চট্টগ্রাম, , রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

চিকিৎসক ধর্মঘট নিষিদ্ধে রিট আটকা দুই বছর

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৯ ১১:২৮:২০ || আপডেট: ২০১৮-০৭-০৯ ১৬:১৮:১৭

চিকিৎসক বা হাসপাতালের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রোগীদের জিম্মি করার প্রবণতা ঠেকাতে উচ্চ আদালতে করা রিটের শুনানি আটকে আছে দুই বছর হলো। অথচ এর মধ্যেও নিজেদের ‘অসৎ’ দাবি আদায়ে রোগীদেরকে জিম্মি করার মতো কাজ বন্ধ হয়নি।

চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ হয়েছে চিকিৎসা প্রশাসনের তদন্তেই। আর এরপর নগরীর পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানে রোগীদের সঙ্গে ভাঁওতাবাজির প্রমাণ পেয়ে তাদের দণ্ডের আদেশ এসেছে।

এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা আবার তাদের ‘অব্যর্থ’ কৌশল গ্রহণ করে রোগীদের জিম্মি করে গোটা জেলায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস, রোগ পরীক্ষাসহ চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা যে কৌশল নিয়েছেন, সেই কৌশলে চিকিৎসকরা ‘সফল’ হয়েছেন বারবার। রোগী পিটিয়ে, স্বজন পিটিয়ে, ভুল চিকিৎসা করে বা সরকারি হাসপাতাল ফেলে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে কাজ করে পাওয়া শাস্তি তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন রোগীদেরকে জিম্মি করেই।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের মধ্যে বিস্ময়কর ঐক্য দেখা গেছে। কোথাও কোনো গ্রামে বা দূর হাসপাতালে একটি ঘটনায় গোটা জেলা, বিভাগ এমনকি গোটা দেশের চিকিৎসকদেরকেই ধর্মঘটে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখা গেছে।

আইন পেশায় কাজ করেন, এমন একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, আইন ও নৈতিকতা কোনো দিক থেকেও চিকিৎসকদের এই কাজ মেনে নেয়া যায় না। চিকিৎসা একটি জরুরি সেবা বিধায় এই পেশার লোকদের কথায় কথায় ধর্মঘটে যাওয়া ঠেকাতে উচ্চ আদালতের পদক্ষেপ চেয়েছেন তারা।

এরই মধ্যে ভুগছে চট্টগ্রামের রোগীরা। বেসরকারি হাসপাতালের এমন অমানবিক সিদ্ধান্তে সরকারি হাসপাতালে ভিড় বেড়েছে, কিন্তু সেখানে এত রোগীর চাপ সামাল দেয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থায় বিশেষ করে অসুস্থ শিশু ও বৃদ্ধ আর জটিল রোগীদেরকে নিয়ে স্বজনরা আছেন বিপাকে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি সুর্প্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, তাদের ব্যাখ্যায় ডাক্তারদের এভাবে ধর্মঘট আইন অনুমোদন করে না। কিন্তু যেহেতু সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই, তাই তারা এই ধরনের ধর্মঘটকে অবৈধ ঘোষণার দাবিতে হাইকোর্টে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি রিট আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটি এখনও শুনানি হয়নি।

‘আমরা ২০১৬ সালের ২৯ মে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেছি। সেখানে দেশের নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থে এবং রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য ডাক্তার ও নার্সদের ধর্মঘট বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়। এছাড়া তারা ডিউটিকালীন সময় কোন ধর্মঘট করতে পারবে না বলেও রিটে বলা হয়েছে। সেটা এখনও শুনানির জন্য পেন্ডিং আছে।’

এই আইনজীবীদের মতে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা ধর্মঘট করতে পারে না কারণ তারা সরকারের চাকরি করে। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের একটি অংশও সরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। যারা তা করেন না তারাও মৌলিক অধিকারের একটি স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। তাদের কাজ মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত। তাই চিকিৎসা দেবে না এমন কোন ধর্মঘট তারা ডাকতে পারে না। কেউ যদি করে তাহলে তা সম্পূর্ণ ভাবে আইনের পরিপন্থি।

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক এলিনা খান বলেন, ‘তারা যে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করেছে এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা যখন মেডিকেল থেকে বের হয় তখন তারা একটা শপথ নেয় যে, তারা রোগীদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করবে এবং কোন হরতাল বা ধর্মঘটে যাবে না। কারণ এটা মানবিক সেবা। সুতরাং তাদের শপথের বরখেলাপ করে তারা যে কোন কর্মসূচি দিয়েছে সেটা বেআইনি।’

‘যারা চিকিৎসক হচ্ছে বা হয়েছে তারা কেউ বেসরকারি খাতে বা কেউ সরকারি খাতে পড়াশোনা করেছে। সরকারি মেডিকেলে যারা পড়াশোনা করেছে তারা তো সাধারণ নাগরিকের করের টাকায় পড়াশোনা করেছে। তাই তারা ইচ্ছে করলেই যে কোন সময় চিকিৎসা সেবা বন্ধ করতে পারে না। আর যারা সমগ্র চট্টগ্রামের হাসপাতাল বন্ধ করেছে, তারা এটা করতে পারে না। এসব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ন বেআইনি, অমানবিক এবং খারাপ জিনিস।’

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে যে পাঁচটি মৌলিক চাহিদার কথা বলা আছে, তার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। দেশের সকল আইনের উর্দ্ধে হল হল সংবিধান। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, চিকিৎসা সেবা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সাজা বা জরিমানা হলে সেবা বন্ধ করে দিবে এটা তো মানবাধিকার লঙ্ঘন।’

‘সেবার নামে মানুষকে জিম্মি করা, সে অন্যায় করবে তাকে কিছু বলা যাবে না?’

কোনো পদক্ষেপে চিকিৎসকরা অসন্তুষ্ট হলে প্রতিবাদের জন্য কালো ব্যাচ ধারণ, মানববন্ধন বা সাময়িক কর্মবিরতি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন এই আইনজীবী। বলেন, ‘কিন্তু তা না করে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করা অন্যায়।’

বারবার এই কাজ করেছেন চিকিৎসকরা

হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ধর্মঘট এখন প্রায় নিয়মিত খবরে পরিণত হয়েছে। এমনকি একটি হাসপাতালে ধর্মঘট ডাকার পর সারাদেশে তা ছড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। আর রোগীদেরকে জিম্মি করে নিজেদের অনৈতিক দাবি আদায়ের মতো ঘটনা ঘটাতে পারায় চিকিৎসকরা এই ধরনের কাজ করে আসছেন নানা সময়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘আপা’ ডাকায় এক রোগীর স্বজনকে অপমানজনক শাস্তি দেয়ার ঘটনা তদন্ত করে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। কিন্তু সরকার জানিয়ে দেয়, শাস্তি প্রত্যাহার হবে না।

কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ায় তীব্র ভোগান্তি তৈরি হয় সরকারি হাসপাতালে। এভাবে চাপ দেয়ার পাশাপাশি আর এমন হবে না, এই অঙ্গীকার করে দেন দরবার করে সাজা প্রত্যাহার করে নিতে সক্ষম হয় চিকিৎসকরা।

এক রোগীর মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে মামলা করলে ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দিন ধর্মঘট করেন চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা। আর এভাবেই তারা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।

২০১২ সালের ৩০ মে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমিনুল ইসলামের মলদ্বারের অপারেশন করার সময় শরীরের ভেতর সুঁই রেখে দেয়ার ঘটনায় মামলা হলে ২০১৩ সালের ৩ জুন এক চিকিৎসককে কারাগারে পাঠায় আদালত। আর পরদিন থেকে চট্টগ্রামে ধর্মঘট শুরু করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। আর চাপ দিয়ে তিন দিনের মধ্যে ওই চিকিৎসককে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন তারা।

এর আগে ২০১৪ সালে রাজশাহীর চিকিৎসক নেতা শামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের ডলফিন ক্লিনিকে ব্যবসায়ী আনোয়ারুল হক টিপুর মৃত্যুর পরও মামলা এবং চিকিৎসক গ্রেপ্তার হলে চট্টগ্রামের মতোই রোগীদেরকে জিম্মি করা হয়।

ভুল চিকিৎসার অভিযোগে টিপুর স্ত্রী শারমিন আক্তার তিন চিকিৎসকের মামলা করলে ওই বছরের ২৭ মার্চ শিমূলকে কারাগারে পাঠায় আদালত । এর প্রতিবাদে ওই দিন বিকেল থেকে রাজশাহীর সকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে ধর্মঘটে যান চিকিৎসকরা। চিকিৎস-কদের আন্দোলনের মধ্যে মুক্তি পান শিমূল।

এর আগেও ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের মনসুরনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের সহকারী সার্জন মাহমুদুল আহমেদের কারাদণ্ডের আদেশের প্রতিক্রিয়া গোটা জেলায় চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ডাক্তাররা।

অথচ মাহমুদুল সরকারি হাসপাতালে ডিউটি চলা অবস্থায় মৌলভীবাজার শহরের বেসরকারি হাসপাতাল দ্য ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করার সময় ধরা পড়েছিলেন হাতেনাতে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তখন তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে।

চার বছরেও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষিত উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি

২০১৪ সালের মার্চে রাজশাহীতে চিকিৎসক ধর্মঘটের পর এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এই ধরনের পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই উদ্যোগও আসেনি, আর চিকিৎসকরাও রোগীদের জিম্মি করে যাওয়ার কৌশল বাদ দেননি।

সে সময় চিকিৎসক ধর্মঘটে বিরক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ডাক্তারদের সতর্ক হওয়ার জন্য বলব। এ ধরনের চরমপন্থা তারা যেন অবলম্বন না করেন।’

চিকিৎসা নিয়ে উঠা অভিযোগের সুরাহা ও চিকিৎসা খাতের অনিয়ম দূর করতে বিএমডিসিকে শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়ে তখন মন্ত্রী বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যেন অভিযোগ করতে পারে। তদন্ত করে তারা ব্যবস্থা নিতে পারবে। ডাক্তারদের সনদও বাতিল করতে পারবে।’

কিন্তু বিএমডিসি কতটুকু শক্তিশালী হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখন করাই যেতে পারে।- ঢাকাটাইমস