চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮

মাহাথির একজনই!

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১০ ২৩:০৭:৫১ || আপডেট: ২০১৮-০৫-১১ ১৫:১০:৩৪

অবসরের পর যে বয়সকালে এসে বই পড়ে, বাগান করে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, ঠিক সে বয়সে নির্বাচনে অংশ নিয়ে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়। সে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে তিনি অবাক করেছেন সকলকে।

বলা হচ্ছিল আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি মাহাথির মোহাম্মদের কথা। মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনিই হতে চলেছেন বিশ্বের প্রবীণতম প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়ার রাজনীতির এই প্রবাদ পুরুষকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আবারও তুমুল আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে।

১৯২৫ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ উপনিবেশ মালয় দ্বীপের কেদাহ অঞ্চলের সেতার নামক গ্রামে সাধারণ এক স্কুল শিক্ষকের ঘরে জন্ম নেন মাহাথির। তার আগে যে তিন জন প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া শাসন করেছেন তারা সবাই ছিলেন সমাজের অভিজাত শ্রেণি থেকে আসা। সেই হিসেবে সাধারণ ঘর থেকেই উত্থান মাহাথিরের।

মাহোথিরের শিক্ষাজীবনের শুরু মালয়ের একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে। বরবরই প্রথম স্থান অধিকার করে এগিয়ে নেন শিক্ষাজীবন। ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন তার পিতা। যে কারণে এই ভাষায় জাদুকরি দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৪৭ তিনি সিঙ্গাপুরের কিং অ্যাডওয়ার্ড সেভেন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। মাহাথিরসহ মাত্র ৭ জন মালয় শিক্ষার্থী তখন সেখানে পড়াশোনা করছিলেন।

চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে মালয়েশিয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে যোগ দেন তিনি। সরকারি বিধিনিষেধের ওপর বিরক্ত হয়ে কিছুদিন পর নিজেই খুলে বসেন প্রাইভেট ক্লিনিক। যেটি ছিলো সে সময়কালে মালয় বংশোদ্ভুত কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন একমাত্র হাসপাতাল। যদিও মনে করা হয়, শুধু রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্যই সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন মাহাথির। চাকরি ছাড়ার পরপরই রাজনৈতিক দল ইউএমএনও থেকে মালয় প্রাদেশিক রাজ্যের শীর্ষ পদে নিয়োগ পান।

যদিও চিকিৎসক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান মাহাথির। সঙ্গে বাড়তে থাকে তার গণসম্পৃক্ততা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের একদম কাছাকাছি থাকতেন এই নেতা। বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পরও এখন অবধি তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি

১৯৬৪ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহাথির। ১৯৬৯ সালেও পুনরায় নির্বাচিত হন। নিজ দলের প্রধান এবং মালয়েশিয়ার তৎকালীল প্রধানমন্ত্রী টেংকু আবদুর রহমানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ৩ বছর রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। ১৯৬৯ এর ৩০ মে সংঘটিত চীনা ও মালয়ীদের মধ্যকার দাঙ্গার জন্য টেংকু আবদুর রহমানকে দায়ী করেছিলেন তিনি।

১৯৭২ সালে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন। সেবছরই সিনেটর নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পর শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তুন হোসেন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পরলে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান।

১৯৮১ সালের নির্বাচনে দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। দীর্ঘ ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে আসেন তিনি।

মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য বিশ্বজুড়েই সমাদৃত মাহাথির। মালয়েশিয়াকে বদলে দেন উন্নয়নমূলক নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে। এ জন্য তাকে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি বলে অভিহিত করা হয়। ক্ষমতায় আসার পর একের পর মহপরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন সেগুলো। ২০২০ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার যে অর্থনৈতিক কর্মসূচিও, তার পরিকল্পনাও ছিলো মাহাথিরের।

মাহাথিরের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন। ১. মালয়েশিয়ার সকল মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। ২. মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। ৩. আশির দশকে গৃহিত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। যার ফলাফল দাঁড়ায়, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উলটো আরও ৮ লক্ষ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া। ৪. একই বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে। ৫. পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ। সমুদ্র থেকে ৬,৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার। অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি। একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণ। বিশাল বিশাল হাইওয়ে নির্মাণ। এসব সফল উদ্যোগ গোটা মালয়েশিয়াকে বদলে দেয়। ৬. ১৯৯০ সালেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ৭. ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ৮. অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর তালিকায় তলানিতে থাকা মালয়েশিয়াকে মাহাথির নিয়ে আসেন ১৪তম স্থানে।

মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। কর্মীদের যা করতে বলতেন তা তিনি নিজে করেও দেখিয়েছেন। সরকারি কর্মীরা যেন ঠিক সময়ে অফিসে আসেন, সেজন্য নিজেও নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসতেন। টাইম ম্যাগাজিন একবার তার অফিসে আসার সময় রেকর্ড করেছিল। পরপর পাঁচদিন মাহাথিরের অফিসে প্রবেশের সময় ছিল সকাল ৭:৫৭, ৭:৫৬, ৭:৫৭, ৭:৫৯, ৭:৫৭ মিনিটে।

ব্যক্তিজীবনে সিঙ্গাপুরে মেডিকেলে পড়ার সময় সহপাঠী সিতি হাসমাহর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মাহাথির। তাদের রয়েছে চার সন্তান। এছাড়া দত্তক সন্তান রয়েছে আরও তিনজন।

২০১৮ সালে ফের রাজনীতিতে ফিরে এসে ভোটে জিতে চমকে দিয়েছেন তিনি গোটা বিশ্বকে। বুধবার মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিতের পর তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিলেন। মালয়েশিয়ায় আবারও সূচনা হচ্ছে মাহাথির যুগের। ৯২ বছর বয়েসেও দেশের জন্য তিনি যেভাবে মাঠে নেমেছেন তা অনুকরণীয় হয়ে থাকবে বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে।