চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮

খাতুনগঞ্জে ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে তিন ব্যবসায়ী আত্মগোপনে

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২৪ ১৮:৪১:২৮ || আপডেট: ২০১৮-০৩-২৫ ১০:০৯:৪৭

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে আত্মগোপনে গেছেন তিন মসলা ব্যবসায়ী। মাত্র তিনদিনে তিন ব্যবসায়ীর আত্মগোপনের ঘটনায় লেনদেন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বাজারের অন্য ব্যবসায়ীরা। খবর বণিক বার্তা

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বুধবার একদিনেই দুই মসলা ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে গেছেন। এদের একজন মেসার্স গ্লোবাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হান। অন্যজন মেসার্স নিউ বার আউলিয়া স্টোরের মোহাম্মদ জামাল। এ দুজনের কাছে খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর পাওনা প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এর আগে গত সোমবার ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫ কোটি টাকা বকেয়া রেখে আত্মগোপনে যান আরেক মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স অর্জুন স্টোরের স্বত্বাধিকারী অর্জুন চন্দ্র বণিক। এত কম সময়ে তিন ব্যবসায়ীর আত্মগোপনে আতঙ্ক বিরাজ করছে অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল হোসেন বলেন, পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ না করে তিনজন ব্যবসায়ীর উধাও হওয়ার ঘটনা শুনেছি। খাতুনগঞ্জের কয়েকটি ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বিষয়টি মিটমাটের চেষ্টা করছেন। তবে এ রকম ঘটনার সুরাহা হওয়ার রেকর্ড খুবই কম। এভাবে বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের টাকা নিয়ে আত্মগোপনের ঘটনা খাতুনগঞ্জের লেনদেনে সংকট তৈরি করেছে।

খাতুনগঞ্জের নবী মার্কেট এলাকায় ব্যবসা করতেন মো. রায়হান। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। বুধবার থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন তিনি। এ মসলা ব্যবসায়ীর কাছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর প্রায় ১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে। পাওনাদারদের মধ্যে বাজারের সালমা গ্রুপের পাওনার পরিমাণ ৬২ লাখ, অর্জুন স্টোরের প্রায় আড়াই কোটি, নবী মার্কেটের মেসার্স জাহেদ ব্রাদার্সের ৩৩ লাখ ও একই মার্কেটের মেসার্স অরবিট ট্রেডার্সের ২০ লাখ টাকা।

একই দিনে পালিয়ে যাওয়া মোহাম্মদ জামালের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিউ বার আউলিয়া স্টোরটি খাতুনগঞ্জের ঘোষ মার্কেটে। আত্মগোপনে যাওয়া এ ব্যবসায়ীর কাছে বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীর পাওনা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইলিয়াছ মার্কেটের মসলা ব্যবসায়ী মৌলানা ফরিদের ৩৬ লাখ, এজাজ মার্কেটের শ্রীপতি মজুমদারের ১৩ লাখ ও তার ভগ্নিপতির ১৪ লাখ টাকা পাওনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পাওনাদার ব্যবসায়ীদের দেয়া চেক পাস না হলে বুধবার এ দুই ব্যবসায়ীর আত্মগোপনে যাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি কয়েকজন পাওনাদার তালা ভেঙে মো. রায়হানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নিয়ে যান।

এর আগে গত সোমবার ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ না করে আত্মগোপনে যান খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী অর্জুন চন্দ্র বণিক। জানা গেছে, খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেটের সামনে মসলার ব্যবসা করতেন অর্জুন চন্দ্র বণিক। এক-দেড় বছর ধরে চান্দমিয়া গলিতে একই নামে আরো একটি দোকান গড়ে তোলেন তিনি। দুই প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করতে গিয়ে বাজারের অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে মসলা পণ্যের কেনা-বেচা হয়। খাতুনগঞ্জের রীতি অনুযায়ী এসব বেচাকেনার সিংহভাগই হয়েছে আস্থার ভিত্তিতে। অনেক লেনদেনে চেক বা ডকুমেন্ট নেই।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনে যাওয়া এ মসলা ব্যবসায়ীর কাছে সালমা গ্রুপের পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া এজাজ মার্কেটের টিকে ট্রেডার্সের পাওনার পরিমাণ ১ কোটি ৪১ লাখ, মেসার্স নুর করপোরেশনের ৮০ লাখ, মেসার্স মিলন ব্রাদার্সের ৮০ লাখ, মেসার্স এনআর ট্রেডিংয়ের ৩৫ লাখ, এম শাহজাহান ট্রেডার্সের ২৭ লাখ, ইলিয়াছ মার্কেটের ফারুক কোম্পানির (মেসার্স ফারুক ট্রেডার্স) ২৫ লাখ, মীর গ্রুপের ১৬ লাখ, মাসুদ ব্রাদার্সের ১০ লাখ, আল আমারাতের ১০ লাখ, এফএম ট্রেডার্সের ৭ লাখ ও দয়াময় হোটেলের সাড়ে ১১ লাখ টাকা। এর বাইরেও ব্যবসায়ীদের অনেকের টাকা পাওনা রয়েছে অর্জুন চন্দ্র বণিকের কাছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাত-আট বছর আগে (২০১০-১১ সাল) খাতুনগঞ্জে মসলার ব্যবসায় আসেন অর্জুন চন্দ্র বণিক। প্রথমদিকে খুচরা পর্যায়ে পণ্য বেচাকেনা করতেন। গত বছর থেকে পাইকারি পর্যায়ে পণ্য বেচাকেনায় আসেন। মসলা ব্যবসা শুরুর আগে খাতুনগঞ্জের এজাজ মার্কেট এলাকায় ফেরি করে চা বিক্রি করতেন তিনি। অর্জুন চন্দ্র বণিকের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার হেসাখাল গ্রামে। বাবার নাম যুগল চন্দ্র বণিক।

পাওনাদার প্রতিষ্ঠান টিকে ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী পুলক দাশ বলেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে বাকিতে জিরা ও এলাচ কেনেন অর্জুন স্টোরের অর্জুন চন্দ্র বণিক। দুই সপ্তাহের বাকিতে বিক্রি করা এসব পণ্যের বিপরীতে দেয়া চেক গত মঙ্গলবার ইউনিয়ন ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় নগদায়ন করতে যাই। কিন্তু অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ব্যাংকে দেয়া চেকগুলো ডিজঅনার হয়। এরপর অর্জুন স্টোরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে অর্জুন স্টোরের কাছে আমার প্রায় দেড় কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

আরেক পাওনাদার মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বলেন, অর্জুন স্টোরের মালিক বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে কয়েক কোটি টাকার পণ্য কিনেছেন। সে পণ্য কম দামে নগদে বিক্রি করেছেন। এরপর সেই টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন।

সম্প্রতি ইলিয়াছ মার্কেটের ফারুক কোম্পানি থেকে ৩৩৫ টাকা দরে সাড়ে সাত হাজার কেজি (৩০০ বস্তা) জিরা কেনেন অর্জুন চন্দ্র। কিন্তু নগদে সেই জিরা বিক্রি করেন ৩০০-৩১৫ টাকার মধ্যে। জিরা বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিয়ে অর্জুন চন্দ্র আত্মগোপনে চলে গেলেও পণ্য বিক্রির প্রায় ২৫ লাখ টাকা ফেরত পাননি ফারুক কোম্পানি।

এদিকে বাজার থেকে অর্জুন চন্দ্র বণিকের পালিয়ে যাওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর কয়েক দিন ধরে পাওনাদার ব্যবসায়ীরা তার দোকানের সামনে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। এমনকি গত সোমবার অর্জুন স্টোরের দুই দোকানের ম্যানেজারকে (লিটন ও মিঠু) অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। দুই ম্যানেজারসহ অর্জুনের স্ত্রী ও শ্বশুরকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যান পাওনাদাররা। বিষয়টি নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগও করেন তারা। অর্জুনের স্ত্রী টাকা ফেরতে তিন মাসের সময় চাইলে থানা পুলিশ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় তিনদিনের সময় দেয়া হয়।