চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সেই আমি কি আমি আমি?

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৮ ১০:৫৭:৩৮ || আপডেট: ২০১৮-০৪-১৮ ১২:৩২:১৭

ফজলুর রহমান

লালনের জীবন গেছে আজীবন জিজ্ঞাসায়। নিজেকে চিনে নেয়ার তাগিদ তুলেছেন তাঁর অজস্র গানে। মানবদেহের কয় দরজা, কয় কুঠরি তালাশ করে গেছেন অবিরত। দেহভান্ডের পথে-ঘাটে বেশি আনাগোনা ছিল এই বাউল সম্রাটের। জানতে চেয়েছেন এই দেহখাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়। হৃদয় পাশে যে পড়শী বসত করে, তাকেও দেখতে বড় আকুল ছিলেন লালন। সেই লালন শাহ’রও আর নিজেকে চেনা হলো না। নিজের গানে তাই তুলে ধরেন-‘যে বোলায়রে আমি আমি সেই আমি কি আমি আমি লালন বলে, কেবা আমি আমায় আমি চিনি নে’।

আত্মজিজ্ঞাসায় বিভোর ছিলেন বিশ্বকবিও। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন- ‘প্রভু, এলেম কোথায় !/কখন বরষ গেল, জীবন বহে গেল, কখন কী-যে হল জানি নে হায়। /আসিলাম কোথা হতে, যেতেছি কোন্ পথে, ভাসিয়ে কালস্রোতে তৃণের প্রায়’।

জ্ঞানের সেরা সূত্র হলো- Know thyself । অর্থাৎ ‘নিজেকে জানো’। আরো সূত্রে সূত্রে বললে এভাবে হয়- ‘আমি জানি যে, আমি জানি’ অথবা ‘আমি জানি যে, আমি জানি না’। আর নিজেকে না জানার খেসারতে জ্ঞান বঞ্চিতরা থাকেন এভাবে-‘সে জানে না যে, সে জানে’ অথবা ‘সে জানে না যে, সে জানে না’।

আসলে নিজেকে জানাটাই বোধ করি এটা পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজ। পৃথিবীর অনেক বিজ্ঞানী বা দার্শনিকই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছেন। বলা হয়, যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সেদিন পৃথিবীতে তেমন কোন রহস্য অবশিষ্ট থাকবে না।

একটা উদাহরণ ধরা যাক, রফিক-এর দেহটা সকলের কাছে ” রফিক” নামে পরিচিত। কেউ ” রফিক ” নামে ডাক দিলে ” রফিক” এর “দেহ-মন” সেই নামে সাড়া দেয়। তবে কি এই দেহটাই ” রফিক”? ধরে নিলাম তাই। তবে তাই যদি হবে, তাহলে ” রফিক” এর অন্যান্য সম্পদ (যেমন- ঘড়ি, বাড়ি, গাড়ি, মোবাইল) এর মতো রফিকের দেহের বিভিন্ন অংশকে কেন বলা হয় রফিক-এর মাথা, হাত, পা, চোখ, চুল ইত্যাদি ? তাহলে কি ধরে নিতে হবে, এই দেহটাও ‘রফিক’ না। রফিকের অনন্যা সম্পদের মত দেহটাও রফিকের সম্পদ মাত্র!

এবার অদৃশ্য আত্মায় আসি। সম্পদ নিজের না হলেও আত্মা নিজের হতে পারে। এজন্য বলা হয়, যার আত্মা সে। তোমার আত্মাই তুমি। কিন্তু আসলেই কি নিজের আত্মাটাই নিজে? তাহলে রফিকের আত্মাটাকে রফিক বলা হবে। কিন্তু তা না বলে কেন বলা হয়- রফিকের আত্মা ভালো, রফিকের মন খারাপ ইত্যাদি? কোন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলে কেন বলা হবে-‘রফিকের প্রাণ বাঁচলো’। অথবা কেন এভাবে বলা হয়-‘রফিকের মনে আজ খুশির জোয়ার’। তাহলে দেহের অন্যান্য সম্পদের মতো আত্মা/প্রাণ/মন-টাও রফিকের নয়! আমরা কি তাহলে নিজের মাঝে অচেনা একজন হয়ে চলেছি আজীবন!

সম্প্রতি দেহভান্ড নিয়ে একটি গবেষণার সংবাদ প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা। মানবশরীরের পুরোটা নাকি ‘মানবিক’ নয়-সম্প্রতি এমনই দাবি করেছেন একদল বিজ্ঞানী। তাঁরা বলছেন, মানবশরীরে সর্বসাকল্যে যত জীবকোষ আছে, তার মাত্র ৪৩ শতাংশ মানবিক, অর্থাৎ মানুষের নিজস্ব। বাকি জীবকোষগুলো ‘আণুবীক্ষণিক ‘ঔপনিবেশিক’ (মাইক্রোস্কোপিক কলোনিস্ট)।

এ বিষয়ে বিবিসি প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায় যে, এই ‘আণুবীক্ষণিক ‘ঔপনিবেশিক’ বলতে মূলত পরজীবী অণুুজীবদের বোঝানো হয়েছে। বিষয়টিকে আরো খোলাসা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, যাদের নানা ধরনের রূপান্তরের ফলে অ্যালার্জি থেকে শুরু করে মানুষের বার্ধক্যজনিত অসুখ-বিসুখ হয়, তারাই এ ‘আণুবীক্ষণিক ‘ঔপনিবেশিক’। তার মানে এই নয় যে এগুলো শরীরের জন্য খারাপ।

ম্যাক্স প্ল্যাংক ইউনিভার্সিটির ‘মাইক্রোবায়োমিন সায়েন্স’-এর অধ্যাপক রুথ লে বলেন, ‘এগুলো আপনার শরীরের জন্য অপরিহার্য। আপনার দেহ মানে কেবল আপনিই নন।’

মানুষ যত ভালো করেই হাত পরিষ্কার করুক না কেন, শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে এসব অণুুজীব শরীরে প্রবেশ করবেই। এসব অণুজীবের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, আর্কিয়া ইত্যাদি।

‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়াগো’র অধ্যাপক রোব নাইট বলেন, ‘আপনি যতটা না মানবিক, তার চেয়ে বেশি অণুজীব।’ তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গড়ে মানুষের শরীরের ৫৭ শতাংশই অণুজীবের দখলে।’ রোব নাইট জানান, ব্যক্তিভেদে এই হার এদিক-সেদিক হতে পারে, তবে পার্থক্যটা খুব বেশি নয়।

বিবিসি বাংলার উপরোক্ত প্রতিবেদন আত্মাজিজ্ঞাসায় নতুন ভাবনার খোরাক দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে দুটি ঘটনা উল্লেখ করি। আমাদের কবি যেমন লিখে গেছেন, ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’-এ দুটি ঘটনাতেই তেমন নজির পাই। যেমন পাই, নিজেকে ডিঙ্গিয়ে পরকে ধারণ করার বৈজ্ঞানিক ব্যাখারও।

প্রথম ঘটনাটি সিরিয়া কেন্দ্রিক। এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজেস নামের একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের একদল চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিত্যক্ত, আশ্রয়হীন ও এতিম শিশুদের নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটি গেল ক’বছর ধরে সিরিয়ায় মানবেতর অবস্থা কাটানো শিশুদের পাশে দাঁড়াতে চাইছিল। তবে যাদের দান আর সহায়তায় এই কাজটি তারা করতে চাইছিল তাদের মধ্যে মানবতার বোধটুকু কতটা বেঁচে আছে সেটাই আগে জানতে চাইছিল এই সংস্থাটি। আর এ লক্ষ্য নিয়েই নরওয়ের এক রাস্তায় অভিনব এক পরীক্ষা শুরু করে এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজেস নামের এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি। বছরের শুরুর দিকের প্রচন্ড ঠান্ডা আর তুষারপাতের মাঝে একটি বাসস্ট্যান্ডে তারা বসিয়ে দেন কিশোর একটি ছেলেকে। পেশায় অভিনেতা এই কিশোরের কাজ ছিল জ্যাকেটবিহীন অবস্থায় বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকা। আর দূর থেকে গোপন ক্যামেরা দিয়ে তাকে অনুসরণ করছিলেন দাতব্য সংস্থার চলচ্চিত্র নির্মাতারা। তারা দেখতে চাইছিলেন প্রচন্ড শীতে কাঁপতে থাকা কিশোরটিকে কতজন মানুষ তাদের গরম কাপড় ভাগাভাগি করে বাঁচাতে চেষ্টা করেন। না শেষতক হতাশ হননি তারা। মানুষের মাঝে পরের প্রতি মানবতারবোধ যে এখনো বেশ ভালোভাবেই বিদ্যমান তার প্রমাণ রেখেই ছেলেটির সাহায্যে এগিয়ে আসেন তার পাশ দিয়ে যাওয়া সবাই। এদের কেউ তাদের সাথে থাকা জ্যাকেট দিয়ে আবার কেউবা স্কার্ফ কিংবা গ্লাভস দিয়ে কিশোরটিকে শীতের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। আর মানুষের এই মহানুভবতার প্রমাণ পাওয়া মাত্রই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজেস এর নেপথ্য কর্মীরা। সাহায্যকারীদের তারা যুক্তি দেখান, ‘আপনি যদি বাসস্ট্যান্ডে শীতে কাঁপতে থাকা একটি শিশুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারেন তাহলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে (সিরিয়াতে) একই রকম দুরবস্থায় দিন কাটানো অন্য শিশুদের কেন সাহায্য করবেন না?’ বলা বাহুল্য, এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজেস এর এই ব্যতিক্রমী কিন্তু মোক্ষম যুক্তি উপেক্ষা করা কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি।

দ্বিতীয় ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা ‘দ্য ইগল হ্যাজ ল্যান্ডেড’ বইয়ের একটি চরিত্র। যেখানে বিরোধী শিবিরের লোকজনও একজন জার্মান অফিসারের প্রশংসা করেছিল। জার্মান অফিসার চার্চিলকে কিডন্যাপ করার জন্য ইংল্যান্ডে এসেছিল। নরফোক নামের একটি জায়গাতে। সেখানে একটি বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য সে তার পুরো গ্রুপের ছদ্মবেশ জলাঞ্জলি দিয়েছিল। এত বড় মিশনে এসে সে তার নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে পারেনি। পরকে বাঁচাতে নিজের মিশন ভেস্তে গেলে যাক।

এজন্য বলা আমরা যতটুকু নিজের ততটুকু অপরের। কোন কোন সময় দেখা যায়, আরো বেশি যেন অপরের। অণুজীবের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে আমরা নিজের চেয়েও বেশি অপরের। কিংবা অপরের দখলে থাকি। মানুষের আচরণগত বৈশষ্ট্যেই এমনই একটি চিত্র আকাঁ আছে। সেটা কি? মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের মাঝে বড় পার্থক্য হলো-অন্যান্য প্রাণী কেবল কাজ করে নিজের জন্য, আর মানুষ কাজ করে অন্যান্য প্রাণীর জন্যও। এখানেই মানুষ সেরা প্রাণী। আর দশটা প্রাণীর মতো ¯্রফে পশুই নয়!

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।