চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

যেভাবে শুরু এবং শেষ মিরসরাইয়ের জঙ্গি আস্তানায় অভিযান

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ১৯:৫০:৫৪ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৬ ১৪:১৭:১৫

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি ভাড়া বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্ধান পেয়ে অভিযান পরিচালনা করেছেন র‌্যাব। বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টা থেকে অভিযান শুরু করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে ওই বাড়ি থেকে দুই জঙ্গির ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার করা অন্য জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই বাড়িটি জঙ্গিদের আস্তানা বলে জানা গেছে। বাড়িটি ঘেরাও করার পর র‌্যাব মাইকে জঙ্গিদের প্রতি আত্মসমর্পণের অনুরোধ জানায়। জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করে র‌্যাবের দিকে গুলি ছোড়ে। তখন দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এরপর ভোররাত চারটা ২২ মিনিটে বাড়ির ভেতর থেকে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঘটনাটি বড় ধরনের বোঝার পর র‌্যাবের ওই দলের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে পরে আরও সদস্য যোগ দেন। এখন সেখানে অভিযানে র‌্যাবের ১৫০ সদস্য রয়েছেন। সকাল নয়টার দিকে ঢাকায় র‌্যাবের সদর দপ্তর থেকে বোমা নিষিক্রয়করণ দল আসার পর বাড়ির ভেতরে অভিযান শুরু হয়।

র‌্যাবের পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১৮ জন ও আগষ্ট মাসে ১৭ জঙ্গি আটক করা হয়। আটককৃত জঙ্গিদের দেওয়া তথ্যানুসারে চট্টগ্রামে জেএমবির একটি গ্রুপ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান করে শুক্রবার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৩টায় র‌্যাব-৭ মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানার উত্তর সোনাপাহাড় এলাকার চৌধুরী ম্যানসনের জঙ্গি আস্তানা ঘিরে অভিযান পরিচালনা করা হয়। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা ঘরের ভেতর থেকে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি ছোঁড়ে। এরপর র‌্যাব মাইকিং করে জঙ্গিদের আত্মসমর্পনের জন্য বললে তারা একাধারে গুলি করতে থাকে। পরবর্তীতে র‌্যাবও আত্মরক্ষাতে গুলি করে। এভাবে রাত ৪টা পর্যন্ত গুলি বিনিময় চলে।

সর্বশেষ রাত ৪ টা ২০ মিনিটের সময় জঙ্গিরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসময় বিকট শব্দে মহূর্ত্বের মধ্য টিনশেটের ঘরটির টিন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়। জঙ্গিরা আস্তানাটিতে গ্রেনেড তৈরী করে চট্টগ্রাম আদালত সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে জানান তিনি। এরপর সকাল ৯টায় ঢাকা থেকে আসা র‌্যাবের বোমা নিষ্কৃয়কারী দল জঙ্গি আস্তানায় প্রবেশ করে। দীর্ঘ ২ ঘন্টা অভিযান শেষে বাড়ির বাহির থেকে ২টি এবং ভেতর থেকে ৩টি গ্রেনেড, ৩টি পিস্তল, একে ২২ রাইফেল ১টি, ৩টি চাপাতি, ১টি সুসাইডভেষ্ট সহ বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ঘরের ভেতর বিষ্ফোরিত গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন ২ জন পুরুষ জঙ্গির মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া জিহাদী ৫টি জিহাদী বই উদ্ধার করা হয়। জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত ২টি গ্রেনেড নিষ্কৃয় করেছে বোমা ডিস্ফোজাল ইউনিট।

মুফতি মাহমুদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই বাড়িটিতে জঙ্গিদের অবস্থানের তথ্য জানতে পেরে র‌্যাব অভিযান শুরু করে। এখানে বসবাসকারী জঙ্গিরা নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য। তাঁরা চট্টগ্রাম আদালতে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি জানান, বাড়িতে একে২২ বোরের একটি রাইফেল, তিনটি পিস্তল ও পাঁচটি গ্রেনেড পাওয়া গেছে। অস্ত্রগুলোর সঙ্গে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।

জঙ্গি আস্তানা থেকে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। বাড়িটির ভেতরে বড় ধরনের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে র‌্যাব। বিস্ফোরণে একতলা টিনশেডের বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে। ঢাকা থেকে বোমা নিষিক্রয়করণ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সকাল নয়টায় বাড়ির ভেতরে অভিযান শুরু করে। সেখান থেকে একটি বোমা উদ্ধার করে পাশের খালি জমিতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বাড়ির মালিক মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী ও তত্ত্বাবাবধায়ককে আটক করেছে র‌্যাব। এছাড়া ওই বাড়ির অন্য একটি কক্ষে থাকা নাঈম নামে একজনকে আটক করা হয়। বাড়ির মালিক মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী উপজেলার ৬ নং ইছাখালী ইউনিয়নের জমাদার গ্রামের মাহবুবুর রহমান চৌধুরীর পুত্র। আর তত্ত্বাবধায়ক হক সাহেবের বাড়ি বারইয়ারহাট পৌরসভার উত্তর সোনা পাহাড় এলাকায়।

র‌্যাব জানায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর চৌধুরী ম্যানসনের কেয়ারটেকার হকসাহেবের কাছ থেকে ৩টি কক্ষ মাসিক ৫ হাজার টাকায় ভাড়া নেয় সোহেল নামে একজন। সে পাশ্ববর্তি বিএসআরএম কারখানায় চাকরী করে বলে জানায়। ভাড়া নেয়া বাসায় দুইজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা ভাড়া থাকতো।

র‌্যাব ও স্থানীয় লোকজন সূত্রে জানা গেছে, উত্তর সোনাপাহাড় এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একবারে লাগোয়া পূর্বদিকে বাড়িটির অবস্থান। বাড়ির মালিক মাজহারুল ইসলাম পাঁচ কক্ষের বাড়িটি ভাড়া দিয়ে পার্শ্ববর্তী অন্য এলাকায় ভাড়া থাকেন। দুজনকে রাতেই আটক করে নিয়ে যায় র‌্যাব। তবে তাঁরা র‌্যাবকে কী তথ্য দিয়েছেন বা বাড়িটিতে কত লোক অবস্থান করছেন, তা জানা যায়নি। র‌্যাব রাত সাড়ে তিনটার দিকে অভিযান শুরু করার সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী সড়কের লেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় বিকল্প পথে যানবাহন চলাচল করে। ঘণ্টা খানেক পর ওই লেন খুলে দেওয়া হয়। সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

ঘটনাস্থলের চারপাশ র‌্যাব ও পুলিশ ঘিরে রেখেছে। প্রচুরসংখ্যক স্থানীয় লোক সেখানে ভিড় করেছেন। তবে বাড়িটির কাছাকাছি কাউকে ভিড়তে দেয়নি র‌্যাব ও পুলিশ। গুলি ও বোমার আঘাতে বাড়িটির জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে। দেয়ালের জায়গায় জায়গায় গুলির চিহ্ন। বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণের পর বাড়ির টিনের চালা উড়ে যায়।

জঙ্গি আস্তানার পাশের বাড়ির বৃদ্ধ আবুল হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার আনুমানিক রাত ৩ টার দিকে পুলিশ তাদের বাড়ি থেকে বাইরে যেতে বলে। পুলিশ তাকে জানায়, চৌধুরী ম্যানসনে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করতে তাই তাদের নিরাপদ দুরত্বে থাকতে হবে এবং পরবর্তি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকতে হবে। দুপুর ২ টা পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে রয়েছেন।

এলাকাবাসী মোঃ তারেক, গৃহিনী ইসমতআরা জানান, রাত সাড়ে তিনটা থেকে-সাড়ে ৪টা পর্যন্ত গুলি ও বোমার বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙ্গে যায়। পরে জানতে পারি চৌধুরী ম্যানসনে জঙ্গি রয়েছে। র‌্যাব সেখানে অভিযান পরিচালনা করছেন।

জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ভাসানী বলেন, মিরসরাইয়ে পাহাড়ি এলাকা কাছে হওয়ায় জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তুলছেন। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথও তাদের যোগাযোগের জন্য সুবিধার কারণে এই এলাকাকে বেচে নিচ্ছেন তারা। তিনি এলাকার লোকজনকে নতুন ভাড়াটিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে ভাড়া দেয়া ও অপরিচিত লোকের আনাগোনা দেখলে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের খবর নেয়ার অনুরোধ জানান।

চট্টগ্রাম আদালতে হামলার পরিকল্পনা ছিল জেএমবি’র
গতকাল শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও মিডিয়া উইং এর পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত দুই মাসে র‌্যাব ৩০ জন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের জিঙ্গাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরসরাইয়ে অভিযান চালানো হয়। আমাদের কাছে তথ্য ছিল একটি গ্রুপ চট্টগ্রাম আদালতে নাশকতার উদ্দেশ্যে প্রস্তুুতি নিচ্ছিল।

স্পর্শকাতর জায়গায় ‘জঙ্গিরা’ এক সপ্তাহ আগে বাড়িটি ভাড়া নেয়
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাত্র ১০ গজ দূরত্বে ‘চৌধুরী ম্যানসন’ নামের বাড়িটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথও বেশি দূরে নয়। স্পর্শকাতর এমন জায়গায় ‘জঙ্গিরা’ বাড়িটি ভাড়া নেয় মাত্র এক সপ্তাহ আগে। র‌্যাবের দাবি, চট্টগ্রামে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন তারা। গড়ে তুলেছিলেন অস্ত্রের মজুদ।

সূত্র জানায়, ‘জঙ্গিদের আস্তানা’ হিসেবে ভাড়া নেয়া ‘চৌধুরী ম্যানসন’ বাড়ির মালিক কোনো কাগজপত্র বা জাতীয় পরিচয়পত্র জমা না নিয়েই গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভাড়া দেন। এলাকার মানুষ জানত একজন অসুস্থ মহিলা এ বাড়িতে থাকেন। এখানে ‘জঙ্গিরা আস্তানা’ গড়ে তুলতে পারে তা কারো ধারণা ছিল না।

বাড়ির মালিক মাজহার চৌধুরী বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাড়ির কেয়ারটেকার হক সাহেব থেকে দুইজন লোক বাড়ি ভাড়া নেয়। তারা বিএসআরএমে চাকরী করে বলে জানায়। ওই সময় কোন কাগজপত্র দেয়নি। আজ ৫ সেপ্টেম্বর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার কথা ছিল।

র‌্যাব-৭ এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার সাফায়াত জামিল ফাহিম জানান, কয়েকদিন আগে ‘জঙ্গি’ সদস্যদের এ বাড়ি ভাড়া নেয়ার তথ্য র‌্যাবের কাছে আসে। র‌্যাব জানতে পারে, চট্টগ্রামে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার লক্ষ্যে একজন নারীসহ অন্তত চার সদস্যের একটি দল এ বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার ভোররাতে একতলা এ বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব-৭।

তিনি আরো বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধা ও একা বাড়ি টার্গেট করে জঙ্গিরা মূল মহাসড়কের পাশে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। কারণ তাদের আসা-যাওয়া সুবিধা এবং ভেতরে গ্রামাঞ্চলে ভাড়া নিলে মানুষের নজরে আসবে তাই সড়কের পাশে ভাড়া নিয়েছেন।

জোরারগঞ্জ থানার সেকেন্ডে অফিসার এস আই আবেদ আলী জানান, অভিযান শেষে লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে গত বছর মিরসরাই সদরে রেদোয়ান মঞ্জিলে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়েছিলো র‌্যাব। তখন ওই বাড়ি থেকে ২৯টি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড, ৪০টি পাওয়ার জেল, ২৮০টি প্যাকেট কার্বন স্টীলবল, ছোট-বড় ৯টি চাপাতি, ১১ কেজি বিস্ফোরক সদৃশ পাউডার, ৭টি কালো পাঞ্জাবি, কালো ব্যাগ ও একটি ব্যানারসহ বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করে আইন শৃংখলা বাহিনী। এছাড়া বিগত কয়েক বছরে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে ব্যাংকার, ও সুড়ঙ্গ পাওয়া গেছে। কিন্তু এগুলোর রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় এখানে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তুলছে।