চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮

ভাড়া বাড়িতে ক্যাম্পাস, বিয়ের ক্লাবে সমাবর্তন: শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৩ ২৩:১৪:৪০ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২২ ২১:৫৭:১২

মসরুর জুনাইদ 

উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে দেশ জুড়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে নানারকম তর্ক-বিতর্ক চলছে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন আছে। এই তর্ক-বিতর্ক শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। 

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মানের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি আইন থাকলেও এর প্রয়োগ সেই অর্থে নেই। আইনটি কার্যকরের চেষ্টা, উদ্যোগ বা সামর্থ্যও নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি)।

এর বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে  অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাস রয়েছে নগরীর অলিগলিতে । অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে এই আবাসিক এলাকার ভাড়া বাড়িতে। নিচে মার্কেট, ব্যাংক, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা মেডিকেল সেন্টার আর ওপরে একটি কিংবা দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস।

এদিকে, সম্প্রতি চিটাগাং ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির (সিআইইউ) প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান গত রোববার নগরের সিআরবি এলাকায় অবস্থিত হল টোয়েন্টিফোরে অনুষ্ঠিত হয়। আর এ-অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৮০ জন ডিগ্রিধারীদের হাতে ডিগ্রি তুলেদেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, যে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পরিবেশ ও নির্ধারিত শর্তপূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা সফল হতে পারেনি। যে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যারা নিজস্ব ক্যাম্পাসে এখনো যাননি, যারা একাধিক ক্যাম্পাসে পাঠদান চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে দেশের বাস্তবতা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা রেখে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও টিউশন ফিসহ সকল প্রকার ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে গবেষণা!

বাংলা ট্রিবিউনে সুমন রহমান এক প্রবন্ধে লেখেন সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে অন্তত দু’টি গবেষণার খোঁজ জেনেছি। একটির খবর ছাপা হয়েছে জনপ্রিয় একটি দৈনিক পত্রিকায় ৩০ ডিসেম্বর। সেটি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার পিএইচডি গবেষক ম্যাট হুসেইন। এটি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণা তার। গবেষণার ফল হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছে না। বহুবিধ কারণের একটা হলো, তারা ‘রিকশা-ফ্যাকাল্টি’ অর্থাৎ রিকশা-চেপে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে থাকা শিক্ষকদের মাধ্যমে ‘জম্বি’ শিক্ষার্থী তৈরি করছে। ম্যাট হুসেনের পরিভাষায়, জম্বি শিক্ষার্থী মানে সেসব শিক্ষার্থী যাদের ‘বিশ্লেষণী ক্ষমতা’ নেই এবং ‘দর্শনের বা দার্শনিকতার দৈন্য’ আছে।

অন্য গবেষণাটি করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। বাংলাদেশের শিক্ষার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এই গবেষণা। ম্যাট হোসেনের লেখা প্রবন্ধটি পড়েছি, কিন্তু মনজুর আহমেদের লেখাটি পড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু একটি অনলাইনের খবর অনুযায়ী এই প্রবন্ধ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার হাল নিয়ে। প্রবন্ধ উপস্থাপন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান (কলেজের) ডিগ্রির চেয়ে খারাপ। সেখানে ব্যয়ের কিংবা শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা নেই। হোসেন জিল্লুর পটুয়াখালীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ড. মনজুর তার প্রবন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিকে গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেছেন।

ম্যাট হুসেইনের গবেষণাটি অদ্ভূত। তিনি আসলে তার পঠিত তত্ত্বের আদলে একখানা ফিকশন রচনা করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। পদ্ধতিগত ত্রুটিও আছে প্রচুর। নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থায় যেভাবে সরকারি ভর্তুকি কমানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়, সেটাকেই তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল প্রণোদনা হিসেবে দেখছেন। ফলে নানারকমের ভুল তথ্যের সন্নিবেশ ঘটেছে লেখাটিতে। যেমন, অন্য কারও লেখার বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নাকি আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, ২০০৫ সালে বেসরকারি হয়ে গেছে! অন্যত্র লিখেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন শিক্ষক শতকরা ১০ ভাগ মাত্র! কোথায় পেলেন এই তথ্য? না, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নয়, এই তথ্য দিয়েছে শিক্ষার্থীরা; যাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তো, গেলো শতকরা দশভাগ ফুলটাইম ফ্যাকাল্টি, বাকিরা কারা? ম্যাট তাদেরই নাম দিয়েছেন ‘রিকশা ফ্যাকাল্টি’। খণ্ডকালীন, রিকশায় চেপে তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটাছুটি করেন। অল্প মজুরি আর রিকশাযোগে ব্যাপক ছোটাছুটির কারণে নাকি তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছেন না। ফলে ‘জম্বি’ শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে!

