চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে পারুলের মাদক সম্রাজ্যের পতন

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৬ ২৩:০৪:০৩ || আপডেট: ২০১৮-০৫-২৭ ১৫:২৪:৪৬

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত বরিশাল কলোনির ফেনসিডিল ব্যবসার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন মাদক সম্রাজ্ঞীখ্যাত পারুল বেগম। তার অধীনে মাদক বেচাকেনায় কাজ করত কমপক্ষে ৭০ জন নারী ও শিশু। বিভিন্ন সময়ে বরিশাল কলোনিতে র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে একাধিক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার কিংবা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও পারুল বেগম ছিলেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে বরিশাল কলোনিতে একাধিক অভিযান পরিচালনার পর গ্রেপ্তার হয়েছে পারুল বেগম। পতন ঘটেছে তার সম্রাজ্যের।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১২ বছর আগে বরিশাল কলোনি মাদক স্পটের অন্যতম হোতা ফারুক-ইউসুফ গ্রুপের সদস্য হয়ে আধিপত্য বিস্তার করেন পারুল বেগম। কলোনিতে তিনি ‘পারুল আপা’ নামে পরিচিত হলেও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে তার পরিচয় ‘ভাবি’ হিসেবে। এক যুগ ধরে ৪০ জন নারী ও ৩০ জন শিশু-কিশোরকে কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল পারুল।

২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ফারুক নিহত হলে এই দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয় সালামত। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে বরিশাল কলোনিতে একের পর এক অভিযান চলতে থাকলে স্পট ছেড়ে পালিয়ে যায় ইউছুফ ও সালামত। গত ১৯ মে নগরীর সদরঘাট থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের তিন সদস্য গ্রেপ্তার হলে স্পট ছেড়ে পালিয়ে যায় পারুল বেগমের অন্যতম সহযোগী শুক্কুর। গত ২৩ মে সদরঘাট ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে বরিশাল কলোনির মাদক স্পটের ৩০টি খুপড়ি ঘর উচ্ছেদ করলে স্পটে একদিন বন্ধ থাকে মাদক বেচাকেনা। পুলিশ জানতে পারে একের পর এক অভিযানের মধ্যেও কলোনিতে অবস্থান করছে পারুল বেগম। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে পারুল স্থানীয় ল্যাঙ্গা লোকমানের কলোনিতে সহযোগীদের নিয়ে মজুদ রাখা মাদক অন্যত্র সরিয়ে নিতে গেলে খবর পেয়ে আবার অভিযানে নামে পুলিশ

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার সৈয়দ আব্দুর রউফ রাইজিংবিডিকে জানান, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ভোররাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত বরিশাল কলোনিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সিএমপি দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এসএম মোস্তাইন হোসাইনের নেতৃত্বে সদরঘাট থানা পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে প্রথমে স্পট নিয়ন্ত্রক পারুল বেগম ও তার সহযোগী জহুরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যমতে নালার ভেতরে লুকিয়ে রাখা ৪ বস্তায় ৬৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পারুল বেগম জানান, ভারত থেকে ফেনসিডিল নিয়ে এসে বরিশাল কলোনিতে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। তিনি আরো জানান, ৭০ জন নারী ও শিশু তার সহযোগী হিসেবে মাদক ব্যবসায় জড়িত।

লক্ষ্মীপুরের সদর থানার চর রুহুতি এলাকার মো. জাহাঙ্গীরের স্ত্রী পারুল বেগম বরিশাল কলোনিতে গত ১২ বছর ধরে মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছে বলে জানায় পুলিশ। পারুল বেগম তার ব্যবসা প্রসারের লক্ষ্যে বরিশাল কলোনি ও মালি কলোনিতে তৈরি করেছে পৃথক পৃথক খুপড়ি ঘর। এ সব ঘর থেকে পাইকারি ও খুচরা বিকিকিনি হতো।

সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন জানান, এক যুগেরও বেশি সময় পারুল এত বড় গ্যাং তৈরি করে মাদক ব্যবসা করলেও কৌশলে সবসময় পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে পারুল।

পারুল বেগমকে ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় সদরঘাট থানার এসআই শিমুল চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মাদক আইনে দায়ের করা মামলায় পারুলসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামির মধ্যে রয়েছে বরিশাল কলোনির একসময়ের নিয়ন্ত্রক ফারুকের ভাই শুক্কুর, শ্যালক ওমর ফারুক রানা, ল্যাঙ্গা লোকমান, জহুরা বেগম, শাহজাহান, হেলাল, জুয়েল, মোশাররফ হোসেন লিটন, সিরাজ, রাজু, কালা মনির এবং কাশেম ওরফে টেরা কাশেম। এই আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।