চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

ড. কামালদের জামায়াতবিরোধিতা কেবলই কথার কথা

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২৮ ১১:৪১:৩৭ || আপডেট: ২০১৮-০৯-২৮ ১৪:৪৩:০২

জামায়াতে ইসলামী থাকলে জোট নয়- যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের পক্ষ থেকে বিএনপিকে ‘সুস্পষ্ট বার্তা’ দিলেও স্বাধীনতাবিরোধী দলটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা অবস্থাতেই চলছে জোটের আলোচনা। বিএনপি যখন জামায়াত ছাড়ছে না, তখন জোটের উদ্যোক্তারা কৌশল হিসেবে বলছে, জোট হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে, তাদের শরিকদের সঙ্গে নয়।

জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা অবস্থাতেই বিএনপির সঙ্গে জোট করা প্রকারান্তরে জামায়াতের সঙ্গেই জোট কি না-এমন প্রশ্ন শুনে ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার একজন নেতা বিব্রত হয়েছেন। যদিও তিনি এবং বিএনপির সঙ্গে জোটের আলোচনায় মধ্যস্ততা করা জাফরুল্লাহ চৌধুরী এভাবেই জোট করার আগ্রহ জানিয়ে যুক্তি দিয়েছেন।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কামাল হোসেনের গণফোরাম আর তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা দেয়া যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে ঐক্যের জন্য মরিয়া বিএনপি। একে তারা বলছে ‘জাতীয় ঐক্য’। এক যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থাকা দলটি আশা করছে, এই জোট হলে সরকারকে পাল্টা চাপে ফেলা যাবে।

অন্যদিকে কামাল হোসেন দুই বছর ধরেই দেশবাসীকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আসছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’। গত ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে এর সমাবেশও হয়। সেখানে কামাল হোসেন আর বিএনপির ঐক্যের চেষ্টা এক বৃত্তে মেশার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেখানে বিএনপি, তার জোটের বেশ কিছু শরিক এবং যুক্তফ্রন্টের নেতারা অংশ নিয়ে ১ অক্টোবর থেকে একসঙ্গে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।

যদিও এর আগে ড. কামাল হোসেন এবং যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানিয়েছিলেন, জামায়াত না ছাড়লে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করবেন না তারা। এমনকি সেই সমাবেশের পর জনাব চৌধুরীর বাসায় গত মঙ্গলবার রাতে গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টে নেতাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির প্রতিনিধি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি।

তবে বিএনপি স্পষ্ট করে বলছে না তারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেবে কি না। তবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলছেন দেশে জামায়াতের ভোট কতো আর ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্টের ভোট কত।

এর মধ্যে ‘জাতীয় ঐক্যের’ আলোচনায় বিএনপির সঙ্গে মধ্যস্ততার দায়িত্ব পাওয়া জাফরুল্লাহ চৌধুরী সূত্র খুঁজছেন জামায়াতকে রেখেই এই ঐক্যের। তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো জাতীয় ঐক্যে জামায়াতকে ছেড়েই এসেছে। এখানে তো জামায়াতকে নিয়ে আসেনি বিএনপি। জামায়াত বিশদলীয় জোটে আছে এই ঐক্যের মধ্যে নাই।’

‘২০ দলীয় জোট অটুট থাকবে। ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকবে, এটা জাতীয় ঐক্যে প্রভাব ফেলবে না। বৃহত্তর ঐক্যে বিএনপি এসেছে, এখানে জামায়াত ছাড়ার প্রশ্ন কেন আসবে। জামায়াত ২০ দলীয় জোটেই থাকবে।’

বিএনপির সঙ্গে জামায়াত জোটে থাকবে আর জাতীয় ঐক্য হবে বিএনপির সঙ্গে- এই কৌশলের কথা বলেছেন কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিনও। তিনি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন সাহেব বলেছেন জামায়াতের সাথে কাজ করবে না। তাদের নিয়ে কোনো ঐক্য নয়। তবে বর্তমান পরিস্থতিতে বিএনপির সাথে কাজ করতে একমত হয়েছি। বিএনপির একটা জোট আছে। তারা ২০ দলের সাথে কাজ করছে। আমাদের বৃহত্তর ঐক্যে ২০ দল নাই। আমাদের বৃহত্তর ঐক্যে জামায়াত কোনো বিষয় না। জামায়াত এখানে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।’

জামায়াতের সঙ্গেও জোট করবে বিএনপি আবার তারা জাতীয় ঐক্যেও আসবে। তাহলে জোটে পরোক্ষভাবে তো জামায়াত থাকছেই- এটা তবে ঘোষণার বিরোধী কাজ কি না- এমন প্রশ্নে মোস্তফা আমিন বলেন. ‘এসব পরোক্ষ হিসাব আমাদের সাথে করে লাভ নেই। এই বিষয়ে বিএনপির সাথে কথা বলুন।’

জামায়াত নিয়ে কামাল হোসেন আর বি. চৌধুরীর আপত্তির কারণ তারা স্বাধীনতাবিরোধী দল, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরেছে। তবে গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী নেতা মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের দল খেলাফত মজলিসের প্রতিনিধিকে মঞ্চে নিয়েই সমাবেশ করেছেন ড. কামাল, বি চৌধুরীরা।

মাওলানা ইসহাক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সময় পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত বেসামরিক সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ছিলেন। আর মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে তার যাবজ্জীবন সাজাও হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তিনি সুযোগ বুঝে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

ড. কামালের ডাকে জনসভায় ইসহাকের দলের পক্ষে ছিলেন মহাসচিব আহমাদ আবদুল কাদের। তিনি রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে জামায়াতেরই ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি শিবিরের সভাপতি হন। পরে দ্বন্দ্বের জেরে ছাত্র সংগঠনটি ত্যাগ করেন।

যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বি. চৌধুরীর দল বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নানও স্বাধীনতাবিরোধী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে ৮০ জন সেনা কর্মকর্তা যুদ্ধ করেছেন, তিনি তাদেরই একজন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন মান্নানও। পরে তিনি যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারতেও যান। আর সেখান থেকে যান পাকিস্তানে।

১৯৭৩ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকেই অবসরে যান মান্নান। আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকে করা হয় চা বোর্ডের চেয়ারম্যান। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯১ সালে দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন। ২০০৪ সালে বি. চৌধুরী বিকল্পধারা করলে মান্নান তার সঙ্গে চলে গিয়ে দলের মহাসচিব হন। – ঢাকাটাইমস