চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

‘বাবা’র মায়াজালে বন্দি হচ্ছে রাঙামাটির তরুণরা!

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-০৩ ১৬:৪৮:১১ || আপডেট: ২০১৮-০৬-০৩ ১৬:৪৮:১১

আলমগীর মানিক

“বাবা”র মায়াজালে প্রতিনিয়ত বন্দি হচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির উঠতি বয়সী তরুনদের একটি বড় অংশ। পাশ্ববর্তী দেশ থেকে আসা ইয়াবা নামক বাবার মায়ায় বুদ হয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম পর্যটন শহর রাঙামাটির তরুন সমাজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। হেরোইন ও ফেনসিডিলের চেয়ে ‘বাবা’র নেশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়। তাই রাঙামাটির অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল পরিবারের নেশাখোর তরুণেরা এখন আশঙ্কাজনকহারে বাবার নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছে। মরণনেশা ইয়াবার সাংকেতিক নাম ‘বাবা’, কেউ কেউ একে লালবড়ি বা ‘গুটি’ও বলে। বহনে ঝুঁকি কম হওয়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাঙামাটির নেশা বিক্রেতারাও ‘বাবা’ বিক্রির মিশন শুরু করে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। শহরের কলেজ গেইট, দেবাশীষ নগর, হ্যাপির মোড়, চম্পকনগরের বিদ্যুৎ রেস্ট হাউজের কোনা, বনরূপা, কাঁঠালতলী, বাসষ্ট্যান্ড, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি, আসামবস্তি ও মাঝের বস্তির অন্ততঃ ১৫ থেকে ২০টি পয়েন্টে নেশা জাতীয় এই বড়ি পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে ইয়াবাসেবীরা। তবে নকল ইয়াবাও বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সে। মায়ানমার থেকে আনা এক ধরণের ক্ষতিকর নেশার বড়ি ‘বাবা’ নামে চালিয়ে দিচ্ছে কেউ কেউ। হেরোইনের নেশায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণের পিতা জানালেন, ‘মরণনেশা “বাবা” আমার ফুটফুটে ছেলেটার জীবন শেষ করে দিল। যখন টের পেয়েছি, তখন আমাদের আর কিছুই করার নেই। দুইবার নিরাময় কেন্দ্রে নিয়েও কোনো ফল হয়নি। এখন সে বদ্ধপাগল। বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সাথে আলাপ করলে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানালেন,‘একেকবার একেকটি নতুন নেশাদ্রব্য আসে, আর আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এখন যা শুনছি, তাতে ছেলেমেয়েদের ঘরে আটকে রাখা ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।’ তিলে তিলে একটি ফুটফুটে জীবন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য সহ্য করা যায়না, কিন্তু শত চেষ্টা করেও আমরা তাদের বশে রাখতে পারছিনা। উপরন্তু নানা জায়গা থেকে মিথ্যে বলে বাহানা করে অর্থ যোগাড় করছে নেশার জন্য, এর প্রায়শ্চিত্য করতে গিয়ে আমরা নানাভাবে অপদস্থ হচ্ছি’। পরিবারটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে।’

এদিকে সম্প্রতি রাঙামাটি জেলায় যোগদান করেই মাদকের বিরুদ্ধে নিজের জিরো টলারেন্সের কথা ষ্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়ে নিজের অধীনস্থ অফিসারদেরকে রাঙামাটি শহরের মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা প্রদান করেন পুলিশ সুপার আলমগীর কবির। এরপর থেকেই শহরের মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই চলছে বিশেষ অভিযান। কোতয়ালী থানা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখাগেছে, মে মাসে থানায় মাদকেরই মামলা হয়েছে ১২টি। এসব মামলার বিপরীতে আসামী হিসেবে ইয়াবা ও চোলাইমদসহ আটক করা হয়েছে অন্তত ২২জনকে। আটককৃতদের প্রায় এক তৃতীয়াংশই ১৯ থেকে ৩০ বছরের যুবক বলে থানা সূত্র জানিয়েছে। খুরচরা পর্যায়ের বিক্রেতা হিসেবে পরিচিত এসব আসামীদের কাছ থেকে ৬৪১পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৫৫ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ সত্যজিৎ বড়ুয়া।

পুলিশ জানায়, এসআই সৌরজিৎ বড়ুয়া, এসআই শাহ আলম, এসআই মুজিবুর রহমান, এএসআই আসাদ ও এএসআই হীরালাল রায় এর নেতৃত্বে কোতয়ালী থানা পুলিশ মে মাস জুড়েই রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার, বনরূপা, পৌরসভা এলাকা, কাঠাঁলতলী, আসামবস্তী, ভেদভেদী, ফরেষ্টকলোনী এলাকা, কল্যাণপুর, রিজার্ভমুখ, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসকল আসামীদের গ্রেফতার করেছে বলে কোতয়ালী থাকা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

কোতয়ালী থানা কর্তৃপক্ষ জানান, মে মাসজুড়েই তাদের চলমান অভিযানে মাদকের মামলার পাশাপাশি ৮টি ওয়ারেন্ট তামিলসহ সর্বমোট ১৬টি মামলা দায়ের করেছে। এসকল মামলার বিপরীতে সর্বমোট গ্রেফতারকৃত আসামীর সংখ্যা হলো ৩০জন। এই সময় শহরের ট্রাক টার্মিনাল থেকে চুরি যাওয়া একটি মিনি পিকআপ ২দিনের মধ্যেই চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করেন কোতয়ালী থানার এসআই সৌরজিৎ বড়–য়া। থানার অফিসার ইনচার্জ সত্যজিৎ বড়–য়া জানিয়েছেন, সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার যে কর্মসূচী শুরু হয়েছে সেটির আলোকে প্রতিদিনই আমরা শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছি। তিনি বলেন, পুলিশ সুপার আলমগীর কবির মহোদয়ের সার্বিক নির্দেশনায় এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের জিরোটলারেন্স নীতির কারনেই আমরা অভিযানগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রেই কোনো প্রকার সুপারিশ গ্রহণ করছি না। মাদকের সাথে জড়িত এমন সুনির্দিষ্ট্য তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশের টিম গিয়ে সংশ্লিষ্ট্যদের আটক করছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, অনেক মাদকসেবীকে আটকের পর বেশ উচু পর্যায় থেকে ফোন এসেছে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু আমাদের উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নাথাকায় আমরা কারোরই সুপারিশ আমলে নিচ্ছিনা। মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে জানিয়ে ওসি বলেন, আমরা তৃণমুল পর্যায়ে যেতে চাই। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার কোনো বিকল্প নাই।

এদিকে, শহরের নানা প্রান্ত থেকে আটক করা মাদকসেবীদের সকলেই খুরচা পর্যায়ের এমন তথ্য জানিয়ে সচেতন নাগরিক মন্তব্য হলো মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানে এখনো পর্যন্ত পাইকারি বিক্রেতা বা তাদের নিয়ন্ত্রণকারিদের কেউই আটক হয়নি। এতে করে মাদক বিক্রির তেমন একটা অসুবিধা হবেনা। নতুন নতুন বিক্রেতা সৃষ্টির মাধ্যমে তারা চালিয়ে নিবে তাদের মাদকের ব্যবসা।

এদিকে, রাঙামাটি শহরে পুলিশের অভিযান জোরদার হওয়ার ফলে মাদকসেবীরা নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে শহরের চিহ্নিত কিছু আবাসিক হোটেলকে। সম্প্রতি এমনই তথ্য উঠে আসে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে। কয়েকদিন আগে রিজার্ভ বাজারের চিহ্নিত আবাসিক হোটেল জেরিন এ অভিযান পরিচালনা করে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল। এই অভিযানের খবর আগে থেকেই পুলিশেরই একটি চক্রের মাধ্যমে জানতে পেরে হোটেলটির পরিচালকপক্ষ তাদের হোটেলে রাখা পতিতাগুলোকে নীচ দিয়ে নামিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসতঘরে তুলে দেয়। পরে স্থানীয় বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী দুই পতিতাকেসহ এক দালালকে আটক করে ডিবি পুলিশের হাতে তুলে দিলেও পুলিশ তাদেরকে ছেড়ে দেয়।

