চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮

‘নিঃশ্বাসের দূরত্বে যখন খুনি’

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৪ ০৯:৩২:২৭ || আপডেট: ২০১৮-০৩-০৪ ১৫:৩৮:৩৭

‘চাপাতি ছুরি নিয়ে খুনিরা স্যারের নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে চলে এসেছে এবং খানিকক্ষণ ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে! সারাক্ষণ জীবনের হুমকিতে থাকা জাফর স্যারের এত কাছে যখন খুনিরা অবস্থান নিতে পেরেছে তখন নিশ্চিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকারের সকল বাহিনী এবং স্যারের ছাত্ররা তার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। এই জাতিটাই জাতির সম্পদ রক্ষায় ব্যর্থতা দেখিয়ে ধর্মান্ধদের বাম্পার ফলনে খুব কার্যকর।’

এভাবেই ফেসবুকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের এক কলকাতা প্রবাসী ভক্ত সঞ্জয় মল্লিক।

তার ফেসবুক স্ট্যাটাসের ছবিতে দেখা যায়, হামলাকারী যুবক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের একেবারে নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে অবস্থান করছে। এতো আইন শৃঙ্খলাবাহিনী থাকার পরও কীভাবে এই যুবক মঞ্চে উঠল তা সঞ্জয় মল্লিক নামের এই ভক্তের প্রশ্ন।

তিনি মনে করেন,‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকারের সকল বাহিনী এবং স্যারের ছাত্ররা তার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছুরিকাহত বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) হাসপাতালে থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় আনা হয়েছে।

শনিবার শনিবার বিকেল ৫টা ৩৫মিনিটে সিলেটের বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ এলাকায় শিক্ষক জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। মুক্তমঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে তার মাথায় আঘাত করেন সেই যুবক।

আহত ড. জাফর ইকবাল শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. দেবপদ রায়।

তিনি বলেন, ‘আমি ওটি’র ভিতরে ছিলাম। স্টিল নাও হি ইজ আন্ডার এনেস্থেশিয়া। ৬-৭ জন প্রফেসর সেখানে উপস্থিত আছেন। তারা অপারেশন করছেন। ওনার কন্ডিশন খারাপ না, শঙ্কামুক্ত।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের একটি উৎসব ছিল। সেই উৎসবে অংশ নিয়ে অন্যদের সঙ্গে মুক্তমঞ্চে বসে ছিলেন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। বিকেল ৫টা ৩৫মিনিটের এক যুবক হঠাৎ পেছন থেকে তার মাথায় ছুরিকাঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পুলিশের একই মাইক্রোবাসে করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এদিকে, হামলাকারী ওই যুবককে আটক করে গণপিটুনি দিয়েছেন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। ওই যুবককে এখন আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ভবনে রাখা হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না বহিরাগত সে সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি।

অন্যদিকে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলাকারীকে এই হামলার পরপরই আটক করা হয়।

শনিবার বিকালে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে এই হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই তরুণকে বেদম পেটানোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-২ এ আটকে রাখা হয়েছে। তবে, হামলাকারী ওই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাকি বহিরাগত তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তাকে বর্তমানে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় গতকাল শুক্রবার ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলছিল। গতকাল বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে এর উদ্বোধন করেছিলেন ড. জাফর ইকবাল। শনিবার বিকালে এর সমাপনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চ এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক মো. রাশেদ তালুকদার জানিয়েছেন, মুক্তমঞ্চ এলাকায় পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ড. জাফর ইকবলের মাথায় আঘাত করা হয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীকে আটক করা হয়েছে।

ড. জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত সহকারী জয়নাল আবেদীন জানান, স্যারকে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। এ মুহূর্তে তিনি সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক জানান, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিউরোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার রাশেদুন্নবীর অধীনে চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার আবদুল ওহাব জানিয়েছেন, ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়। হামলাকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আটক করে।

জালালাবাদ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, একজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তার নাম পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আমরা তার পূর্ণ পরিচয় জানতে চেষ্টা করছি।

কী কারণে ওই তরুণ জাফর ইকবালের উপর হামলা করেছেন, সে বিষয়ে কিছু তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন জাফর ইকবাল। র্যাগিংয়ের দায়ে পাঁচ ছাত্রের শাস্তি দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, এদের শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে, তাদের পুলিশে দেওয়া উচিৎ।

আবার এর পেছনে জঙ্গিদের হাত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ রয়েছে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর। জাফর ইকবাল বরাবরই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ।