চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

৬৯ পেরিয়ে ৭০ বছরে আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৩ ০৯:৫৪:৪৪ || আপডেট: ২০১৮-০৬-২৩ ১৪:৩৯:০৮

দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৬৯ বছর পূর্ণ করে ৭০ বছরে পা রাখলো । ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন এর নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তী সময়ে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ দলটি প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী। দীর্ঘ উত্থান পতনের ধারাবাহিকতায় দলটি এখন নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় আছে এবং এবারই তারা সবচাইতে দীর্ঘসময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। দলের এই সাফল্য ধরা দিয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে।১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিরে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনা সাতবার দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, ৬৯ বছরের আওয়ামী লীগকে ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।

আওয়ামী লীগের ৭০ বছর পদার্পনের এ বিশেষ দিনটির সাথে এবার যোগ হতে চলেছে একটি নতুন মাত্রা । আজই উদ্বোধন হবে দলটির ১০ তলা সুরম্য নিজস্ব কার্যালয়ের। নবনির্মিত এই কার্যালয় ভবন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা।আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার জন্য কর্মী সম্মেলন হয়েছিল ২৩ ও ২৪ জুন (১৯৪৯), ঢাকার রোজ গার্ডেনে। দলের প্রথম সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে। তিনি নির্বাচিত হন জয়েন্ট সেক্রেটারি। বয়স মাত্র ২৯ বছর। কিন্তু তিনি আর ছাত্রলীগের সঙ্গে থাকবেন না, বরং আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেবেন, সে বিষয়ে সম্মতি নেওয়া হয়। ২৪ জুন শামসুল হক আওয়ামী লীগের প্রথম ম্যানিফেস্টো হিসেবে যে খসড়া উপস্থাপন করেন, তাতে মুসলিম লীগকে স্বার্থান্বেষী মুষ্টিমেয় লোকদের পকেট থেকে বের করে জনগণের মুসলিম লীগে পরিণত করার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি ভাষায় রচিত খসড়া ঘোষণা ও গঠনতন্ত্রে বলা হয়, মুসলিম লীগ সময়ের বিবর্তনে ‘সরকারি লীগে’ পরিণত হয়েছে। বিরোধী কণ্ঠ হরণ করা হয়েছে। দলটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি তোলে।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে ছিলেন। মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে আসা দলটি কেন দলের সদস্যপদ কেবল মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে, সে প্রশ্ন তার মনেও ছিল। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ যায়। সে সময়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বেই সাম্প্রদায়িক দল থেকে অসাম্প্রদায়িক দলে উত্তরণ করে আওয়ামী লীগ।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগ এ ভূখণ্ডের প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন আওয়ামী লীগের; কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন কৃষক প্রজা পার্টির শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান তার একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতায় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাঙালিদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। বাস্তবতাই তাকে পাকিস্তানকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে আনে। তিনি ৪০ বছর বয়সেই লক্ষ্য স্থির করেছেন- স্বাধীনতা। এ জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ৬ দফা কীভাবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সামনে উপস্থাপন করা হবে, সেটা নিয়ে দলের অনেক শীর্ষনেতার সঙ্গে কথা বলেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানকে (আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) এ প্রস্তাব উত্থাপন করতে বললে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে ফাঁসিতে লটকাতে চাও।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। তার বিশেষ কৃতিত্ব এখানে যে, তিনি এ দাবিতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন এবং নিজের দলকেও এ জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামের পথে অগ্রসর হতে হলে বিশেষভাবে চাই তরুণ প্রজন্মকে। ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপনের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই দলটি দেশবাসীকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করাটা শেখ মুজিবের অন্যতম রাজনৈতিক সাফল্য। ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের আপোষহীন সংগ্রাম-লড়াই এবং ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ তথা সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ কে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি দীর্ঘ একুশ বছর সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর আর এক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়ে আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় এই দলটি।

পরবর্তিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুযারির সাধারন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে টানা দুই মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা দশ বছর ক্ষমতায়। বাংলাদেশের জন্য এটা রেকর্ড। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার সরকার সাফল্য পেয়েছে, এটা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু রাজপথের চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পাশে রয়েছে, সেটা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

৭০ বছরে পদার্পনের এ দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৯টায় ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, সকাল ১০টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং সংগঠনের নবনির্মিত কার্যালয় ভবন উদ্বোধন।
এছাড়া বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাস ভবন গণভবনে বিশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সারাদেশ থেকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের চার হাজার ১৫৭ জন নেতা যোগ দেবেন। বর্ধিত সভার আগে তৃণমূল নেতারা সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলের নতুন কেন্দ্রীয় কার্যালয় উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। নেতাদের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সরকারের উন্নয়নের কথা প্রচারের নির্দেশনা দেবেন দলীয় সভাপতি। বর্ধিত সভায় উপজেলা-পৌরসভার পাশাপাশি মহানগরের আওতাভুক্ত থানা-ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রথা না থাকলেও দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে এবার তৃণমূলের নেতারা বর্ধিত সভায় উপস্থিত থাকবেন এবং এই সভায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেবারও সুযোগ পাবেন।