চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮

বিদেশেও চট্টগ্রামের পেয়ারা!

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০৩ ১৫:১০:০২ || আপডেট: ২০১৮-০৯-০৪ ১১:০৭:৪০

আখতার হোসাইন

আপেল নয় কিন্তু আপেলের চেয়েও সুস্বাদু। চন্দনাইশের পেয়ারা স্বাদে-গুণে ভরপুর। যে কেউ দক্ষিণ চট্টগ্রামের রৌশনহাট, বাগিচা হাটে পেয়ারা চাষীদের সাজানো পেয়ারা দেখলে খেতে ইচ্ছা করবে। না খেয়ে আসলে আপসোস থেকেই যায়।

প্রকৃতিগত কারণে পেয়ারার স্বাদ সুমিষ্ট ও ঘ্রাণ মোহনীয় এবং দেখতে খুব সুন্দর। ভিটামিন-সি এ ভরা ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এ পেয়ারা। মৌসুমে ভোরে কাকডাকা থেকে শুরু হয় পেয়ারা চাষি ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। শত শত শ্রমিক কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশের বাগান থেকে বিশেষভাবে লালসালুতে মুড়িয়ে কাঁধে করে পেয়ারা নিয়ে বাজারে আসে।

এরপর লালসালুর পুঁটলিতে বাঁধা অবস্থায় থরে থরে সাজানো হয় পেয়ারার সারি। তা দেখে ক্রেতা-বিক্রেতারা সহজেই আকৃষ্ট হন। চলে দরদাম-বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখানে পাইকাররা কেনেন শ’ হিসেবে আর তারা বিক্রি করেন ডজন হিসেবে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি ডজন পেয়ারা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝামাঝি সময় দাম কমলেও শেষের দিকে আবারও এই পেয়ারার দাম চড়াও থাকে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে উৎপাদিত স্বাস্থ্যসম্মত পেয়ারা প্রতি বছর মৌসুম শুরু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাটবাজারগুলোতে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে টানা চার মাস ধরে বাগানে উৎপাদিত পেয়ারা পাওয়া যায়।

এই মৌসুমে পেয়ারা বহন ও বিক্রির সঙ্গে ১০-১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রচুর বৃষ্টিপাতে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে জমা হওয়া নতুন পলিমাটিতে পেয়ারার চাষ হয়। এই পলি খুব উর্বর। ফলে পেয়ারা চারার গোড়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না।

গাছে কোনো ধরনের কীটনাশকও ছিটানোর প্রয়োজন হয় না। এ কারণে জৈব সারে উৎপাদিত পেয়ারা বা স্বাস্থ্যসম্মত পেয়ারা বলা হয়। চাষিরা ডাঁটা ও পাতাসহ এই পেয়ারা সংগ্রহ করে থাকেন। তাই ফরমালিন ও রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ছাড়াই চার-পাঁচ দিন অনায়াসে সংরক্ষণ করা যায়।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়া উপজেলায় অন্তত ১৫-২০ হাজার একর পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার পেয়ারা বাগান রয়েছে। তবে পটিয়া উপজেলার খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও শ্রীমাই এলাকা, চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, লট এলাহাবাদ, কাঞ্চননগর, দোহাজারী, ধোপাছড়ি এলাকার উৎপাদিত পেয়ারা সর্বোৎকৃষ্ট।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানায়, মৌসুমে পেয়ারা বাগানগুলোতে হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫-১৬ টন করে পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মৌসুমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোহাজারী, বাগিচাহাট, খানহাট, কাঞ্চননগর, চক্রশালা, হামিশমুর, বাদামতল, রৌশনহাট ও পটিয়া কমলমুন্সীরহাট, দারোগা হাট, হাইদগাঁও সাতগাউছিয়া মাজার গেইট, পানবাজার, ভট্টাচার্য হাট, এলাকায় রীতিমতো বসে পাইকারি পেয়ারার হাট।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পটিয়া উপজেলার খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় পার্শ্ববর্তী উপজেলা চন্দনাইশে কাঞ্চননগর, লর্ট এলাহাবাদ, ধোপাছড়ি, হাশিমপুর পেয়ারা বাগানের গাছে গাছে প্রচুর ফলন হয়েছে। প্রতিটি গাছে ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় রঙিন পেয়ারা পাহাড়টিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়েছে। সবুজ পাতার ডালগুলো যেন রঙিন পেয়ারার ভারে হেলে পড়েছে।

কিছু বিপণন সমস্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যা রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় উৎপাদিত ফলমূলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।

পেয়ারা বাগান মালিক আবদুস সবুর জানান, এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা এখন চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে রীতিমতো রফতানি হচ্ছে।