চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮

মিরসরাইয়ে বিষাক্ত বর্জ্যে মারা যাচ্ছে মাছ গবাদি পশু, বাড়ছে পতিত জমি

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৮ ২৩:৫৮:১৪ || আপডেট: ২০১৮-০৬-২৯ ১০:১০:৪৮

মিরসরাইয়ে শত শত একর জমিতে হচ্ছেনা ফসল

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্যে শত শত একর জমিতে কোন ফসল হচ্ছেনা। বিভিন্ন মৎস্য প্রকল্পে চাষকৃত মাছ মওে যাচ্ছে। মারা যাচ্ছে গবাদি হাস মুরগি । উপরন্তু পঁচা মাছের গন্ধে এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। আবার বর্ষায় জলাবদ্ধতায় সীমাহীন দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে এলাকার শতশত পরিবার। পরিবেশ বিপর্যয়ে এলাকা জুড়ে বাড়ছে পতিত জমি। পক্ষান্তরে বাড়ছে দূষণ। প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেনা বলে জানায় ভুক্তভোগিরা।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ ও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ১৫ নং ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কমলদহ এলাকায় সিপি বাংলাদেশ ও প্যারাগন ফিড নামক পোলট্রি এন্ড ফিসফিড কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে আশ-পাশের কয়েক গ্রামের শতশত বর্গ কিলোমিটার এলাকা দূষিত। সম্প্রতি সরেজমিনে সিপি বাংলাদেশ কোম্পানী লিমিটেডের পাশ্ববর্তি আশরাফুল কামাল মিঠুর মাছের প্রকল্পে শতশত মাছ মরে গেছে। এতে প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মাছের পঁচা দূর্গন্ধে থাকা দুস্কর হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, একটি প্রতিষ্ঠান সিপিতে সপ্লাই দেয়ার জন্য কিছু ক্যামিকেল নিয়ে আসছিলো। ক্যামিকেলগুলো মানসম্পন্ন না হওয়ায় সিপি কোম্পানী তা গ্রহণ করেনি। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেগুলো সিপির পাশে জমি, নালায় ফেলে যায়।

মৎস্য প্রকল্পে কর্মরত রাজিব হোসাইন বলেন, এখানে সিপি থেকে বের হওয়া বিষাক্ত বর্জ্যে আজ কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন শতশত মাছ মারা যাচ্ছে। মাছগুলো আধা মরা হবার পর থেকে কেউ ভয়ে নিয়েও যাচ্ছে না। একদিকে পরিস্কার করছি আর একদিকে মরে মরে ভাসছে। এতে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার সকল মাছ মরে গেছে বলে জানায়।

এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবছার, সেলিম উদ্দিন, নাছির, জসীম বলেন, বিষাক্ত ক্যামিকেলের কারণে এখানে শুধু মাছ না কচুগাছ গুলো পর্যন্ত মরে যাচ্ছে। কোন ধরনের শাক সবজি বা মৌসুমি ফসল চাষ হচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে এই এলাকায় কোন ধান হচ্ছেনা। বৃষ্টি হলে মানুষের বাড়ির আসেপাশের পুকুরগুলোতে ও কোনভাবে সিপি ও প্যারাগনের বিষাক্ত বর্জ্যপানি গেলে সবার পুকুরের মাছও মারা যাচ্ছে। এমনকি এইসব মাছ খাওয়া হাসমুরগিগুলো ও মারা যাচ্ছে।

খাজুরিয়া এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগি অর্জুন কুমার নাথ বলেন, এমন অবস্থা শুধু সিপির আশেপাশে নয় সিপি ও প্যারাগনের পুরো কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিরাজমান। তিনি বলেন, আমার ৬ একর জমিতে গত কয়েক বছর ধরে কোন ফসল হচ্ছেনা। পুকুরে মাছ হচ্ছেনা। নিজেদের ব্যবহারের জন্য ও পুকুরের পানি ব্যবহার করতে পারছিনা আমরা। কোনভাবে টিউবওয়েলের পানি দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারছি। এই বিষয়ে উক্ত কারখানা গুলো ও স্থানীয় প্রশাসনের কোন সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগি বলেন, এইসব অভিযোগ নিয়ে মাথা ঘামালে সিপি ও প্যারাগনের কিছু ভাড়াটিয়া লোক অভিযোগকারিদের হুমকি ধমকি ও নানান হয়রানি করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাঝে মাঝে এইসব কারাখানার পেলে যাওয়া পঁচা ডিমের গন্ধে চলাচল করা সম্ভব হয়না।

জানা গেছে, শুধু কমলদহ নয় উপজেলার উপকুলীয় এলাকার ইছাখালী ইউনিয়নের চরশরৎ গ্রামটি কৃষি উপযোগী বিস্তির্ণ চর থাকায় কৃষিই ছিল এ গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা। কিন্তু গ্রামটিতে সিপি নামের বিদেশী কোম্পানীর সহযোগীতায় রাতারাতি গড়ে উঠেছে ছোট-বড় ৬৭ টিব্রয়লার (মাংসউৎপাদনের) মুরগীরখামার। এতে কারো কারো ভাগ্য ফিরলেও নির্মল বাতাসের গ্রামটি এখন পোল্ট্রি বর্জ্যরে উৎকট গন্ধ আর দূষনে বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গ্রামের মসজিদ-মাদ্রাসা, বসতবাড়ি ও রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে সারিসারি মুরগীর খামার। চলাচলের রাস্তার উপর, নালা-ডোবায় ও পাশের বামনসুন্দর খালে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে খামারে উৎপাদিত বর্জ্যরে (লিটার) বড় অংশ। এতে সৃষ্টিহচ্ছেতীব্র দুর্গন্ধ আর সাথে মাছির উপদ্রব। গ্রামের লোকজন বলছেন, এখন এখানে মানুষের যত বেশি রোগবালাই হচ্ছে তা আগে কখনো দেখা যায়নি। শুধু মানুষ নয়, গৃহপালিত পশুপাখিও রোগাক্রান্ত হচ্ছে আগের তুলনায় বেশি। খালের পানি দুষিত হয়ে হরেক রকম মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। গ্রামবাসী স্থানীয়জন প্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেও পাচ্ছেনা এর কোন সুরাহা। মারামারি হানাহানি না থাকলেও পোল্ট্রি খামারের এমন গন্ধ-দুষনে গ্রামটিতে এখন শান্তি উদাও।

গ্রামের প্রবীন বাসিন্দা তেজেন্দ্র দাশ বলেন, এই গ্রামে এত এত পোল্ট্রি ফার্ম যেন আমাদের উপর অভিশাপ নিয়ে এসেছে। দুগন্ধ আর মাছির যন্ত্রনায় খেতে শুতে পাছিনা। শিশুদের রোগ বালাই গেছে বেড়ে। গরু-ছাগল পর্যন্ত মাঠেঘাস খাচ্ছেনা। কোথায় কার কাছে নালিশ করবো। এভাবে চলতে থাকলে তো গ্রাম ছেড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবেনা।

এইসব অভিযোগের বিষয়ে সিপির স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক ছোটন পাল এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইসব অভিযোগের বিষয়ে আমি স্থানীয় কারখানা ম্যানেজারদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহন করবো।

প্যারাগন এর ব্যবস্থাপক মৃণাল চক্রবর্তির কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের কোনবর্জ্য বাহিরে ফেলা হয়না। তবুও যাদের উপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের উপর নজরদারি করা হবে বলেজানান।

ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল কবির ফিরোজ বলেন, শুধু কমলদহ নয় এই দুই প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে ইউনিয়নের দক্ষিন ওয়াহেদপুর, খাজুরিয়া, মাইজগাঁও, বড়কমলদহ, ছোটকমলদহ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পরিবেশ দূষন এবং দূর্ভোগের শিকার। ফসলহানির পাশাপাশি তিনি বলেন সিপি কর্তৃক ছরার পানি অপসারণ গতিরোধ করায় কয়েক গ্রামের মানুষ পানিবন্ধি ও জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। কিছুদিন আগে একজন ব্যক্তির জানাযা ও দাফন পানিতেই করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি এই বিষয়ে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এই বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল কবির এর বলেন স্থানীয় জনগন ও ভুক্তভোগি ব্যক্তিবর্গ এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ প্রদান করলে আমরা সরেজমিনে আইনি উদ্যোগ গ্রহন করবো।