চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবা বন্ধ : অবর্ণনীয় ভোগান্তি, দুর্ভোগ চরমে

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৮ ২২:৩৯:০৯ || আপডেট: ২০১৮-০৭-০৯ ১০:৫০:৩৫

চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে র‌্যাব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতি। তাদের এ ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিতর্কিত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখা।

এদিকে, চট্টগ্রামে হাসপাতালগুলো চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেয়ায় অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, হাসপাতাল থেকে বিনা নোটিশেই বের করে দেয়া হচ্ছে মুমূর্ষু রোগীদেরও। এদিকে রোগীদের জিম্মি করে এভাবে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন চট্টগ্রামের সর্বস্থরের জনগণ।

উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্যাব চট্টগ্রাম। জনগণকে জিম্মি করে নিজেদের দাবি আদায়ে ধর্মঘটের আহ্বান সাংবিধানিক অধিকার খর্বের শামিল বলে মন্তব্য করেছেন ক্যাব নেতারা।

রোববার বিকেলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রামের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাব বন্ধ করে দেয়া হয়। হাসপাতাল-ল্যাবের মুখে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে ধর্মঘটের ব্যানার। হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে সেবা নিতে আসা রোগীদের। অচল করে দেয়া হয় জরুরি বিভাগ।

প্রতিটি হাসপাতালের সামনে ভর্তি হতে আসা মুমূর্ষু রোগীদের বের করে নিয়ে আসার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। এতে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে। এ অবস্থায় চট্টগ্রামের দুই সরকারি হাসপাতাল চমেক ও জেনারেল হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়।

ম্যাক্স হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের প্রতিবাদে ধর্মঘটের ঘোষণা দিলেও সরেজমিন বেসরকারি হাসপাতালের সামনে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কাশেম স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি ঝুলতে দেখা গেছে। বিজ্ঞপ্তিতে ‘সাংবাদিক কর্তৃক বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নগ্ন হামলার প্রতিবাদে চিকিৎসাসেবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে’ বলে উল্লেখ করা হয়। এদিকে বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে নগ্ন হামলার অভিযোগ করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা। তাদের মতে, ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিয়াকত আলী বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। নিজের অবৈধ ম্যাক্স হাসপাতালকে বাঁচাতে ও চলমান আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতেই এমন ন্যক্কারজনক ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারিগর লিয়াকত।

রোববার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রামের বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন মুরাদপুরের বাসিন্দা মো. সাকিব। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি এখানে সুচিকিৎসার জন্য ছুটে এলেও চিকিৎসা জোটেনি তার কপালে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সাকিব সমকালকে বলেন, ‘নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য চিকিৎসকদের এমন কাজ অসভ্য বর্বরদের আচরণের মতো হয়েছে।’

ম্যাক্স হাসপাতালে গত ৪ জুলাই স্ত্রী অনু তালুকদারকে ভর্তি করান স্বামী সুজয় তালুকদার। রোববার হঠাৎ করে ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার কিছুক্ষণ পর তাদের সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। সুজয় তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, ‘পেটের ব্যথা নিয়ে স্ত্রীকে ভর্তি করি। গত দু’দিন ঢিমেতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা নাকি ধর্মঘট ডেকেছেন, তাই চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ জানিয়ে হাসপাতাল থেকে আমাদের চলে যেতে বলা হয়। এ অবস্থায় আমরা এখন কোথায় যাব।’ তিন দিনে ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪১ হাজার টাকার বিল হাতে ধরিয়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সুজয়।

নগরের গোল পাহাড়ের মেট্রো হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে মূল ফটক বন্ধ দেখা গেছে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। উত্তর কাট্টলী থেকে মায়ের কিছু পরীক্ষা করতে আসা মেয়ে স্বপ্না চৌধুরী বলেন, ‘চিকিৎসক মায়ের পাঁচটি পরীক্ষা এখান থেকে করতে বলেছেন। কিন্তু এসে দেখি প্রধান ফটকই বন্ধ। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও পরীক্ষাগুলো করাতে পারিনি। পার্শ্ববর্তী আরও কয়েকটি হাসপাতালে গিয়েও তা বন্ধ পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, দাবি আদায়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করার অধিকার নেই চিকিৎসকদের।

ধর্মঘট প্রসঙ্গে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কাশেম বলেন, ‘অযৌক্তিকভাবে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। যে জরিমানা করা হচ্ছে তা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।’ জরিমানা দিতে পারছেন না বলে কি রোগীদের জিম্মি করতে পারেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কিছুই করার নেই। ধর্মঘট প্রত্যাহার নিয়ে তার বক্তব্য- ‘সংশ্নিষ্টরা আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতায় এলে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর আগ পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।’

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্যাব চট্টগ্রাম শাখা। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এ ধরনের খেলা বন্ধের দাবি জানিয়ে নেতারা বলেন, তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। তা না করে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে জনগণের চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক অধিকার খর্ব করেছেন তারা।

সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও সরকারি জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে রোগীর বাড়তি চাপ দেখা গেছে। এ সময় কয়েকজন রোগীর স্বজন বলেন, ‘কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ পেয়েছি, যে কারণে বাধ্য হয়ে এখানে ছুটে এসেছি।’

রোববার ম্যাক্স হাসপাতালের পাশাপাশি নগরের আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অভিযানে নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।