চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, গহীণ চরে শিল্পের ছোঁয়া এবছরই হচ্ছে দৃশ্যমান

প্রকাশ: ২০১৮-০২-০৫ ১১:৪৫:০২ || আপডেট: ২০১৮-০২-০৫ ২১:০৮:০২

এম মাঈন উদ্দিন
ইছাখালী থেকে ফিরে..

মিরসরাইয়ের বিশাল চরজুড়ে এখন বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। এরই মধ্যে এখানে ৮৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। সেখান প্রায় দুই হাজার একর জমিতে এ বিনিয়োগ করতে চায় পিএইচপি, কেএসআরএম, বিএসআরএম, বসুন্ধরা, ঝেজিয়াং, কুনমিংসহ বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ। আশির দশকে ফেনী নদীতে বাঁধ দেওয়ার পরই জেগে ওঠে বিশাল এ চর। দেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বড়তাকিয়া বাজার থেকে আবু তোরাব সড়ক ধরে ১০ কিলোমিটার ভেতরে যেতেই দেখা মেলে সবুজে ঘেরা মাঠের পর মাঠ, আর বালুচর। জোয়ারের পানিতে ডোবে আর ভাটার সময় জেগে ওঠে। আকাশ ঢাকা এ চর প্রায় মানবশূন্য। গরু আর মহিষের চারণভূমি। গহীন এচরে হচ্ছে দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত আধুনিক শিল্পশহর। যা চলতি বছরের মধ্যে হবে দৃশমান।

এক বছরের ব্যবধানে অবশেষে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বেপজা ইকোনমিক জোন। গত ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস্ সামিট-১৮ অনুষ্ঠানে ১১৫০ একরের এই প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাস্তবায়নাধীন এই ইকোনমিক জোনটি। এই জোনে প্লট পেতে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে। তবে তৈরি পোশাকের চেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভারী শিল্পকেই বিনিয়োগে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে বেপজা সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইকোনমিক জোন হচ্ছে মিরসরাই ইকোনমিক জোন। এর মধ্যে ২৫টি আলাদা জোন হবে। ৩০ হাজার একর জমির উপর এই ইকোনমিক জোন স্থাপন হচ্ছে। বেজা চরের জমির মধ্যে ১৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক তৈরি করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মিরসরাই ইজেড পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হচ্ছে। চার লেনের এ সড়কের নামকরণ করা হয়েছে শেখ হাসিনা সরণি। এবছরের মধ্যে সেটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ সড়ক যেটা কক্সবাজার পর্যন্ত যাচ্ছে, সেটি এই জোনের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। সমুদ্রের জোয়ারের পানি থেকে এ শিল্পশহর রক্ষার জন্য ১২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে জোন ঘেঁষে যে সমুদ্র উপকূল আছে সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, নেভি ও চায়না হারবারকে দিয়ে সাড়ে ১৮ কিলোমিটারের আরেকটি মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হচ্ছে। চায়না হারবার কোম্পানি এরই মধ্যে ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করেছে। এ বাঁধ তৈরিতে ব্যবস্থাপনার কাজ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেখানে এ সমস্ত অবকাঠামোগত সুবিধা ছাড়াও অভ্যন্তরীণ যেসব সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে সেগুলো ফোর লেন হবে। মিরসরাইয়ে জমি উন্নয়নের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে গ্যাস সরবরাহের জন্য ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপলাইন বসাচ্ছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। মিরসরাইয়ে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড বা আরপিসিএল। একই সংস্থা ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের আরও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র করার জন্য বেজার কাছে ৫০ একর জমি চেয়ে গত ১১ ডিসেম্বর চিঠি পাঠিয়েছে। কারখানায় পানি সরবরাহের জন্য মিরসরাইয়ে দুই একরের জলাধার তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে (আইডব্লিউএম) নিয়োগ করার প্রক্রিয়া চলছে। যেটি হলে কলকারখানায় পানি নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ফেনী নদীর দুটি শাখা নদী থেকে পাঁচটি সরোবর তৈরি করা হবে। যা প্রতিটি ১০০ থেকে ১২৬ একরের হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিকটবর্তী এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে প্রকল্পের অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া সরকারি উদ্যোগে রাস্তা, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিতের সুযোগ থাকা এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই সমুদ্র তীরবর্তী আলাদা সমুদ্রবন্দর সুবিধা থাকার কারণেও এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। মিরসরাই ইজেড এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করছে বেজা। এ ভবন তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে নির্মাণ শ্রমিকদের। ইজেডের একটি অংশে টানা হয়েছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পিজিসিবি ২৩০ কেভি গ্রিড স্টেশন স্থাপন করবে। মিরসরাইয়ে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই শিল্পশহরের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, প্রথম পর্যায়ে বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৫৫০ একর জমির চার দিকে মাটির সড়ক তৈরি করা হয়েছে। প্রথম প্রকল্প উন্নয়নের জন্য পাওয়ারপ্যাক, গ্যাসমিন ও ইস্টওয়েস্টকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ অংশের ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এক হাজার ৩০০ একর জমি উন্নয়নের কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক আহসান উল¬্যাহ বলেন, মিরসরাইয়ে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে পিএইচপি গ্রুপ। পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে স্টিল মিল স্থাপন করবে। এই গ্রুপ ৫৬৪ একর জমিতে স্টিল মিলসহ বিভিন্ন খাতে দুই ধাপে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছে। মিরসরাইয়ে ৫০০ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইজেড। এতে আধুনিক পাল্প অ্যান্ড বোর্ড মিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপন ও ইজেড উন্নয়নে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চীনের ঝেজিয়াং জিনদুন হোল্ডিং গ্রুপ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে। চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান কুনমিং স্টিল ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্টিল মিল করতে চায়। কেএসআরএম গ্রুপ মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং বস্ত্র, বিদ্যুৎ ও স্টিল মিলে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এ গ্রুপ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জন্য ২০০ একর জমিতে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ওমেরা পেট্রোলিয়াম। এরই মধ্যে বেজার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে। বিএসআরএম গ্রুপ মোট তিনটি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। এতে যৌথ বিনিয়োগে এ গ্রুপ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও স্টিল মিল করতে চায়। এ গ্রুপের মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সামিট চিটাগং পাওয়ার এক হাজার ৭৬০ কোটি, সিরাজ সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি প্রায় ২০০ কোটি, বিপিডিবি আরপিসিএল পাওয়ার জেনারেশন এক হাজার কোটি, আরব-বাংলাদেশ ফুড ১০০ কোটি, গ্যাস-১ লিমিটেড প্রায় ২০০ কোটি, ফন ইন্টারন্যাশনাল ২০০ কোটি, ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল সাড়ে ৫০০ কোটি, আরমান হক ডেনিমস ১০০ কোটি এবং অর্কিড এনার্জি ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১ হাজার একর জমি রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ইজেড তৈরিতে প্রায় এক হাজার ২০০ একর জমির উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য ৫০০ একর জমি দেওয়ার কথা রয়েছে।

