চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮

অবৈধ রাষ্ট্রপতিরা পেনশন পাওয়ার অযোগ্য

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২১ ১৯:৫৬:৪২ || আপডেট: ২০১৮-০৩-২১ ১৯:৫৬:৪২

অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাদখলকারীদের অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ করার বিধান রেখে নতুন আইনের খসড়া সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সোমবার ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা বিল-২০১৫’ সংসদে উত্থাপন করেন।বিলটি পরে সাত কার্যদিবসের মধ্যে পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

গত অাগস্ট মাসে বিলটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়।১৯৭৯ সালের ‘প্রেসিডেন্টস পেনশন অর্ডিনেন্স’ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের জন্য বিলটি সংসদে তোলা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, অসাংবিধানিক পন্থায় বা অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বা হয়েছিলেন বলে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ঘোষিত হলে তিনি আর অবসর ভাতা পাবেন না।

২০১০ সালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে হাই কোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ‘খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম এবং জিয়াউর রহমানের মতো এইচএম এরশাদও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী।’

পরের বছর আপিল বিভাগেও ওই রায় বহাল থাকে; আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনও করা হয়।

সামরিক শাসনামলের জারি করা প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন’ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। ১৫ অগাস্ট থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মোশতাক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করে যান। ৭ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তখন বিচারপতি সায়েমকে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সায়েম ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর জিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন; জিয়া হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৭৭ এর ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়া ওই দায়িত্বও নেন।

তার আগে ৩০ মে জিয়ার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায় একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়, যাতে ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে।

পরে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন।

জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল এইচ এম এরশাদ। তিনি নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে রাষ্ট্রপতির আসনে বসান বিচারপতি এ এফ এম আহসানুদ্দিন চৌধুরীকে।

১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি আহসানুদ্দিনকে সরিয়ে এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। জিয়ার মতোই গণভোটের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্বকে বৈধ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ ওই গণভোটে তিনি পান ৯৪.৫ শতাংশ ভোট।

পরে ১৯৮৬ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেন এবং নির্বাচিত হন। ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

মন্ত্রিসভায় বিলটি ওঠার দিন তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, এরশাদ ও জিয়ার পরিবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে অবসর ভাতা নেন না।

মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতা পাবেন বলে বিলে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, যদি কোনো রাষ্ট্রপতি নৈতিক স্খলন বা অন্য কোনো অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হন তাহলে অবসর ভাতা পাবেন না। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেসে তিনি যদি এমন কোন দপ্তর, আসনে বা মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন যার জন্য তিনি সংযুক্ত তহবিল ৯হতে বেতন বা অন্য কোন সুবিধা পাচ্ছেন তবে তিনি অবসর ভাতা পাবেন না।

অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিরা একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও একজন অ্যাটেডেন্ট এবং দাপ্তরিক ব্যয় পরিচালনার খরচ পাবেন। এছাড়া তিনি একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসা সুবিধা, সরকারি অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বিনামূল্যে যানবাহন ব্যবহার, বাড়িতে টেলিফোন, কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং দেশের ভেতরে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্ট হাউজে বিনা ভাড়ায় থাকতে পারবেন।

বিলে বলা হয়েছে, কোনো রাষ্ট্রপতি তার জীবদ্দশায় নিজে অথবা মারা গেলে তার মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার উত্তরাধিকারীরা এর আগে আনুতোষিক না নিলে তারা নিতে পারবে।

মন্ত্রিসভায় বিলটি ওঠার দিন মন্ত্রি পরিষদ সচিব এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার কখনও পেনশন নেয়নি, কারণ ওই আইনটিই হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। তবে নতুন আইন পাস হলে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারীরা তা পাবেন।”

কোনো ব্যক্তি অন্যূন ছয় মাস রাষ্ট্রপতির পদে থাকলে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পদে না থাকলে তিনি আমৃত্যু অবসর ভাতা পাবেন বলে সংশোধিত আইনে প্রস্তাব করা হয়েছে।