ম্যাটের গবেষণায় পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা বলছিলাম। তিনি এথনোগ্রাফি বা জাতিতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে দাবি করেছেন। এটি একটি সাংঘাতিক সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি, যেখানে গবেষকেরা তথ্য সংগ্রহের জন্য মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর মাঠপর্যায়ে পড়ে থাকেন, সেখানে ম্যাট হুসেইন সময় নিয়েছেন অত্যন্ত কম, কিন্তু ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলেছেন, তিনি ১০০ ঘণ্টা এথনোগ্রাফি করেছেন। ঘণ্টায় বললে বেশি শোনায় বটে! এরকম একটি গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা কোনও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপের প্রয়োজনটুকু বোধ করেননি। সেটা করলে হয়তো তিনি জানতে পারতেন, একদার জগন্নাথ কলেজ এখন বেসরকারি নয়, বরং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে; জানতে পারতেন ঠিক কত শতাংশ পূর্ণকালীন শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। সেগুলো জানার জন্য তিনি নির্ভর করেছেন শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারের ওপর। ফলে এমন হাস্যকর ধরনের তথ্যবিভ্রাট তিনি এড়াতে পারেননি।

‘জম্বি’ শিক্ষার্থী আর ‘রিকশা ফ্যাকাল্টি’ নামে যে দু’টি পরিভাষা ম্যাট হুসেইন উৎপাদন করেছেন, তা নিয়ে পাশ্চাত্যে সস্তা সেনসেশনালিজম তৈরি করা হয়তো সম্ভব। কিন্তু গবেষণা অন্য জিনিস। পাশ্চাত্য সিনেমার ‘জম্বি’ চরিত্রের ধারণাটি নানান ডিসিপ্লিনে ব্যবহৃত হয়েছে অতীতে: রাজনৈতিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য কিংবা সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের বিভিন্ন আলোচনায় এমনটা দেখা যায়। সেসব আলাপে ‘জম্বি’ হচ্ছে সেই দশা যা বিবেচনাহীনভাবে অন্যের রক্ত খেয়ে বাঁচে, কারণ এ ছাড়া তার বিকল্প রাস্তা নেই। যেমন ‘জম্বি পুঁজিবাদ’ বলে একটা ধারণা তৈরি করেন ক্রিস হারম্যান, যে পুঁজিবাদ সস্তাশ্রমনির্ভর, ফলত অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে কাজ করা শ্রমিকের রক্ত খেয়ে বাঁচে, এ রকম। আর ম্যাট হুসেইন তার এই গবেষণায় বিশ্লেষণী চিন্তা নেই এবং দার্শনিক দারিদ্র্য আছে, এমন শিক্ষার্থীমাত্রকেই ‘জম্বি’ আখ্যা দিয়ে ছেড়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল। তার যে মাপের গবেষণা দেখলাম, তাতে তিনি নিজে এই অভিধার বাইরে কিভাবে থেকে যাবেন, তা নিশ্চয়ই আমাদের ভেবে বের করতে হবে! কারণ ‘রিকশা ফ্যাকাল্টি’ বলে আরেকটি পরিভাষা তিনি যে প্রণয়ন করলেন, তাতেই তার প্রেজুডিস নিদারুণভাবে ধরা পড়ে। পর্যবেক্ষণে আরেকটু তীক্ষ্ণ থাকলে এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরেকটু সময় নিলে তিনি হয়তো ধরতে পারতেন, বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটাছুটি করা অধিকাংশ খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টিই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। তারা ক্ষেত্রবিশেষে রিকশা ব্যবহার করেন বটে, তবে বেশিরভাগেরই ব্যক্তিগত যন্ত্রশকট আছে। ম্যাটের ফর্মুলা অনুযায়ী, যন্ত্রশকট থাকায় তারা নিশ্চয়ই ‘রিকশা ফ্যাকাল্টি’র চেয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম! ফলে, সমস্যাটা শেষপর্যন্ত রিকশার!

মনজুর আহমেদের গবেষণাপত্রটি যেহেতু পড়া হয়নি, ফলে সেটি নিয়ে বিস্তারিত বলার অবকাশ নেই। কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সামনে আসতে পারে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নানা ধরনের অরাজকতা চলে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে এই গবেষণায়। সেসব আজকাল কারও অজানা নয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে শুরু হয়েছে দুই যুগ আগে। তবু আজও আমাদের কারও কারও এমন ধারণা আছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মাত্রই ভালো এবং মেধাবীদের জায়গা আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শহুরে উচ্চবিত্ত পরিবারের বিনোদন কেন্দ্র। ম্যাট হুসেইনও সেই কাতারের লোক। ফলে তার পুরো গবেষণায় একবারও টের পাওয়া গেল না ঢাকা শহরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শহরের বাইরে থেকে আসা কত শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে। একই ভাবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান বা গবেষণার ধরন সম্পর্কে যখন তিনি মন্তব্য করেছেন, সেগুলো নেহাত আলটপকা মন্তব্য হয়েই থেকেছে, পেছনে তথ্যের বরাত না থাকায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি-বেসরকারি ঠিকুজি করেন আমলারা, তাদের কাজের সুবিধার জন্য। এটা মূলত প্রশাসনিক ক্যাটাগরি। বুদ্ধিবৃত্তিমূলক আলোচনার ক্যাটাগরি এমন হতে পারে না। কারণ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আলাদা। সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি। প্রত্যেকের নিজ নিজ চারিত্র আছে, সম্ভাবনা আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। দু’দশটা ‘খারাপ’ প্রতিষ্ঠানের দায় যেমন সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি দু’চারটা ‘ভালো’ প্রতিষ্ঠান আছে বলে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পার পেয়ে যায় না। বেসরকারি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা হার্ভার্ড হিসেবেই চিনি, সরকারি কি বেসরকারি সে আলাপে যাই না। শিক্ষা-গবেষণায় শ্রেণিকরণ যদি করতে হয়, তবে সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং ভালো এবং খারাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকরণ করুন। গবেষণার সুযোগ থাকা বা না থাকা নিয়ে আলাপ করুন। প্রকাশনা নিয়ে আলাপ করুন। ভালো ও খারাপ একাডেমিক বিভাগের শ্রেণিকরণ করুন। নব্য উদারনীতির আগ্রাসন থেকে জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চান ভালো কথা, কিন্তু তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এইসব সরকারি-বেসরকারি তথা আমলাতান্ত্রিক বিভাজনের হেজিমনি থেকে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে রক্ষা করুন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং নিয়ে প্রশ্ন

দৈনিক যুগান্তরে ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু এক প্রবন্ধে লেখেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে গত বছরের ১০ নভেম্বর বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাঙ্কিং নির্ণয়বিষয়ক এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। বস্তুগত ও ধারণাগত তথ্য থেকে প্রাপ্ত স্কোরের সমন্বয়ে এই র‌্যাঙ্কিং করা হয়, যার মধ্যে বস্তুগত তথ্য থেকে ৪০ শতাংশ এবং ধারণাগত তথ্য থেকে ৬০ শতাংশ স্কোর নিয়ে মোট ১০০ স্কোরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণ করা হয়েছে। বস্তুগত তথ্যের ক্ষেত্রে ইউজিসি থেকে প্রাপ্ত ২০১৪ সালের তথ্য নেয়া হয়েছে। অপরদিকে ধারণাগত তথ্যের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদ (ডিন, বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক, রেজিস্ট্রার) এবং চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর জরিপ পরিচালিত হয়। ধারণাগত জরিপটি মোট ৩০০ জনের ওপর পরিচালনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫০ জন শিক্ষাবিদ এবং ১৫০ জন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। বাংলাদেশের ৮৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ৩২টি বাছাই করে নেয়া হয়। তার মধ্যে থেকেই গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে সেরা ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এতে প্রথম হয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে অবস্থান করছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আর দশম স্থানে রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সংখ্যা, গবেষণা, ক্যাম্পাস, শিক্ষা কার্যক্রম, লাইব্রেরির অবস্থা, পাস করা শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে শিক্ষক ও চাকরিদাতাদের ভাবনার ভিত্তিতে এই র‌্যাঙ্কিং হয়েছে।

