চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ‘বোমা আলম’ এর কাছে আট ব্যাংকের পাওনা ২৫০ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৬ ১৬:১২:১০ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৬ ২০:২৪:৩২

ব্যাংকের টাকায় ব্যবসা করেছেন। একের পর এক ঋণ পেয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবে, ব্যবসায়িক সুনামের জন্য নয়। সেই ঋণে সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে বছর বছর। যদিও ব্যাংকের টাকা ফেরত দেননি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহ আলম। খাতুনগঞ্জে বোমা আলম নামেই যিনি বেশি পরিচিত। বর্তমানে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আটটি ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা, যার সবই এখন খেলাপি। খবর – বণিক বার্তা

পাওনাদার ব্যাংকগুলোর তথ্যমতে, আলম অ্যান্ড কোং-এর কাছে সবচেয়ে বেশি পাওনা রয়েছে পূবালী ব্যাংকের। এক সময় ব্যাংকটির সদরঘাট শাখার বড় গ্রাহক ছিল প্রতিষ্ঠানটি। রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের এজেন্ট হিসেবে তখন ভালো ব্যবসা করত আলম অ্যান্ড কোং। সবচেয়ে বড় এ গ্রাহক এখন শাখাটির সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি।

ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, আলম অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী শাহ আলম ২০১১-১২ সালে পূবালী ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ সুবিধা নিয়ে আমদানি ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় নেয়া ঋণগুলো আর ফেরত আসেনি ব্যাংকের কাছে। ওই সময়ই শাহ আলমের কাছে পূবালী ব্যাংকের ৫০ কোটি টাকার বেশি আটকে যায়।

পূবালী ব্যাংক থেকে এ ঋণ সুবিধা নেয়া হয়েছিল আলম অ্যান্ড কোং ও এইচ আহমেদ অ্যান্ড সন্সের নামে। চার বছরেও ঋণের টাকা ফেরত না পাওয়ায় ২০১৫ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে পূবালী ব্যাংক। অর্থঋণ মামলায় রায় হওয়ার পর এখন মামলাটি জারি মামলা হিসেবে রয়েছে।

এ ঋণের বিপরীতে আলম অ্যান্ড কোং-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হোটেল হিরো সিটি, খুলশীর বাড়ি ও মাশরিফা ফুড প্রডাক্টসের জমিসহ স্থাপনাগুলো বন্ধক রাখা আছে। কিন্তু সে সম্পত্তির মূল্য ঋণের অংকের তুলনায় যথেষ্ট কম। ফলে জারি মামলায় রায় হলেও এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনার ৩০ শতাংশও আদায় হবে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, প্রচুর সম্পদ থাকার পরও শাহ আলম ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছেন না। শুরুর দিকে তাকে ভালো গ্রাহক বলেই মনে হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে টাকা পরিশোধ না করায় তার বিরুদ্ধে আমরা ২৭টি মামলা করেছি। আইনি প্রক্রিয়ায় তার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

শাহ আলমের কাছে পূবালী ব্যাংকের সমপরিমাণ পাওনা রয়েছে এনসিসি ব্যাংকের। শাহ আলমের অপর প্রতিষ্ঠান আসাদ করপোরেশনের কাছে ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার ঋণ ৫০ কোটি টাকার বেশি।

২০১২ সালে গম আমদানিতে এ ঋণ সুবিধা নেন আসাদ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী শাহ আলম। আমদানিকৃত গমে লোকসান দেয়ার কথা বলে ঋণের টাকা আর ফেরত দেননি।

এনসিসি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদিন বলেন, প্রায় প্রতিদিনই টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী। কিন্তু দীর্ঘ অর্ধযুগেও ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি। টাকা ফেরত না পাওয়ায় আমরা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। ৫০ কোটি টাকা পাওনা আদায়ে এরই মধ্যে এনআই অ্যাক্টে মামলা দায়ের করেছি। এছাড়া অর্থঋণ আদালতেও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

৫০ কোটি পাওনার বিপরীতে এনসিসি ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ১১ কাঠা জমিসহ তিনটি ভবন বন্ধক রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব বন্ধকি সম্পত্তির বর্তমান বাজার মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি নয়।

