চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বানের স্রোতের মত আসছে ইয়াবা

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৫ ১২:৫৪:৫৩ || আপডেট: ২০১৮-০৩-০৫ ১৭:৫২:৪৯

নিষিদ্ধ মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স : বিজিবি

শহীদুল ইসলাম বাবর

পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি কোষ্ট গার্ড়সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সকল চেষ্টা প্রচেষ্টা উপেক্ষা করে উলকা বেগে ছুটে চলছে মরণ নেশা ইয়াবার ট্যাবলেটের বিস্তার। দিন দিন আবিস্কার হচ্ছে ইয়াবা পাচারের নতুন নতুন কৌশল। ইয়াবা পাচারকারীদের কৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইয়াবা পাচারে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। পাচারকারীরা নিত্য নতুন কৌশলে ইয়াবা পাচার করলেও শুধু মাত্র ১০ দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করেছে প্রায় ১৯ লক্ষাধিক পিচ ইয়াবা।

যার আনুমানিক মূল্য ৫৮ কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার ৮শ টাকা। উদ্ধারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছেন। সীমান্তে চলছে দুই দেশের (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) সীমান্ত রক্ষি বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা। দুই দেশেই নিয়েছে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। এহেন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ইয়াবার বিস্তার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রশাসন ও সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার সকালে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের খুরের মুখ বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন শশ্বানঘাট এলাকা থেকে ১১ লাখ ২০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৩৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। এ ঘটনায় কেহ আটক না হলেও ৩জন ইয়াবা পাচারকারী পালিয়ে যায় বলে জানান বিজিবির অধিনায়ক আরিফুল ইসলাম আরিফ। একই দিন সেন্টমার্টিন দ্বীপ এলাকা থেকে কোষ্ট গার্ড় পরিত্যাক্ত অবস্থায় করে ৩ লাখ ২০ হাজার পিচ ইয়াবা। ২৪ ফেব্রুয়ারী শনিবার বিশেষ কৌশলে ইয়াবা পাচারের সময় নারীসহ দুই কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে মেট্রো মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন জেসমিন আক্তার ও মোহাম্মদ ইসমাইল। তাঁদের কাছ থেকে ৮ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়। ঐ দুপুরে নগরীর কোতোয়ালী থানা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেসমিন ও ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের পেটে বিশেষ কায়দায় রাখা ৮ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়। গ্রেফতার হওয়া দুজন হলেন সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর ঢেমশা গ্রামের নুরুল আলমের স্ত্রী জেসমিন আক্তার (২৬) এবং আব্দুল মাবুদের ছেলে মোহাম্মাদ ইসমাঈল (৩৩)। একই দিন পটিয়ার শিকলবাহা ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশ কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামমুখী একটি পিকআপে (চট্টমেট্রো-ন-১১-৬১৪৯) তল্লাশি চালিয়ে ৫০ হাজার ইয়াবা জব্দ করেছে। এ সময় গাড়িচালক মো. ইউছুপ ও সহকারী মো. আলমগীর ও মো. রবিউল আওয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের তিনজনের বাড়ি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায়। ২৭ ফেব্রুয়ারী সাতকানিয়ায় দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের সাতকানিয়া অংশে পৃথক অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে ৫১ হাজার পিচ ইয়াবা। এসময় গ্রেপ্তার হয় তিন ব্যাক্তি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো ফেনী সদর উপজেলার বাতানিয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়াড়ের বাসিন্দা মৃত নুর মিয়ার পুত্র মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন (৪২),কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের হিজলিয়া এলাকার মৃত সামশুল আলমের পুত্র মোহাম্মদ মফিজ মিয়া (৪৫)। ও কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার মোকরা গ্রামের নাদু মিয়ার পুত্র রবিউল আলম প্রকাশ হাসান (৩৮)। এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছে হাইওয়ে পুলিশ। দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমান বলেন, ইয়াবা পাচারকারীরা দিন দিন নতুন নতুন কৌশলে ইয়াবার পাচার করে আসছে। গাড়ির জ্বালানির বক্সের অংশ বাড়িয়ে সেখানে করে ইয়াবার পাচার করা হচ্ছে। এটি সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

একই দিন রামুর হিমছড়ি থেকে দু’হাজার ইয়াবাসহ হামিদুল হক (২৫) নামে এক টমটমচালককে আটক করে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। ঐ বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মেরিনড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি আমতলী ব্রীজ এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আটক টমটম চালক কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর উত্তর পাড়ার নূরুল কবিরের পুত্র। এসময় ইয়াবা পাচারের ব্যবহৃত টমটমটিও জব্দ করা হয়েছে।