গত ১১ নভেম্বর গবেষণাপত্র প্রকাশের পর থেকেই এ গবেষণা নিয়ে অনেকের মাঝেই (বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক) নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং প্রশংসনীয় এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান বুঝে র‌্যাঙ্কিং-এ ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করতে পারে। এ ধরনের গবেষণা বা র‌্যাঙ্কিংয়ের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়, যা উচ্চশিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সর্বোপরি, এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ভালো করার চাপ থাকবে। মূলত এভাবেই সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং শুরু হয়েছে এবং তা মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছেছে। সুতরাং বাংলাদেশে গুণগত ও মানসম্মত আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের গবেষণার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে তা অবশ্যই হতে হবে সমসাময়িক, বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ তথা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড এবং বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাঙ্কিং নির্ণয়বিষয়ক গবেষণাপত্রে এগুলোর অনেক কিছুই আসেনি। যেমন : এখানে র‌্যাঙ্কিংয়ের জন্য যে সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে তার অনেকটাই অসম্পূর্ণ; র‌্যাঙ্কিং পদ্ধতির বিবেচ্য অনেক বিষয়, নানা গাণিতিক ফলাফলসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত অস্পষ্ট। প্রশ্ন থেকে যায়, এই র‌্যাঙ্কিংয়ে ধারণাগত ডাটাগুলো ভালো হলেও একাডেমিক তথ্য যারা দিয়েছেন, তারা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য কি দিতে পারবেন? পাশাপাশি এই র‌্যাঙ্কিং করার ক্ষেত্রে এতে কতটুকু সমসাময়িক ও নিরপেক্ষ ডাটা বা তথ্য ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে এটিও একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশের এত বিশাল উচ্চশিক্ষার পরিমণ্ডলের মধ্যে মাত্র ১৫০ জন শিক্ষাবিদ এবং ১৫০ জন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের মতামত কি এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হতে পারে? সর্বোপরি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসি ছাড়া এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং করার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কিনা তাও প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। বলা বাহুল্য, এ সব র‌্যাঙ্কিং তখনই সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে যখন এতে বাস্তব অবস্থা এবং সমসাময়িক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার করা হবে।

গবেষণায় ধারণাগত স্কোরের ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকদের মান, চাকরি ক্ষেত্রে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ইত্যাদি দেখানো হয়েছে। কিন্তু কাদের কাছ থেকে এবং কিসের ভিত্তিতে এসব জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই এই গবেষণাপত্রে। উন্নত বিশ্বে র‌্যাঙ্কিংয়ে যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়, তার অনেক কিছুই এ গবেষণায় আসেনি। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, এই গবেষণায় প্রকৃত তথ্যের প্রতিফলন ঘটেনি এবং এই র‌্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে এক অর্থে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষা খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর ফলে সত্যিকার অর্থে গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবমূল্যায়িত হয়েছে।

বর্তমান যুগ চরম এক গতিশীল একটি যুগ। প্রতিনিয়তই এখানে তথ্য-উপাত্তের পরিবর্তনসহ নানা কিছুরই পরিবর্তন ঘটছে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। যেমন : বর্তমান সময়ে সকালে কেনা একটি মোবাইল ফোন ওইদিন বিকালেই পুরনো হয়ে যাচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে ওই মোবাইল ফোনের আপডেটেড সংস্করণ বের হয়ে গেছে। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ের বাস্তব অবস্থা এবং তা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। এই সময়ে চার বছর আগের তথ্য দিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশপূর্বক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে র‌্যাঙ্কিং করা কতটুকু যৌক্তিক এবং তা সবার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে বা হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর এ ধরনের গবেষণা বা র‌্যাঙ্কিং কি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বর্তমান প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবে না? যদি বিভ্রান্ত করেই থাকে, তাহলে এর জন্য দায়ী কে এবং এই দায় কে বহন করবে?

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন হচ্ছে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পৃথকভাবে নিয়ে ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ও সমসাময়িক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষভাবে এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে তা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন তথা উন্নয়ন ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৮ জুন অনুষ্ঠিত ইউজিসির এক সভায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং (অবস্থান নির্ধারণ) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন জনগণের চোখে পড়েনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং বিষয়ক ওই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে ইউজিসির দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন।