চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮

সবুজ বিলে কালো চোখ

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৮ ১৮:০০:১৬ || আপডেট: ২০১৮-০৪-০৮ ১৮:১১:৪৬

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সৈদালী গ্রামের বয়ইররা বিলে জমি কিনছে স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। একটি কম্পানির পক্ষে মিল-কলকারখানা স্থাপনের জন্য ওই জমি কেনা হচ্ছে। অথচ কৃষিজমি রক্ষার জন্য প্রানমন্ত্রী এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ জন্য একটি খসড়া আইন পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু বয়ইররা বিল নয়, এভাবে এক শ্রেণীর দালালরা উপজেলার বিভিন্ন ফসলী জমি বড় বড় কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি বয়ইররা বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিলজুড়ে সবুজ ফসলের সমারোহ। কোনো জমিতে মরিচ, টমেটো, কুমড়ার সমন্বিত চাষ। আবার কোথাও লাউ, ঢেঁড়শ ও মরিচের চাষ। কিছু জমিতে ইরি ধান চাষ করেছে কোনো কোনো কৃষক।

এ সময় সাংবাদিক পরিচয় জেনে জড়ো হন গ্রামের বেশ কজন কৃষক ও জমির মালিক। তাঁদের মধ্যে কৃষক ফজলুল হক চাষ করেন বিলের আড়াই একর জমি। তিনি বলেন, ‘এক মাস ধরে একদল লোক জমি কেনার কথা বলে হাটে-মাঠে সবখানে বিরক্ত করছে। এ বিলের জমিতে তিন মৌসুমে চাষ করে ছেলে-মেয়ে আর বউ মিলে সাতজনের সংসার চালাই। জমি হারালে না খেয়ে মরতে হবে। ’

সৈদালী গ্রামের কৃষক নূর হোসেন। বয়ইররা বিলের ১২ একর জমিতে বর্গাচাষ করে তাঁর সংসার চলে। গত মৌসুমে ধান ফলেছে। এ মৌসুমে তিনি জমিজুড়ে মরিচ, ঢেঁড়শ, টমেটো ও নানা জাতের ডালের চাষ করেছেন। আগাম বৃষ্টি কিছুটা ক্ষতির মুখোমুখি ফেললেও লোকসান গুনতে হবে না। বৃষ্টির আগেই ঘরে উঠেছে ফসলের ৭৫ শতাংশ। তবু তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। একশ্রেণির জমির দালাল বিলের জমিতে সীমানা পিলার পুঁতে চারদিক পরিমাপ করছে।

বিলে সাড়ে আট একর জমিতে বর্গাচাষ করেন কৃষক শামীম। তিনি বলেন, ‘শুনেছি জমির মালিক মিল-কারখানার জন্য জমি কিনছেন। বাপ-দাদার সময় থেকে এসব জমিতে চাষ করে সংসারের খাবার জোগাই। চাষ বন্ধ হলে ছেলেপুলে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। ’

বিলের জমির মালিক পবন জানান, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের চার লেনবিশিষ্ট সড়কটি (নির্মাণাধীন) বড়তাকিয়া থেকে সৈদালী গ্রাম হয়ে চলে গেছে। এ কারণে গ্রামের কৃষিজমির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে একশ্রেণির লোকজন। তারা সহজসরল মানুষকে ধোঁকা দিয়ে কিছু জমি কিনেও ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘আমার পৈতৃক জমি আছে এ বিলে। কৃষিজমি বাঁচাতে আমরা গ্রামবাসী একত্র হচ্ছি। বিষয়টি আমরা মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কবির আহম্মদ নিজামীকে জানিয়েছি। ’

মায়ানী ইউপি চেয়ারম্যান কবির আহম্মদ নিজামী বলেন, ‘বয়ইররা বিল তিন ফসলি কৃষিজমি। তবে আমন মৌসুমে উৎপাদন কম হয়। ’ জমি কেনাবেচা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি বয়ইররা বিলে জমি কেনাবেচার বিষয়টি পরোক্ষভাবে জেনেছি। শুনেছি দুটি কম্পানি মিল-কারখানা স্থাপনের জন্য যৌথভাবে এখানে জমি কেনা শুরু করেছে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার কম্পানি মিল-কারখানা তৈরির জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বয়ইররা বিলের জমি ক্রয় করছে। ক্ষেত্রভেদে জমির প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনছে। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কিছু জমির মালিকের ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের কেউ কেউ জমি বিক্রির জন্য নানাভাবে জোর খাটাচ্ছে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের একজন মোহাম্মদ পায়েল বলেন, ‘জমি কেনা হচ্ছে। তবে কাউকে জোর করা হচ্ছে না। ’

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত কৃষিজমির সার্বিক পরিমাণ বিভিন্ন কারণে উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পাওয়ার বর্তমান ধারা প্রতিহত করতে হবে।’ এ নীতিমালার আলোকে হাইকোর্ট ২০১৪ সালে একটি রুল জারি করেছিলেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন’ (খসড়া) তৈরি করছে সরকার। এ খসড়া আইনের ৪ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব কৃষিজমি রয়েছে, তা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করতে হবে। কোনোভাবে তার ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কায়সার খসরু বলেন, ‘আমার অবস্থান থেকে জমির শ্রেণি পরিবর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।’