চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮

এবার মুখ খুললেন ম্যাক্সের সেই ডিউটি ডাক্তার শুভ্র

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৭ ১৬:৫৯:৩৮ || আপডেট: ২০১৮-০৭-০৭ ১৬:৫৯:৩৮

এবার মুখ খুললেন ম্যাক্স হাসপাতালের সেই ডিউটি ডাক্তার শুভ্র দেব। রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. প্রণব কুমার চৌধুরীরসহ তিনজনের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তিন দায়ী চিকিৎসকদের একজন এই শুভ্র দেব।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের তদন্ত প্রতিবেদন বিএমএ চট্টগ্রামকে দেয়ার পর পরই ওই দুই চিকিৎসককে হাসপাতাল থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একইভাবে কথিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে আর ডাকা হবে না বলে ঘোষণা দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে করা তদন্ত প্রতিবেদনে নিজের নাম আসা, ম্যাক্স হাসপাতালের সিদ্ধান্ত ও নিজের আগামী বিসিএস পরীক্ষার কথা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ডা. শুভ্র দেব।

এর আগে দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক রুবেল খানের শিশুকন্যা রাফিদা খান রাইফার মৃত্যুর তদন্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে জমা দিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত টিম।

ওই তদন্ত প্রতিবেদনে রাইফার মৃত্যুর জন্য ডা. বিধান রায় চৌধুরীর, ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেবের অবহেলাকে দায়ী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

এরপর শুক্রবার ডা. দেবাশীষ ও ডা. শুভ্রকে ম্যাক্স হাসপাতাল থেকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। আর ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে আর ডাকা হবে না বলে ঘোষণা দেন হাসপাতালটির কর্মকর্তারা।

এরপর ম্যাক্স হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জেনেই শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৭ মিনিটে ফেসবুকে নিজের না বলা কথা তুলে ধরেন চাকরিচ্যুত শুভ্র দেব। তার সেই কথা পরিবর্তন পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘আমি ডিউটি করছিলাম ২৮ জুন ইভিনিং-নাইট, তখনও বাচ্চা ভালো। ২৯ জুন মর্নিং এ হ্যান্ডওভার। মর্নিং ডাক্তারকে দিয়ে আমি ডিউটি লিভ করি। এরপর আর আমার কোনো ডিউটি ম্যাক্স এ ছিল না। ২৯ তারিখ মর্নিং ডাক্তার আসলো। দুপুর ১টায় বিধান স্যার আসলো, ২৯ তারিখ ইভিনিং ডাক্তার আসলো। রাত ১২টায় বাচ্চা মারা গেল, সেখানে আমার কী দোষ?’

শুভ্র দেব লিখেছেন, ‘আমি ছিলাম ২৮ জুন। বাচ্চাটার কেবিনে চারবার যাই আমি। ডাকলেই চলে যাই। নার্সরা, সুপারভাইজাররা, ম্যাক্সের এমডিরা সবাই জানেন আমি কি রকম, পেশেন্টের প্রতি কতটা সিনসিয়ার। সেখানে আমার নাম আসলো বাচ্চার প্রতি অবহেলায়? সত্যি আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না আমার নামটা দেখে।’

আসন্ন বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা জানিয়ে নিজের অসহায়ত্বও লেখায় তুলে ধরেন এই নবীন চিকিৎসক।

‘বিসিএসের আর এক মাসও নাই। এই সময় এত বড় ট্রমা আমি নিতে পারছি না। তাহলে আমি কেন পেশেন্টের প্রতি এতটা কেয়ারফুল? ম্যাক্সের নার্স, ডাক্তাররা যদি আমার স্ট্যাটাসটা দেখে থাকেন তাহলে আপনারাই বলেন আমি কি রকম। আমার আর বলার কিছু নাই। শুধু রাইফার মা-বাবার মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলাম। জানি না তখন আর সেদিনের শুভ্রকে ওরা চিনবে কিনা।’

এরপর শুক্রবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিটে দেয়া আরেকটি স্ট্যাটাসে ডা. শুভ্র লিখেন, ‘আমাকে সিভিল সার্জন স্যার সেদিন হঠাৎ ফোন করে বলেন, তোমার সময়ও নাকি বাচ্চার সামান্য খিঁচুনি হয়? এক নার্স বলেছে। আমি বললাম, স্যার আমি নিজে জানি না খিঁচুনি হয়েছে, আর নার্স জানে? নার্সের কথা বিশ্বাস করবেন না স্যার। ওর তেমন কিছু হয়নি। একটু আনইজি ফিল করেছিল, আমি স্যালাইন অফ করার সাথে সাথে ও ভালো। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে পাস করেছি, এমন কিছু হলে আমি বুঝতাম।’

‘তারপর স্যার আমাকে বার বার ফোর্স করলে আমি আমার মৃত বাবা-মায়ের দিব্বি দিয়ে বলতে বাধ্য হই, স্যার সেদিন একটুও খিঁচুনি হয়নি। আমাকে বিশ্বাস করুন। বললেন, ঠিক আছে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।’

গত ২৮ জুন সন্ধ্যা ৬টার সময় দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী শিশুকন্যা রাইফার গলায় ব্যথার কারণে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর একদিন পর শুক্রবার দিনগত রাত ১২টার দিকে মৃত্যু হয় এক নির্মমতার মধ্য দিয়ে। ওই সময় হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলাকে দায়ী করেন রাইফার বাবা রুবেল খান।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতলটির ডিউটি ডাক্তার, নার্স ও এক কর্মচারীকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় সিএমপি চকবাজার থানায়। খবর পেয়ে বিএমএর চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল গিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন থানার ওসি ও উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে।

এরপরই পুলিশের মধ্যস্থতায় রাইফার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।