকে এসেছি। শনিবার সকাল থেকে উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামের এবং উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন বাড়িটি দেখার জন্য আসতেছে। জঙ্গিদের আত্মগাতি বোমা বিস্ফোরণের পর বাড়িটির সর্বশেষ অবস্থা দেখার জন্য এলাকাবাসীর মধ্যে কৌতূহল লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন লোকজন এলেও কাউকে ভেতরে ডুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তবে জঙ্গি আস্তানার ভেতর থেকে মাংস পঁচার দুর্গন্ধ আসার কারণে দায়িত্ব পালন করতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

শনিবার সকালে জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে কথা হয় চৌধুরী ম্যানশনের মালিক মজহার ইসলাম চৌধুরীর মামা নাসির উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোহেল নামের এক যুবক তার স্ত্রী নিয়ে চৌধুরী ম্যানশনে ভাড়া থাকার বিষয়ে কথা বলতে আসেন। আমার বাগিনার (মজহার ইসলাম চৌধুরী) অবর্তমানে তার বাড়িটির দেখাশোনা আমি করি। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য স্থানীয় হকসাব নামে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তারা ঘর দেখে ৩টি রুম ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় থাকবে বলে জানায়। এসময় তারা অক্টোবর মাসের ১ তারিখ তাদের নাম ঠিকানার কাগজপত্র দিয়ে বাসায় উঠার কথা থাকলেও পরিবারে মালামাল বেশী হওয়ায় কিছু মালামাল অগ্রিম রেখে যেতে চায়। প্রাথমিক ভাবে সোহেল নিজেকে চট্টগ্রাম মহানগরের ইপিজেড এলাকার ছনখোলা গ্রামের বাসিন্দা বলে দাবী করে। আর তার সাথে থাকা মহিলাটিকে তার স্ত্রী পরিচয় দেয়। মহিলাটি নিজের নাম না বললেও সে মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেয়। পরবর্তীতে ১ অক্টোবর সোহেলের কাজে তাদের ঠিকানার কাগজ চাইলে সে বলে, তার স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কাগজপত্র স্ত্রীর সাথে তার ব্যাগে রয়েছে। স্ত্রীকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসলে শুক্রবার দিবেন। এসময় বাসায় সোহেলের সাথে আরো ১জন যুবক ছিলো। শুক্রবার সকালে জানতে পারি যারা ভাড়া নিয়েছিলো তারা জেএমবির সদস্য। এছাড়া উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক বিএসসি তার পরিচিত বিএসআরএমের আরেকজন শ্রমিক নাঈমুল ইসলামকে থাকার জন্য গত বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টম্বর) সকালে আমার সাথে কথা বলেন। আমি বাসার ২টি রুম খালি থাকায় সেগুলো তাকে ভাড়া দিই। ওইদিন সন্ধ্যা থেকে নাঈমুল ইসলাম বাসায় উঠে। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের অভিযানের সময় নাঈমুল ইসলাম, আমার বাগিনা মজহার ইসলাম চৌধুরী ও কেয়ারটেকার খানসাবকে আটক করে র‌্যাব।
স্থানীয় গৃহিনী তাহেরা বেগম বলেন, জঙ্গি আস্তানা রাতভর গোলাগুলির ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসতেছে। রাত হলে মনে হয় আবার শুরু হবে গোলাগুলি। জঙ্গিরা আমাদের বাড়ির পাশে আস্তানা করলেও তাদের কখনো দেখেননি বলে জানান তিনি। জঙ্গি আস্তানা থেকে বাতাসে ভেসে আসা দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না। বাড়ির পাশে জঙ্গি আস্তানার ঘটনায় বাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

স্থানীয় কৃষক হারুনুর রশীদ বলেন, আমাদের এলাকায় বিএসআরএম শিল্প কারখানার কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা শ্রমিকরা এখানে ভাড়ায় থাকেন। ভাটাটিয়াদের মধ্যে কে জঙ্গি কে ভালো তা চিহ্নিত করা প্রশাসনের উচিত। এভাবে গ্রামের মধ্যে জঙ্গিরা আস্তানা করলে এলাকায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে যাবে।

জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ ইফতেখার হাসান বলেন, জঙ্গি আস্তানায় অস্ত্র এবং বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় র‌্যাবের একজন সিপিও অফিসার বাদী হয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তের জন্য থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাব-৭ এর উপ-পরিচালক (মিডিয়া) শাফায়াত জামিল ফাহিম বলেন, জঙ্গি আস্তানায় অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় শনিবার সকালে জোরারগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। জঙ্গি আস্তানায় নিহতদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। নিহতদের ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাদের দাফন করা হবে। জঙ্গি আস্তানায় যাতায়াতকারী ১ মহিলা সহ অপর ২ পুরুষ জঙ্গিকে আটকের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় আটক বাড়ির মালিক মোঃ মজহার ইসলাম চৌধুরী, কেয়ারটেকার হকসাব ও বিএসআরএমের অপর শ্রমিক নাঈমুল ইসলামকে মামলায় আটক দেখানো হয়নি। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হবে। যদি ঘটনার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে পরবর্তীতে এ মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানান তিনি।