শাহ আলমের আরেক প্রতিষ্ঠান আলম এন্টারপ্রাইজের কাছে ব্যাংক এশিয়া খাতুনগঞ্জ শাখারও প্রায় ২৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। ব্যাংকটির তথ্যমতে, ২০০৭ সাল থেকে ব্যাংক এশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে আলম এন্টারপ্রাইজ। এর মধ্যে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির দেয়া ঋণগুলো আটকে গেছে। গম ও চিনি আমদানির জন্য এ ঋণ সুবিধা নিয়েছিল আলম এন্টারপ্রাইজ।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা থাকায় সহজেই ঋণ পেয়েছে আলম এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু ২০১২ সালে ভোগ্যপণ্যের বাজারে মন্দার সময় প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া ঋণ আটকে যায়। বহু চেষ্টার পরও ঋণের টাকা ফেরত না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতে যেতে হয়েছে ব্যাংক এশিয়াকে। ঋণ আদায়ে ২০১৫ সালে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে জারি মামলায় রয়েছে। তবে এ মামলায় প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে।

শাহ আলমের কাছে ২৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের। ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার জন্য ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এ ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই এ ঋণ সুবিধা পান শাহ আলম। কিন্তু ২০১০-১১ সালের দিকে ভোগ্যপণ্যের বাজারে মন্দা ও বাজার থেকে উধাও হওয়া ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা আটকে যাওয়ায় খেলাপি হয়ে পড়ে শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান।

ওয়ান ব্যাংকেরও ১৪ কোটি টাকা আটকে গেছে শাহ আলমের কাছে। ওয়ান ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রাশেদুল আমিন বলেন, ২০১১ সালে ভোগ্যপণ্য ব্যবসার জন্য ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ঋণ নেয় শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান শাওন অ্যান্ড সন্স। কিন্তু সেই ঋণ এখনো অনাদায়ী। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ওয়ান ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে বর্তমানে ১৪ কোটি টাকা। পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় এ টাকা আদায় কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লোকাল এলসি ও ভোগ্যপণ্যে আলম অ্যান্ড কোং-কে ঋণ সুবিধা দেয় সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক জিইসি শাখা। ভোগ্যপণ্যে লোকসানের কথা বলে সে ঋণ আর ফেরত দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আলম অ্যান্ড কোং-এর কাছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। পাওনা আদায়ে ২০১৫ সালে মামলা দায়ের করেছে ব্যাংকটি। অর্থঋণ আদালত থেকে রায় হওয়ার পর মামলাটি এখন জারি মামলা হিসেবে রয়েছে। কিন্তু ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির জামানত খুবই কম হওয়ায় বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে আদায় হবে ঋণের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।

এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির কাছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ শাখার ৮ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখারও বড় অংকের পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

আলম অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী শাহ আলম মূলত নিজের ব্যবসা বা কাজের চেয়ে গল্প করে অন্য ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের মন জয়েই বেশি আগ্রহী। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই মূলত ঋণ সুবিধা পেয়েছেন। ফলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী পাড়ায় শাহ আলমের চেয়ে বোমা আলম নামেই বেশি পরিচিত তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলম অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী শাহ আলম পৈতৃক সূত্রে পান চট্টগ্রামের সদরঘাট রুটের ‘হোটেল হিরো সিটি’। হোটেলের নিচতলায় ছিল এয়ার বাংলা ট্রাভেল। এরপর বিএসআরএমের এজেন্ট। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালের দিকে খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্য ব্যবসা শুরু করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০১১-১২ সাল পর্যন্ত ভোগ্যপণ্য ব্যবসা ও আমদানিতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন।

পাওনাদার ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলম অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী শাহ আলম ব্যাংকের এ টাকায় ব্যবসা করে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বাড়িয়েছেন। কিন্তু ব্যাংকের টাকা শোধ করছেন না। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করে ব্যাংকে এসে সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা দাবি করছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এখনো খাতুনগঞ্জের আবছার চৌধুরী মার্কেটে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গম, তেল, চিনি, চাল ও ডালের ব্যবসা ছাড়িয়ে নগরীর সিলিমপুরে গড়ে তুলেছেন ডাল ও আটা-ময়দার কারখানা। আলম অ্যান্ড কোং-এর বোতলজাত পানি মামিয়ার বিক্রিও ভালো চট্টগ্রামের বাজারে। অথচ ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করছেন না।

জানতে চাইলে আলম অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী শাহ আলম বলেন, ব্যাংকের টাকায় ব্যবসা করেছি ঠিক। কিন্তু ২০১২-১৩ সালে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। তাছাড়া এখনো অনেক টাকা বাজারে বকেয়া রয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকের টাকা আটকে গেছে। আমাদের নেয়া ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা। সুদাসলে এখন তা ২০০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। চেষ্টা করছি সুদ মওকুফ সুবিধা নিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে।