চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে কর্মসৃজন প্রকল্পে হরিলুট, মৃতরাও টাকা নিয়েছেন!

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-২৪ ১৩:৫৯:১৬ || আপডেট: ২০১৮-০৭-২৫ ১২:১১:৪২

চট্টগ্রামে সরকারের ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা জোগসাজস করে এমন ব্যক্তিদের নামে টাকা নিয়েছেন, যারা বহুদিন আগে মারা গেছেন। আবার এমনও পাওয়া গেছে, কাগজকলমে যিনি টাকা নিয়েছেন, তিনি নিজেই জানেন না তার নামে বরাদ্দের কথা।

সরকার বছরে দু’বার দেশের বিভিন্ন জেলায় হতদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের এই কর্মসূচি নিয়ে থাকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আসা প্রকৃত দরিদ্ররা এই সুবিধা পাওয়া কথা।

কিন্তু, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নে বিগত ২০১৫-২০১৬ ও ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন তো হয়নি। উল্টো শিক্ষক, রাজনীতিক, প্রবাসী, চিকিৎসক ও মৃত ব্যক্তি মিলে অন্তত ৪০০ জনের নামে চারবারে প্রকল্পের ১ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা লুটে নেয়া হয়েছে।

ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানে আলম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ও কৃষি ব্যাংক ফটিকছড়ি হেয়াকোঁ শাখা ব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান মিলে এই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসক বরাবর দুটি লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা শহিদুল আলম।

এতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দুর্ভিক্ষ ও মঙ্গা মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন জেলায় অতিদরিদ্র মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকেন, সেজন্য ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি নেয়। ইজিপিপি কর্মসূচির আওতায় ৪০ দিন ধরে তাদের কাজের বিনিময়ে অর্থ দেয়া হয়।

অথচ সরকারের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়ন ২০১৫-২০১৬ এবং ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ব্যাপক নয়ছয় করেছে।

দুই অর্থবছরে ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা করে প্রকল্পের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দের চারবারে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এর সবই দাঁতমারা ইউনিয়নের বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, খাল-ছড়া, বেড়িবাঁধ সংস্কারে ব্যয় করা হয়েছে বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংরক্ষিত নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে টাকা গ্রহণকারী হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, তাদের কেউই টাকা বরাদ্দের কথায় জানেন না।

ইউনিয়নে সরকারি অন্য সংস্থার বাস্তবায়িত প্রকল্পের পর কিছু লোক দেখানো কাজ করা হয়েছে। মূলত কোনো কাজ না করেই ইউনিয়ন কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। তাতেও আবার মাটির কাজের দৈনিক মজুর হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তা রীতিমতো চমকে উঠার মতো।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিদরিদ্রদের স্থলে দৈনিক মজুর হিসেবে স্কুলশিক্ষক, পুলিশ কনস্টেবল, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি, প্রবাসী, পল্লী চিকিৎসক, মৃত ব্যক্তি, ইউনিয়নের চৌকিদার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করণিকসক ৪০০ মজুরের নামে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

স্থানীয় দাঁতমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানে আলম কৃষি ব্যাংক হেয়াকোঁ শাখায় ভুয়া হিসাব নাম্বার খুলে (ব্যাংক একাউন্ট) প্রকল্পের সব টাকা উত্তোলন করেছেন।

টাকা গ্রহণকারীদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড এলাকায় শ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়েছে বালুটিলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ জামাল মজুমদারকে, যার হিসাব নং-১০৬৫৬; বাগান বাজার ইউনিয়নের গজারিয়া জেবুন্নেছা পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মোমিন মজুমদার, যার হিসাব নং-১০৬৫৭; দাঁতমারা ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি আবদুল শুক্কুর, যার হিসাব নং- ১০৬৮১; জিলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মৃত লোকমান হোসেন, যার একাউন্ট নম্বর- ১০৬৮২, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বর্তমানে প্রবাসী ফাহাদ আলী, হিসাব নম্বর- ১০৬৮৮; ৮নং ওয়ার্ডে শ্রমিকের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের শ্যালক ব্যবসায়ী জাহেদুল আলম, হিসাব নম্বর- ১১৫৭৯; বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরিজীবী মাহবুবুল আলম, যার হিসাব নম্বর- ১০৭২১; প্রবাসী আবদুর রহিম, হিসাব নম্বর ১১২৯৪; প্রবাসী ইউছুফ খান, হিসাব নম্বর- ৮৫৫৬; যুবলীগ নেতা লোকমান, হিসাব নম্বর- ৮৫৬৮; যুবদল নেতা ও সাবেক মহিলা মেম্বারের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম, যার হিসাব নম্বর- ১১২৬২; ছাত্রলীগ নেতা আবু ইউছুফ, হিসাব নম্বর ১১২৬৩; যুবলীগ নেতা তৈয়বুল হক, হিসাব নম্বর- ১১৫৭৭।

এছাড়া রয়েছেন হেয়াকোঁ বনানী স্কুলের অফিস সহকারী মো. রুবেল, হিসাব নম্বর- ১১২৬৪ ও দাঁতমারা মাদ্রাসার অফিস সহকারী নাসির উদ্দিন, হিসাব নম্বর- ১১৫৮০।

চমকে দেয়া এই শ্রমিক তালিকায় রয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল সালা উদ্দিন সাজিব, যার হিসাব নম্বর- ১১২৮৭ ও পল্লী চিকিৎসক নুরুল আবছার, হিসাব নম্বর- ১১২৮৪।

এছাড়া শ্রমিকের তালিকায় রয়েছেন ইউনিয়নের মৃত চৌকিদার জামাল উদ্দিন, হিসাব নম্বর- ১১২৫৭; বর্তমানে কর্মরত চৌকিদার নুরুল ইসলাম, হিসাব নম্বর-১১২৫৮; আবদুচ ছালাম, হিসাব নম্বর ১১২৫৯ ও সুজল হক, হিসাব নম্বর-১১২৬০।

এসব ব্যক্তিদের শ্রমিক হিসেবে ২০১৫-২০১৬ এবং ২০১৬-২০১৭ দুই অর্থবছরেই মজুর হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এসব ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে তাদের নামে।

এছাড়া এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দৈনিক মজুর হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, প্রকৃত পক্ষে তারা কেউ হতদরিদ্র বা পেশাদার মজুর নন।

প্রকল্পের টাকা গ্রহণকারীর তালিকায় শ্রমিক হিসেবে নাম রয়েছে বাগান বাজার ইউনিয়নের গজারিয়া জেবুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মোমিন মজুমদারের। ২০১৫-২০১৬ এবং ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তার মজুরি হিসেবে ৩২ হাজার টাকা উত্তোলন দেখানো হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমেই তার এই মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে।

কিন্তু, আবদুল মোমিন মজুমদার জানান, এসবের কিছুই তিনি জানেন না। কোনো টাকাও পাননি।

তার ধারণা, হয়তো কেউ তার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে সরকারি প্রকল্পের টাকা লুট করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সময় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের পুরুষ ও নারী ইউপি সদস্যদের প্রকল্প কমিটির সভাপতি করা হয়, যা ছিল কেবল অফিসিয়াল ফরমালিটি। বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদেরকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে দাঁতমারা ইউনিয়নের ১নং বালুটিলা ওয়ার্ডের সদস্য ইউছুফ আলী বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু, কবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, আমি কিছুই জানি না। চেয়ারম্যান জানে আলম কিছুই আমাকে জানাননি। টাকা যদি নয়ছয় কিছু হয় তিনিই করেছেন।’

একই কথা জানান, ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নবীর হোসেন, ৩নং ওয়ার্ডের সুব্রত ও মহিলা সদস্য হালিমা বেগম পাখি।

৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, প্রকল্পে তাকে সভাপতি করা হয়েছিল কাগজ-কলমে। বাস্তবে প্রকল্পে দুই অর্থবছরে মোট কত টাকা তার ওয়ার্ডে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

তিনি দাবি করেন, চেয়ারম্যান নিজের ক্ষমতাবলে ব্যাংক কর্মকর্তার সহযোগিতায় হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরি করে টাকা লুটপাট করেছেন।

এ বিষয়ে কৃষি ব্যাংক হেয়াকোঁ শাখা ব্যবস্থাপক মো. আজিজুর রহমান (সদ্য ফটিকছড়ি শাখায় বদলি) বলেন, ‘কর্মসৃজন প্রকল্পের মজুরদের ব্যাংক হিসাব খুলতে চেয়ারম্যান ও সচিবরা যেভাবে ফাইল তৈরি করে দেন, আমরা সেভাবে হিসাব খুলি। আবার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) স্বাক্ষরসহ প্রতিবেদন পাওয়ার পর চেকের টাকাগুলো চেয়ারম্যান বা সচিব নিয়ে যান। এটাই দীর্ঘদিনের রীতি।’

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম  জানান, একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি ঢাকায় আছেন। ঢাকা থেকে ফিরে কথা বলবেন।

দাঁতমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জানে আলম কাছে তার বিরুদ্ধে আসা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিক তালিকা আমি করিনি। বিভিন্ন ওয়ার্ডের নারী ও পুরুষ ইউপি সদস্যরা করেন। তাদের দেয়া তালিকার শ্রমিকরা কাজ করে ব্যাংক থেকে টাকা নেন। আমার কোনো হাত নেই।’

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায়  বলেন, ’৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে এমন কিছু হয়ে থাকলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’