চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮

বউ নিতে আসেনি সেই চিংড়ি জামাই

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ২১:০২:০৩ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৫ ২৩:৪৫:৩৮

চট্টগ্রামের আনোয়ার সেই চিংড়ি-জামাই সালিশে গিয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও এবার বউ চাচ্ছেন ফ্রিতে। তবে এভাবে নিজের কন্যাকে দেয়া যাবে না বলে বেঁকে বসেছেন সেই চিংড়ির জামাইর শ্বশুর মশাই।

কনের বাবা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সালিশকারকদের রায় মেনে কন্যাকে দিবো বলেছিলাম। তবে তারাতো (ছেলে পক্ষ) সেই রায়ের আলোকে দণ্ড না গুনেই ফ্রিতে আমার কন্যাকে চাইছেন। মেয়েকে এমনভাবে গাংয়ের জলে ভাসিয়ে দিতে পারি না!

তিনি বলেন, এসব আর ভাল লাগছে না। আমার মেয়ের জীবন নিয়ে তারা তামাশা করছে। ছেলের বাবা জানিয়েছে সালিশি বৈঠকের রায়ের সেই সব নিরাপত্তা ডিপোজিট দেয়া সম্বব নয়।

শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় সর্বশেষ কনের বাবার সাথে আলাপকালে জানান, তখনও বউ তুলে নিতে আসেনি কেউ। একদিন আগে বরের বাবা ফোনে বলেছিলেন, এমনিতে (ফ্রিতে) দিলে তারা বউ নিতে আসবেন। তবে দণ্ডগুণে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই আমিও সাফ বলে দিয়েছি, নিতে হলে রায়ের আলোকেই নিতে হবে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিয়ের প্রীতিভোজের খাবারের মেন্যুতে চিংড়ি না পেয়ে তুলকালাম কাণ্ডঘটানোর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি মীমাংশায় এক সালিশি বৈঠক বসে ১ অক্টোবর সোমবার দিনগত রাতে। আর সেই বৈঠকে সালিশকারকরা সিদ্ধান্ত দেন শুক্রবার (৫ অক্টোবর) নববধুকে ঘরে তুলে নেবেন নতুন জামাই।

এর আগে মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তায় ৩ লাখ টাকার ব্যাংক ডিপোজিট করে দিবেন। ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের মধ্যে ব্যাংক হিসাব খুলে শুক্রবার নববধুকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলেন সেদিন। তবে কথা দিয়েও কথা রাখেননি সেই চিংড়ি জামাই। ক্ষমা চাওয়ার পর এখন ফ্রিতেই বউ দেয়ার আবদার করছেন তিনি।

সালিশে দেয়া কথা না রেখে বরপক্ষের ডিগবাজি ও চারপাশের কানাঘুসায় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন কনের বাবা মোহাম্মদ হোসেন।

ভারাক্রান্ত মনে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, এমনিতে মেয়ে তুলে দেয়াতো সম্ভব না। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, তারা (ছেলে পক্ষ) কথা দিয়েও কথা রাখেনি। এখন মনে হচ্ছে বিয়েটা ভাঙ্গাভাঙ্গি হয়ে গেলেই মঙ্গল হবে আমার মেয়ে।

যে গ্রামের ছেলে সেই চিংড়ি জামাই

আনোয়ারা উপজেলার ১১নং জুইদন্ডী ইউনিয়নের ৮নং খুরসকুল গ্রামের হাজী বাড়ীর আবদুল মোনাফের ছেলে মোহাম্মদ আলমগীর (৩০) ওরফে চিংড়ি জামাই। দীর্ঘদিন পর প্রবাস থেকে এসে বিয়ে করার জন্য কনে দেখা শুরু করেন। পছন্দ হয় পাশের জুইদণ্ডি গ্রামের মোহাম্মদ হোসেনের কন্যাকে। গত চার মাস আগে ইসলামি শরিয়ত মতে তাদের আকদ (কাবিন ও বিয়ে) সম্পন্ন হয়। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর ওই উপজেলার বটতলী আলভী ম্যারেজ গার্ডেনে নামের এক কমিউনিটি সেন্টারে প্রীতিভোজের আয়োজন ছিল।

চিংড়ি জন্য বরের যে কাণ্ড!

মধ্যপ্রাচ্যের আমিরাত প্রবাসী বর বলে কথা! বরের চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে কনেপক্ষ ৫শ বরযাত্রীসহ প্রায় ৮শ লোকের জন্য সেদিন প্রীতিভোজের আয়োজন ছিলো সেই কমিউনিটি সেন্টারে। মুরগির রোস্ট, গরু গোস্ত-কোরমাসহ নানা ম্যানু ছিলো সেই ভোজের আয়োজনে। কিন্তু বরের চাওয়া ছিলো আস্ত চিংড়ি ভুনা।

সেদিন খেতে বসে খাবার মেন্যুতে চিংড়ি মাছ না দেখে ক্ষেপে যান বর আলমগীর। শুরু হয় বাকবিতণ্ডা, এরপর একপর্যায়ে তা গড়ায় হাতাহাতিতে। পরে পরিস্থিতি সামলাতে খবর দেয়া হয় থানা পুলিশকে।

খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে এর দু’দিন পর জানতে পারেন বেরসিক সাংবাদিক। সংবাদ প্রকাশের সাথে সাথে সামাজিক মাধ্যমে তা ভাইরাল হয়ে পৌঁছে যায় দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমেও। এই নিয়ে চারদিকে চলছে সমালোচনার ঝড়!

চিংড়ি নিয়ে যা বললেন বরের চাচা!

বরের চাচা শেয়ার আলীও সেদিন বিয়েতে ছিলেন। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বিয়েতে আমাদের (বরের পক্ষে) সাড়ে ৩শ গরবা (অতিথি বরযাত্রী) যাওয়ার কথা ছিল। তবে ক্লাবে পোয়ার (ছেলে-আলমগীরের) উশৃঙ্খল আচরণের পর অনেকে না খেয়ে চলে গেছেন। খরচ কমানোর জন্য কনে পক্ষকে আমরা বলেছিলাম কোরমা না করে ছোট আকারে চিংড়ি দেয়ার জন্য। তবে শুনতে পেলাম তারা গরু কিনে কোরমাসহ নানাপদ করেছে।

বরের চাচা শেয়ার আলীর ভাষ্য, আসলে বাইরের কয়েকজন ফোন করে ছেলেকে খাবার নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলার কারণে সে না বুঝেই এমনটা করে ফেলেছে। যার জন্য আমরা চরম লজ্জিত! তার এমন আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থী।

বরকে যা দিয়েছেন কনের বাবা

বয়োবৃদ্ধ আহমদ শফি কনের নানা। সেদিন বিয়েতে তিনিও ছিলেন। তিনি বললেন, নাতনির বিয়ে মনটা অনেক বড় ছিলো। দু’পক্ষ আলোচনা করেই দু’পক্ষের ৮শ লোকের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। বরকে উপহার হিসেবে ৬২ হাজার টাকার ফার্নিচারসহ আনুষঙ্গিক (লেপ, তোষক, হাড়ি, পাতিলসহ রান্নাঘরের লবনের বাটি পর্যন্ত) উপহার সামগ্রী হিসেবে দেয়া হয়।

কিন্তু খাবারের মেন্যুতে চিংড়ি না পেয়ে নাতিন জামাই উত্তেজিত হয়ে বললো, আজিয়া লই যাইয়্যুম, হালিয়া ছাড়ি দিয়্যুম, (চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায়-আজ নিয়ে যাবো, কাল ছেড়ে দেবো)। এই কথা শুনে সেদিন নাতনিকে তুলে দেইনি। চেয়েছিলাম একটা সুন্দর সমাধান।

কী হয়েছিলো সেই সালিশি বৈঠক !

বিয়ের প্রীতিভোজের মেন্যুতে চিংড়ি না পেয়ে বরের চিংড়ি কাণ্ডের পর গত ১ অক্টোবর স্থানীয় বটতলী রুস্তমহাটে দু’পক্ষের আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে সালিশি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে রুস্তমহাটে স্থানীয় বটতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী এবং বরুমছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ছাড়াও অনেক লোক উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন সেই চিংড়ি বরের বাবা আবদুল মোনাফ, চাচা শেয়ার আলী, কনের বাবা মোহাম্মদ হোসেন, নানা আহমদ শফি, আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম, আলমগীর আজাদ, জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ বাবু, বিয়ের মধ্যস্থতাকারী নুরুল ইসলাম।

কনের ভবিষ্যৎ আরো নিরাপদ করতে কনেকে তুলে নেয়ার আগে তার নামে ৩ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে দেবে বর। এছাড়া ৭ লাখ টাকার দেনমোহর ও ৮০ হাজার টাকা উসুল দেয়ার পূর্বের সিদ্ধান্তও বলবৎ থাকবে। এমন সিদ্ধান্ত দেয়া হয় সেই সালিশ বৈঠকের রায়ে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা সুমন শাহ বলেন, দু’পক্ষের পক্ষের আলোচনার পর বিয়ে অনুষ্ঠানে অনাকাংখিত আচরণের জন্য ক্ষমা চান বর মোহাম্মদ আলমগীর। কনের বাবা মোহাম্মদ হোসেন সবকিছু ভুলে মেয়ে জামাতা আলমগীরকে বুকে টেনে নেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়, ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের মধ্যে ফিক্সড ডিপোজিটের পর শুক্রবার (৫ অক্টোবর) নববধূকে ঘরে তুলে নিবে বর।

কিন্তু শুনতে পেলাম, বরপক্ষ নাকি কনে তুলে না নিয়ে এখন উল্টো পিছটান দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কী বলছেন সেদিনের সালিশকারকরা!

শাহাদাত হোসেন চৌধুরী স্থানীয় বৈরুমছড়া ইউপি চেয়ারম্যান। তিনি সেই সালিশ বৈঠকের বিচারকদের একজন। তিনি বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার বউ ঘরে তুলে নিবেন বলেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত না মেনে যা করেছেন ভালো কিছু করেননি। পরবতী করণীয় ভাবছি এমনটাই বললেন, চেযারম্যান শাহাদাত হোসেন চৌধুরী।

বরের গ্রামের লোকদের কথা !

বরপক্ষের গ্রামের বাসিন্দা ও জুইদণ্ডি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বললেন, সালিশের পর এখন এমনটা করার সুযোগ নেই।

বিয়ের উকিল নুরুল ইসলাম বললেন, শুনলাম বরের হাতে এই মুহুর্তে নগদ টাকা নেই। কিন্তু আলোচনার পথতো আছে! তা সমাধানের জন্য আলোচনায় না বসে বা কনের বাবার সাথে কথা না বলে এভাবে খাম-খেয়ালিপনায় ভালো কিছু দেখছি না।

কি বলছেন সেই বর ও বরের বাবা!

বর ও বরের বাবার বক্তব্য জানতে মোবাইলে না পেয়ে সেই খুসুরকুল গ্রামে যায় এই প্রতিবেদক। তবে সকাল থেকেই চিংড়ি বর আলমীর ও তার বাবা আবদুল মোনাফ অবস্থান করছেন বলে বাড়ির লোকজন জানান। তবে তারাও এই বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।