এর পরের দিন টেকনাফ উপজেলায় সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের অদূরে গভীর সাগরে অভিযান চালিয়ে তিন লাখ পিস ইয়াবাসহ মিয়ানমারের ৬ রাখাইনকে আটক করে কোস্টগার্ড সদস্যরা। এ সময় তিনটি লম্বা কিরিচসহ তাদের ব্যবহৃত একটি ট্রলার জব্দ করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারী দুপুরে ছেঁড়া দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে সাগর থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কর্মকর্তা লে. কমান্ডার ফয়জুল ইসলাম মন্ডল জানান, দুপুরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসা একটি ট্রলার সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি অবস্থান করছে এমন সংবাদে কোস্টগার্ডের একটি দল দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব সাগরে  মিয়ানমার থেকে আসা একটি ফিশিং ট্রলারটিকে সংকেত দিয়ে তল্লাশী চালানো হয়। এ সময় ট্রলারটিতে তল্লাশি চালিয়ে ৩ লাখ পিস ইয়াবা এবং তিনটি লম্বা কিরিচ, তীর উদ্ধার করা হয় এবং মিয়ানমারের ছয় নাগরিককে আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত ইয়াবার দাম প্রায় ১৫ কোটি টাকা বলে জানান তিনি। ১ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়া থেকে প্রাইভেট কারে লুকিয়ে ৩ হাজার ৩৩৬ পিস ইয়াবা পাচারের সময় জব্দ করেছে র্যাব-৭। এ সময় ভবতোষ বসাক (৩৩) ও মৃদুল দে’কে (২৮) গ্রেফতার করা হয়।পটিয়া থানাধীন জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের মনসা বাদামতল সুগন্ধা পার্ক নামক কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পুরাতন কালুরঘাট-কক্সবাজার সড়কের ওপর থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ অভিযান চালানো হয়।

১ মার্চ গাড়ির বডিতে লুকিয়ে অভিনব কৌশলে পাচারকালে ১ কোটি ৩৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মুল্যের ৪৬ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এঘটনায় মাইক্রো বাস চালককে আটক এবং নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মাইক্রো বাস জব্দ করা হয়। আটক মাইক্রো বাস চালক উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং মোঃ মকবুল হোসেনের পুত্র মোঃ রমজান আলী (২০)। টেকনাফ-২ বিজিবির পরিচালক অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল এসএম আরিফুল ইসলাম জানান ‘১ মার্চ সকাল হতে ২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ হোয়াইক্যং বিওপির হাবিলদার মোঃ মোক্তার হোসেনের নেতৃত্বে একটি টহল দল হোয়াইক্যং চেকপোষ্টে যানবাহন তল্লাশীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। সকাল ১০টায় টেকনাফ হতে কক্সবাজারগামী একটি মাইক্রোবাস (চট্ট মেট্রো-ছ-১১-১৫৩৯) হোয়াইক্যং চেকপোষ্টে পৌঁছলে কর্তব্যরত টহল দল সিগন্যাল দিয়ে থামায়। অতঃপর মাইক্রোবাসের চালককে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় টহল দল উক্ত মাইক্রো বাসে ব্যাপকভাবে তল্লাশী কার্যক্রম পরিচালনা করে। তল্লাশীকালীন টহল দল উক্ত মাইক্রোবাসের জানালার নীচের বডিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্লাষ্টিকের পাত দেখতে পেয়ে স্ক্রূ ডাইভার দ্বারা খুললে এর ভেতর সাদা পলিথিন দ্বারা মোড়ানো একটি প্যাকেট দেখতে পায়। প্রাপ্ত প্যাকেটটি খুলে গণনা করে ১ কোটি ৩৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মুল্যের ৪৬ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ২ ফেব্রুয়ারী ও ৩ ফেব্রুয়ারী পৃথক অভিযানে চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ অভিযানে ৩৪ হাজার পিস্ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে । এসময় পাচারকালে জড়িত ৬জনকে আটক ও তাদের ব্যবহৃত দুইটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। ৩ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টারদিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং হাইওয়ে পুলিশের আইসি নির্মল চাকমা ইয়াবার চালান পাচারের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি নাম্বারবিহীন ছারপোকা গাড়িকে থামিয়ে তল্লাশী চালিয়ে অভিনব কায়দায় লুকানো ২হাজার পিস ইয়াবা বড়িসহ মোচনী নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের সি-ব্লকের মৃত মোহাম্মদ হোছনের পুত্র আমির হোছন (১৯) কে আটক করে এবং নাম্বারবিহীন গাড়িটি জব্দ করে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়েরের পর জব্দকৃত ইয়াবা ও গাড়িসহ ধৃত আসামীকে টেকনাফ মডেল থানায় সোর্পদ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবার বিষয়ে জিরো টলারেন্সে থাকার কথা জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের অধিনায়ক কর্নেল গাজী আহসানুজ্জামান। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, খাওয়ার প্রবণতা রোধ করা না গেলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার অনুপ্রবেশও বন্ধ করা যাবে না। সীমান্তে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন কর্নেল আহসানুজ্জামান। তিনি বলেন, আমাদের একটা বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) থেকে আরেকটির দূরত্ব কমপক্ষে পাঁচ কিলোমিটার। কিছু আছে ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। হেঁটে যেতে ৪-৫ দিন সময় লাগে। আমরা লাখ লাখ পিস ইয়াবা ধরেছি। চেষ্টা আছে। তবে ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের একটা বিষয় আছে। যে জিনিসটার ডিমান্ড আছে, সেটা নিয়ে আপনি যতকিছুই করেন না কেন, সাপ্লাই হবেই। আমরা কীভাবে চাহিদাটাকে থামাব? আমাদের যদি ইয়াবা খাওয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে ইয়াবা তো আসতেই থাকবে যোগ করেন তিনি।