চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সকল বাঙালিকে সম্মাননা উৎসর্গ করলেন শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৬ ১৫:১০:৪১ || আপডেট: ২০১৮-০৫-২৬ ১৫:১১:২০

পশ্চিমবঙ্গের কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি সকল বাঙালিকে উৎসর্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমার জন্য আজকের দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কবি নজরুল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে ডিলিট প্রদান করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বড় সম্মানের। এ সম্মান শুধু আমার নয়, সব বাঙালির।

শনিবার (২৬ মে) পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে এবং গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র দূরীকরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখার জন্য শেখ হাসিনাকে এই ডিগ্রি দেয়া হয়।

কবি নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করে বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবৃত্তি করেন-
“বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক-দুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!”

শেখ হাসিনা বলেন, কবি নজরুল ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক, নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা, সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সৈনিক। অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বাণী তার বচন ও আচরণে প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের অতি প্রিয় দুখু মিয়ার শৈশব, কৈশোর অতিবাহিত হয়েছিল চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে। আর তাই তার সাহিত্যচর্চার বহুমুখী পটভূমিটিও সংগ্রামমুখর।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নজরুল আমাদের সকলের। বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষের প্রাণের অন্তস্থলে তিনি রয়েছেন। কবি প্রাবন্ধিক অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন:
“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে,
ভাগ হয়নি কো নজরুল।”
তিনি আরও বলেন, সত্যই তো নজরুল ভাগ হয়নি। আর তারই প্রতিফলন কবির নামে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এসময় কবি নজরুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বয়সে তখন ছিলেন তরুণ। বাংলার ইতিহাসের এই দুজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের চরিত্রে ছিল দারুণ মিল। একজন ছিলেন সাহিত্যের কবি আর অন্যজন ছিলেন রাজনীতির কবি।

তিনি বলেন, চিন্তাচেতনা ও জীবনদর্শনের দিক থেকে কাজী নজরুল ইসলাম ও আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান একই মেরুতে। উভয়েই শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন।

আ.লীগ সভাপতি বলেন, চুরুলিয়ায় জন্ম হলেও কবি নজরুলের বিচরণ ছিল সারাবাংলায়। শৈশবের একটি পর্ব তিনি কাটিয়েছেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে। পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন সময়ে তিনি কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর নানা জায়গায় থেকেছেন, মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। পূর্ববাংলার নরম-পলিমাটি আর অবারিত সবুজ তাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করতো। বিদ্রোহীর অন্তরালে কবির হৃদয়ে যে পলিমাটির মতো নরম পেলবতা, তা বোধকরি পূর্ববাংলার জল-হাওয়ার কারণেই হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বাঙালিরা ভাগ্যবান যে আমরা রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মত দুই মহান কবি পেয়েছি। তারা শুধু আমাদের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকেই সমৃদ্ধ করেননি, তারা আমাদের মূল্যবাধ এবং জীবনাচারণেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। বাঙালির চরিত্রে কোমলতা আর দ্রোহের যে মিশ্রণ তা সম্ভবত এই দুই কবির কাছ থেকে পাওয়া।

তিনি বলেন, আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে নজরুলের কবিতা ও গান প্রেরণার উৎসমূল ও শাণিত তরবারি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নয়, পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তার কবিতা ও গান পূর্ব বাংলার জনমানুষকে একটির পর একটি ন্যায্য আন্দোলন, সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তার চিকিৎসা ও বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন। নজরুলের বিখ্যাত গান ‘চল চল চল/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কবির মৃত্যুর পরে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়।

সমাবর্তনে অংশ নেওয়া গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের মধ্যে অনেকেই আজ শিক্ষাজীবন শেষ করে জীবনের বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবেন। অনেকেই কৃতী হবেন, দেশে বিদেশে আপনাদের সুনাম ও যশ ছড়িয়ে পড়বে। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, জীবনের সকলক্ষেত্রে আপনারা মানবতাবোধকে সবার উপরে স্থান দেবেন। যেমনটি কবি ব্যক্ত করেছিলেন তার মানুষ কবিতায়:
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল, পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”