চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

হেফাজত প্রধান আহমদ শফী শত্রু ছিলেন না: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৩ ২৩:২৭:৫৭ || আপডেট: ২০১৮-১০-০৪ ১১:১৮:২৫

হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা শাহ আহমদ শফী শত্রু ছিলেন না- জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, তারা ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছেন। নিশ্চয়তা দিয়েছেন ২০১৩ সালের ৫ মের মতো ঘটনা আর ঘটবে না।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদান শেষে বুধবার গণভবনে করা সংবাদ সম্মেলনে করা এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সনদ দেয়ায় আল্লামা শফীর নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শফী হেফাজতের পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ‘আল হাইয়াতুল উলিয়া’রও চেয়ারম্যান এবং এই বোর্ডের অধীনেই সংবর্ধনা হবে প্রধানমন্ত্রীর।

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের খবরের সম্পাদক আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘হেফাজতের হুজুর আপনাকে গ্র্যান্ড সংবর্ধনা দেবে। শত্রুরা এখন আপনাকে সংবর্ধনা দেবে।’

প্রধানমন্ত্রী এই প্রশ্ন থামিয়ে বলেন, ‘শত্রু ছিল না, এটা ভুল। আমার কোনো শত্রু ছিল না। কে শত্রু, কে মিত্র ওটা আমি দেখি না।’

‘তবে হ্যাঁ, ওই রাতে, ওই সময়টায় এবং তার আগে খালেদা জিয়া বক্তব্য দিলেন, ঢাকাবাসী সবাই আসেন, ওখানে শাপলা চত্বরে সবাই আসেন, এরপর হেফাজতের ভাঙচুর, নানা রকম ঘটনা। হ্যাঁ, আমি আমার মতো চেষ্টা করেছি এই ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশে যেন আর কখনও না ঘটে।’

‘তখনকার ওই অঞ্চলের (মতিঝিল) সবাই এমন ভয়ে ভীত ছিল এবং এটাও ঠিক যেকোনো সময় যেকোনো ঘটনা তারা ঘটাতে পারে। খালেদা জিয়া সমর্থন দিল, জামায়াত সমর্থন দিল। এমনও হয়েছে যে, ২০০ গরু রেখে দিয়েছে, সেখানে গরু খাবে। ওই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আসল মাদ্রাসা থেকে একটা রুটি আর দুটি কলা ছাড়া আর কিছু জুটে নাই। এটা হলো বাস্তবতা।’

সাড়ে পাঁচ বছর আগের ওই দিনটি ছিল সংঘর্ষ-সহিংসতায় ঘটনাবহুল। আর ওই রাতে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়া নেতা-কর্মীদের হটাতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ওই অভিযানের পর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে যদিও পরে তা মিথ্যা প্রমাণ হয়।

সে সময় হেফাজতের ভেতরে থাকা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রায় সব কটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। তবে ২০১৬ সালের শুরুতে ইসলামী ঐক্যজোট ২০ দল ছেড়ে দেয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে মানুষের একটা টেনশন ছিল। আমি যেভাবেই পারি, আমি তো টেনশন মুক্ত করেছি। এটা তো সাধুবাদ দেবেন।’

কওমি মাদ্রাসার অনুসারীরা সে সময় কী ধরনের ভুল ধারণা নিয়ে থাকত, সেটাও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘সে সময় যারা ছিল তারা ভাবত আওয়ামী লীগ ধর্মে বিশ্বাস করে না, আমি নাকি ধর্মেই বিশ্বাস করি না। এ রকম একটা চিন্তা ভাবনা ছিল। এখন তারা যদি প্রশংসা করে এটা তো, আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আর আপনাদেরও তো নিশ্চয় একটা স্বস্তি, একটা আশ্বস্ত যে ওই ধরনের পরিস্থিতি আর কেউ সৃষ্টি করতে পারবে না।’

‘জনগণের জন্য কাজ করি, জনগণকে নিয়ে তাদের মধ্যে শান্তি, স্বস্তি দেয়া আমার দায়িত্ব। আর সেটা আমি কীভাবে করব সেটা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর।’

‘কোনো ক্যাজুয়ালটি ছাড়া সহজে আমি সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি, এটাই তো সব থেকে বড় কথা ছিল। সেটা আমি করে দিয়েছিল।’

এই অঞ্চলে শিক্ষার শুরু মাদ্রাসা থেকেই

মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘এখানে লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়েরা পড়ে। এখানে অনেক গরিবের সন্তান, এতিম বাচ্চারা সেখানে ঠাঁই পায়। তাদের আসলে কোনো স্বীকৃতিও ছিল না, কিছু ছিল না, তারা নিজে নিজের মতো পড়ত। সেখানে কিছু ছিল না।’

‘এই উপমহাদেশে শিক্ষার যাত্রাটা শুরু কিন্তু মাদ্রাসা থেকে। হিন্দুদের যেমন টোল থেকে, আর আমাদের মুসলমানদের হলো মাদ্রাসা থেকে। আর এটাকে আমরা সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারি না। এখানে ১৪ থেকে ১৫ লক্ষ ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করে যাচ্ছে। তারা কী পড়ছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।’

‘তাদেরকে সামাজিকভাবে একটা স্বীকৃতি দেয়া, একটা সম্মান দেয়া, তাদের জীবন জীবিকার পথটা সৃষ্টি করে দেয়া, এটা কি কর্তব্য না?’- এই প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই ধারণা থেকে আমি চেষ্টা করে গেছি একটা সমাধান করতে। আর সেটা আমরা করে দিয়েছি।’

‘সে জন্য কেউ যদি আমার জন্য দোয়া করে বা কেউ যদি ভালো বলে তাহলে আমি মনে করি এ দেশের মানুষের খুশি হওয়ার কথা। আর যারা সত্যিকার অর্থে আমার ভালো চায় না যারা আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে তারা হয়ত মনে কষ্ট পাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষ সারা বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু একটা স্বস্তি এবং খুশি হয়েছে।’

কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার অনুভূতি এটুকুই, ওই যে শিশু যারা, শিক্ষা গ্রহণ করছে, যাদের কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না, তাদের যে একটা ভবিষ্যতের ঠিকানা করে দিতে পেরেছি, সেটাই হলো বড় কথা।’

ধর্মীয় অনুভূতির বাইরে কেউ না-এটা তুলে ধরে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘ধর্মকে কেউ অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু আবার ধর্মের অপব্যবহার হোক, সেটাও আমরা চাই না। আমাদের শিক্ষাটা পূর্ণাঙ্গ হয় তখনই যখন আমাদের জীবন জীবিকার শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাটা গ্রহণ করতে পারি। এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে।’