চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

ভয় নিয়ে ক্যাম্পাসে যায় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীরা!

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২৫ ২৩:২৮:০৫ || আপডেট: ২০১৮-০৯-২৬ ০০:৫৬:০৫

আখতার হোসাইন

দীর্ঘ ৩৪ বছর যেখানে হয়নি কোন সংঘর্ষ, দলাদলী, হাতাহাতি কিংবা অস্ত্রের ঝনঝনানি। সেখানে প্রতিনিয়ত চলছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, গুলাগুলি, দেশী বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্রের মহড়া। যে কলেজটি খ্যাতি অর্জন করে শ্রেষ্ট ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছিল। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের মানুষের মুখে মুখে সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সুন্দর, মনোরম ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সবুজের ঘ্রাণ নিত। সে সবুজের সুন্দর নিরিবিলি ক্যাম্পাসটি আজ এক অজানা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

ছাত্রলীগ দখলে নেয়ার দু বছরে প্রায় ৬৩বার সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে। এতে আহত হয়েছে উভয় পক্ষের শতাধিক জন। ছাত্রলীগের গ্রুপ, উপগ্রুপের ও বিভিন্ন নেতার অনুসারীদের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভয়ের উপর থাকছে সবসময়।

ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রনে থাকা ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারী কলেজটি ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর শাসক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রনে নেয়। সেই থেকে প্রায় সময় ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের সাথে সংঘাত, সংঘর্ষ লেগেই থাকে। গুলি আর ককটেল ও ইট-পাটকেলের আতঙ্ককে সঙ্গী করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা। ভয়ভীতি ও সন্ত্রস্ত্র অবস্থায় কোন মতে ক্লাস করে ক্যাম্পাস ত্যাগের তাড়নায় থাকে সকল শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাস ত্যাগ করে আশপাশে গিয়ে হাফ ছেড়ে স্বাস নেয় অনেক শিক্ষার্থী।

দেবপাহাড় মোড়ে কথা হয় অনার্স ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা মমির সাথে সে বলে, ছোট বেলা থেকেই এই কলেজের সুনাম, সুখ্যাতি শুনে আসছি। সেই থেকে এই কলেজে পড়ার ভাসনা থেকে অনার্সে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর থেকে এখানের পরিবেশ, পরিস্থিতি আমাকে সদা সর্বদা আতঙ্কিত করে রাখে। অন্যদিকে পিতা-মাতাও থাকে সার্বক্ষনিক উদ্ধিগ্ন অবস্থায়।

মাষ্টার্সে পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুস্মিতা জানান, আমরা সব সময় একটি ভীতির মধ্যে থাকি। কখন কোন দিক থেকে ইট কিংবা বোমা আসে বলা যায় না। ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারলেই নিরাপদ মনে করি এখন। তিনি আরো জানান, এইচ এস সি ও অনার্স এই কলেজে পড়ার সুযোগ হয়েছে তখন এত আতঙ্ক ছিল না। ছিল সুন্দর মনোরম পরিবেশ। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মেলবন্ধন। ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ছিল একটি হৃদ্ধতাপূর্ণ সম্পর্ক। অনৈতিক কোন কাজ কর্মও চোখে পড়েনি।

এইচ এস সি পড়ুয়াশিক্ষার্থী হাবিব উল্লাহ বলেন, আমরা এই ক্যাম্পাসে নিয়মিত আসছি তবে ভয় ভীতি নিয়ে আসি। কোন সময় বাবা আবার কোন সময় মা সাথে আসে। উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে তারা আমাদের সঙ্গী হয়।

আশির দশক থেকে কলেজটি ছাত্রশিবিরের দখলে থাকা অবস্থায় অন্য ছাত্র সংগঠনকে এই ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে দেয়নি। এমনকি অন্য ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীদের নির্যাতন করতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রাবাস গুলোতে শক্ত অবস্থান থাকায় ছাত্রশিবির কলেজের আঙ্গিনায় কাউকে সহ্য করতো না এমন অভিযোগ ছাত্রলীগের। তাদের মতে ছাত্রশিবির দখল অবস্থায় ভিন্ন মতের ছাত্র সংগঠন গুলোর অনেক নেতা কর্মী তাদের হাতে আহত নিহত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের এক নেতা জানান, চট্টগ্রাম কলেজের টেন্ডারবাজী, ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। শেখ মুজিবের আদর্শ থেকে বিচ্ছুতি হওয়ার কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দলের একনিষ্ট কর্মীদের দায়িত্বে আনা প্রয়োজন। ফলে ব্যক্তি স্বার্থে সংঘাত সংঘর্ষের মতো ঘটনা গুলো কমে আসবে।

ছাত্রলীগ কলেজ শাখার ঘোষিত কমিটির সভাপতি মাহমুদ জানান, কিছু বহিরাগত অছাত্র কলেজের বাহিরে অবস্থান করে কলেজের আশপাশে বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে বলা হয়েছে। তারপরও তারা ছাত্রলীগের নামে এভাবে শৃংখলা বর্হি:ভুত কাজ করলে তাদের ব্যাপারে সংগঠনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবে। তিনি বলেন, সড়কে বিশৃংখলা সৃষ্টির মাধ্যমে যারা অত্র এলাকার শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার আহবান জানান।

এই কলেজটি ঘটনা গুলোর কারণে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। শিক্ষাজোন খ্যাত চকবাজার। চট্টগ্রাম কলেজে সংঘর্ষ, সংঘাতের ঘটনা ঘটলে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সময়ে আহত হয়েছে। এই কলেজের সামনে মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজ, মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। ফলে যে কোন ঘটনায় এই সব স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনা, ভয়ভীতি নিয়ে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল ছুটির পর অভিভাবকদেরও পড়তে হয় ভীতির মধ্যে। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী ডা: খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট মেরিস, এজি চার্জ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।