চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

৩ সিটির ভোট প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-৩০ ২১:৫১:০২ || আপডেট: ২০১৮-০৭-৩১ ০৯:৫৬:১০

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, সেই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাক বড় হয়ে গেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মানদণ্ডে কমিশন ক্রমে নিম্নমুখী হচ্ছে দাবি করে বিশ্লেষকরা বলেন, নির্বাচন কমিশন আগেরটির ‘ব্যর্থতা’কে অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগানোর কথা বলেছিল, কিন্তু কথা ও কাজে মিল পাওয়া যায়নি।

সোমবার (৩০ জুলাই) একযোগে বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয়। এতে একাধিক মেয়র প্রার্থীর ভোটবর্জন, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, জালভোট দেওয়া, ব্যালটবক্স ছিনতাই, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বরিশাল সিটি নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন ও সিপিবির প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। অন্যদিকে বাসদ ও জাতীয় পার্টি নির্বাচন স্থগিতের দাবি তুলেছে। সিলেটে কেউ বর্জন না করলেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন স্থগিতের দাবি করেছে। আর রাজশাহীতে বিএনপি প্রার্থী শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তবে দলীয় প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ‘ভোটের পরিবেশে ক্ষুব্ধ হয়ে’ নিজে ভোটদানে বিরত থাকেন।

নির্বাচনে মেয়র পদে এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলে তিন সিটিতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছে।

বিএনপি ভোটকেন্দ্র থেকে তাদের পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ সরকারি দলের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। দলটি সিটি নির্বাচনকে সরকারের নীলনকশা বাস্তবায়ন আখ্যায়িত করে নির্বাচন কমিশন ‘মূক ও বধির’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে।

বিএনপির অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে আওয়ামী লীগ বলেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। দলটি বলেছে, বিএনপি নির্বাচনের জন্য অংশ নেয়নি, তাদের উদ্দেশ্যই ছিল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বহির্বিশ্বে সরকারের ইমেজ নষ্ট করা। নির্বাচনের নামে তারা ‘অভিনয়’ করেছে। তাদের অভিযোগের পুরাতন রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে।

এদিকে তিন সিটির নির্বাচন বিষয়ে আয়োজক সংস্থা নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। অনিয়মকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে নির্বাচন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা হলেও সার্বিকভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। যে সামান্য কয়েকটি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে, তা নির্বাচনের ফলে কোনও প্রভাব ফেলবে না। এ জন্য নতুন করে ভোটগ্রহণের কোনও প্রয়োজন নেই।’ তবে কোনও অনিয়মই ইসি প্রত্যাশা করে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিন সিটির নির্বাচনের বিষয়ে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা যে আশা করেছিলাম সেই আশায় কমিশন হতাশ করেছে।’

নির্বাচনে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘খুলনা ও গাজীপুরে আমরা যেটা দেখেছি এখনে তারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। নির্বাচনে প্রচুর অনিয়ম, কারচুপি ও বাড়াবাড়ির ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনটি কোনোভাবেই বিতর্কহীন ছিল না।’

এক প্রশ্নের জবাবে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘কমিশন প্রত্যেক নির্বাচনের পরে বলে, এবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা পরেরটা ভালো করবে। কিন্তু আসলে তারা সেটা করে বলে মনে হয় না। আন্তরিকতার সঙ্গে তা করলে দিনে দিনে আমরা নিম্নমানের ভোট দেখতাম না।’

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা) প্রধান মুনিরা খান বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা যে ত্রুটিবিহীন ও সুন্দর নির্বাচন প্রত্যাশা করেছিলাম, এই তিন সিটি নির্বাচনে সেটা আমরা দেখতে পাইনি। এককথায় বলতে পারেন, আমাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে বেশ গ্যাপ রয়ে গেছে।’

একাধিক প্রার্থীর নির্বাচন বর্জনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘কেউ নিশ্চয়ই বর্জন করবেন এই প্রবণতা থেকে নির্বাচন করেন না। যখন নির্বাচনে একই সঙ্গে একাধিক প্রার্থী বর্জন করে তখন বুঝতে পারা যায় সত্যিই বর্জনের মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। এতে করে নির্বাচনটা প্রত্যাশিত হয়নি, তা বলে দেওয়া যায়।’

ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন নিম্নমুখী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক বলেন, ‘যেখানে স্টেকহোল্ডারদের চাওয়া-পাওয়া যত বেশি সেখানেই তত জোরজবরদস্তি ও অনিয়মের প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের এই চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই দিনে দিনে আমরা খারাপ নির্বাচন দেখছি। তবে এই নিম্নমুখী নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের যেমন দায় রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দলসহ স্টেকহোল্ডারদের দায়ও কিন্তু কম নয়।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘খুলনা ও গাজীপুরে যে নির্বাচন আমরা দেখেছি, সেই একই ধাঁচের নির্বাচন তিন সিটিতে হয়েছে। অনিয়মের ক্ষেত্রে বলবো, এই নির্বাচন আগের নির্বাচনকে ছাড়িয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।’

নির্বাচন কমিশনকে প্রধানত দায়ী করে হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনটাকে এখন যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে ভালো নির্বাচন প্রত্যাশা করা দুঃস্বপ্ন হয়ে পড়েছে। আমি মনে করি, এজন্য নির্বাচন কমিশনই প্রধান দায়ী। কারণ, তারা যদি আন্তরিক হয় এবং তাদের আইনি যে ক্ষমতা রয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ করে তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হওয়া সম্ভব। কমিশন বারবার মুখে আন্তরিকতার কথা বলে, নানা ধরনের হুঁশিয়ারি দেয়, কিন্তু সত্যি তারা কতটা আন্তরিক, সেটা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।’

পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মোর্চা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক আব্দুল আলীম তিন সিটির ভোটের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি। তিনি জানান, তারা তাদের পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছেন। এটা শেষ হলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

প্রসঙ্গত, কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ পর্যন্ত সাতটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হিসেবে সব মহলে প্রশংসিত হলেও খুলনা সিটি থেকে অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। খুলনার পর গাজীপরেও সেই ধারাবহিকতা দেখা যায়। সবশেষ সোমবার অনুষ্ঠিত তিনটি সিটিতে ব্যাপক অনিয়ম, জাল ভোট ও ভোট বর্জনের খবর পাওয়া গেছে।- বাংলা ট্রিবিউনক