চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে খুন-সন্ত্রাসে ভাড়াটে খুনি!

প্রকাশ: ২০১৮-১০-০২ ১১:২৬:৫৯ || আপডেট: ২০১৮-১০-০২ ১৬:২৯:০১

রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করা হচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতরাই ভাড়াটে হিসেবে অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন। ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করছেন প্রভাবশালীরাই। তবে ভাড়ায় খুনের চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো টাকার অঙ্ক নেই। একেক সময় একেক ধরনের চুক্তিতে তারা কাজ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের অপরাধীদের তৎপর হয়ে ওঠায় চিন্তিত পুলিশ কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কাজ করছেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তাদের অনেকে কারাগারে থাকায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেক ক্ষেত্রে এসব হত্যাকা-ের নকশা সাজিয়ে সে অনুযায়ী ভাড়াটেদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। তবে চট্টগ্রামে ভাড়াটে হিসেবে হত্যাকা-সহ অপরাধে জড়িতদের সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১০টায় নগরের মুরাদপুর এন মোহাম্মদ কনভেনশন সেন্টারের সামনে আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আলমগীর চৌধুরী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। পিঠে ও হাতে গুরুতর জখম করা হয় তাকে। ঘটনার এক সপ্তাহ পর নেজাম উদ্দিন নজু ও নুর উদ্দিন খান মুরাদ নামের দুইজনকে গ্রেফতার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। এদের মধ্যে নেজাম উদ্দিন নজু গত ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানায়, আলমগীরের ওপর হামলার পরিকল্পনায় আনোয়ারার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলমগীর চৌধুরীর বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে আনোয়ারায়। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ তদন্তে জেনেছে।

জবানবন্দিতে নেজাম উদ্দিন নজু বলেন, মুরাদ খান ও আলমগীর ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাকে রিয়াজউদ্দিন বাজার যেতে বলেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি রিয়াজউদ্দিন বাজার গেলে সেখানে মুরাদ, মো. আলমগীর, আজিজ মেম্বার ও জসিম ছিলেন। এরপর সবাই মিলে তারা মুরাদপুর অ্যালুমিনিয়াম গলিতে আসেন। রাত সোয়া ১০টায় পাঞ্জাবি পরা আলমগীর চৌধুরী এন মোহাম্মদ কনভেনশন সেন্টারের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মুরাদ, আলমগীর ও কামাল পেছনে ছুরিকাঘাত করেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা আজিজ মেম্বার হচ্ছেন আনোয়ারার বারখাইন ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। অভিযুক্ত জসিম হচ্ছেন একই ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সেদিন আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর চৌধুরীকে ছুরিকাঘাত করা মো. আলমগীর হচ্ছেন সদরঘাটের পরিবহন ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ চৌধুরী হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি।

২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর সদরঘাটের কদমতলীর শুভপুরে ট্রাক স্টেশন কেন্দ্রিক ব্রোকারদের কমিশনের টাকা ভাগ-বাটোয়ারায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকা- ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হারুন হত্যা মামলায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট থানার এসআই অলি উল্লাহ। এই মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি নুর উদ্দিন খান মুরাদ, যিনি সর্বশেষ আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর চৌধুরীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায়ও অংশ নিয়েছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, চিহ্নিত সন্ত্রাসী মো. আলমগীরনগরের একজন জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় থাকেন। তার অধীনে আরো বেশকিছু সন্ত্রাসী আছে। তারা মোগলটুলি এলাকায় থাকেন। এই গ্রুপের সদস্যরা গুলি চালানোতে অভ্যস্ত। টাকা পেলেই তারা খুন করার কাজ নিচ্ছে। পরিবহন ব্যবসায়ী হারুন নিহত হয়েছিলেন তাদের গুলিতেই। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আলমগীর চৌধুরীকে খুন করার কাজও পেয়েছিল পেশাদার খুনিদের গ্রুপটি। এজন্য উপর্যুপরি কোপানো হয় তাকে। কিন্তু আশপাশের মানুষ এগিয়ে আসায় ও ভাগ্য সহায় হওয়ায় এ যাত্রায় বেঁচে যান আলমগীর চৌধুরী।

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, গ্রেফতার নজুর জবানবন্দি ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা জেনেছি, আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর চৌধুরীর ওপর হামলায় যারা জড়িত ছিলেন তারা তাকে চিনেনও না। টাকার বিনিময়ে মারতে এসেছিল তারা। যারা খুনের পরিকল্পনা করেছিল তাদের মধ্যে দুইজন ঘটনাস্থলে এসে দূর থেকে আলমগীর চৌধুরীকে চিনিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় অংশ নেয়া ৭-৮ জন ভাড়াটে খুনির পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

তিনি বলেন, ভাড়ায় খুনের চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো টাকার অঙ্ক নেই। একেক সময় একেক ধরনের চুক্তিতে তারা কাজ করে। কাকে কত সময়ের মধ্যে খুন করা হবে তার ওপর নির্ভর করে টাকার পরিমাণ। আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর চৌধুরীর ওপর হামলার জন্য তারা কত টাকা নিয়েছিল তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (বন্দর) আসিফ মহিউদ্দীন বলেন, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা তদন্তে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পেরেছি আমরা। সম্প্রতি এই ধরনের অপরাধীরা চট্টগ্রামে তৎপর হয়েছে। নজরদারি বাড়িয়ে তাদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক বলেন, আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক বিরোধ বা মতের ভিন্নতার কারণে খুনসহ নানা অপরাধ ঘটছে। এসব ঘটনায় টাকার বিনিময়ে পেশাদার সন্ত্রাসীরা অংশ নিচ্ছে। এসব অপরাধে যুক্ত কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছেন। বাকিদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। – প্রতিদিনের সংবাদ