এসময় ঘটনাস্থলে অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ডিবি পুলিশের এক এএসআই আহসান জানান, আমরা অভিযানকালীন সময়ে উক্ত মহিলাদের হোটেলে ভেতর পাইনি। তাই তাদেরকে আটক করিনি। এসময় তিনি উপস্থিত শ’খানেক উৎসুক জনতার সম্মুখেই হোটেল জেরিনের ম্যানেজারকে ধমক দিয়ে বলতে থাকেন আজকের পর থেকে আর কোনদিন যদি এই হোটেলে মাদকসেবীসহ এই সকল নারীদের উপস্থিতি পাই তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা দিবো। এক পর্যায়ে হোটেলটির বাইরে এসে তিনি বলতে থাকেন, হোটেল জেরিনের প্রত্যেকটি রুমের মধ্যেই মাদক সেবনের জিনিসপত্রের অস্থিত্ব পাওয়া গেছে। অভিযানের সময়ে গন্ধে সেখানে হাঁটা যাচ্ছিলো না। এই হোটেলে মাদকসেবীদের ব্যাপক আড্ডা জমে এটাই প্রতিয়মান হয়েছে। এসময় স্থানীয় উৎসুক জনতাদের অনেকেই হোটেল জেরিনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও ডিবি’র সেই কর্মকর্তা জানান, তার উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি এবার প্রথমবার ওয়ার্নিং দিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাই আমি এই অঞ্চলে নতুন এসেছি তাই প্রথম অভিযানে রাস্তাঘাট ভালোভাবে চিনতে পারিনি। ভবিষ্যতে এটা মাথায় রেখেই আমরা এসব হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো। এসময় হোটেল জেরিনের ম্যানেজারের কাছ থেকে মুচলেখাও নেয় পুলিশ।

এদিকে পুলিশের একজন উদ্বর্তন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবাসিক হোটেলগুলোকে অনৈতিক কাজ চলে এটা জানার পর আমরা অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু হোটেল মালিক সমিতির কয়েকজন চিহ্নিত নেতা প্রায়শই অভিযোগ করে থাকেন আমরা নাকি হয়রানী করি। তাই এবার আমরা প্রাথমিক সর্তকতামূলক অভিযান দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্ঠা করেছি। এরপরও যদি তারা তাদের চরিত্রের পরিবর্তন নাকরে তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এসকল আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবো।

শহরের আবাসিক হোটেলগুলোতে মাদকসেবীদের অবাধ বিচরণে উদ্দিগ্ন আতংকিত অভিভাবক মহল। আশংকার বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নেশার বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ায় তরুণ প্রজন্মের নিরাপদ জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এসব তরুণ নেতা বড়ভাই সেজে প্রথমে নিজের পকেটের পয়সায় নেশা করাচ্ছে। এক পর্যায়ে নেশায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ার পর তারাই বড়ভাইয়ের নেশাদ্রব্যের যোগান দিচ্ছে। রাঙামাটি শহরে ১৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রজন্মটি বিশেষ করে এ বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ছে। আবার রাঙামাটি শহরে ১০ থেকে ১২বছর বয়সের কিশোরদের দিয়েও এ সব নেশাদ্রব্য বিক্রি করানো হচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে বেশ কয়েকজন ইয়াবাসেবী। মানভেদে একেকটি ইয়াবা বড়ি ১২০,৩৫০, ৫০০ থকে ৭০০টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। একেকটি পাতায় লাল রঙের ২০টি করে বড়ি থাকে। একটি বড়ি সেবন করলে কমপক্ষে দুই দিন নেশা থাকে। অপরএক সেবনকারী বলেছে, ইয়াবা এখন নকল হচ্ছে। আগে একটি ট্যাবলেট সেবন করলে দুই-তিন দিন নেশা থাকত, এখন দুই-তিন ঘণ্টার বেশি থাকে না।

চিকিৎসকদের মতে ইয়াবা একটি যৌন উত্তেজক (অ্যান্টিসাইকোপিক)বড়ি। এই বড়ি সেবনকারীর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। বড়ি সেবনে সাময়িক যৌন উত্তেজনা বাড়লেও একসময় আসক্ত ব্যক্তি যৌন সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।