ভারী শিল্পে প্রাধান্য বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে : গত বছরের ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ইছাখালী ইউনিয়ন চরশরৎ এলাকায় ১১৫০ একর জমি বেপজা ইকোনমিক জোনের জন্য অনুমতি দেন। এরপর থেকেই সেখানে রাস্তা ও সীমানা নির্ধারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করেছে বেপজা (বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন এলাকা কর্তৃপক্ষ)। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত ‘বেপজা ইকোনমিক জোন’ পুরোপুরি বিনিয়োগ উপযোগী হয়ে উঠবে বলে আশা করছে বেপজা কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পকে নিয়ে তাই বেপজার স্বপ্ন অনেক সুদূর প্রসারী। কারণ আয়তনে বেপজা পরিচালিত দেশের ৮টি ইপিজেডে মোট জমির (২৩০৮ একর) প্রায় অর্ধেক বেপজা ইকোনমিক জোন। প্রকল্পটিতে মোট ৮০০ থেকে ৮৫০টি প্লট করা হবে বিনিয়োগের জন্য। পুরো প্রকল্পটি ১১৫০ একরের হলেও রাস্তাঘাটসহ পরিবেশগত ছাড়ের পর শুধু বিনিয়োগের জন্য থাকবে ৪৪৬ একর জমি। এই প্লটগুলোতে অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০টি শিল্প-কারখানা স্থাপিত হবে বলে আশা করছে বেপজা। যেখানে মোট সম্ভাব্য বিনিয়োগ ধরা হয়েছে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ বেপজার ৮টি ইপিজেডে এ পর্যন্ত বিনিয়োগ এসেছে ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বেপজা ইকোনমিক জোনে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে ৫ লাখ। ইতিমধ্যে যে ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে তার অধিকাংশই বিদেশি এবং ইপিজেডেরই পুরনো বিনিয়োগকারী। গত ৬ মাসেই এই আবেদনকারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০টি প্লটসহ মোট প্রায় ২০০টি প্লটের চাহিদাপত্র জমা পড়েছে। বেপজার এক কর্মকর্তা জানান, আবেদনকারীদের মধ্যে যেমন লেদার ফ্যাক্টরি রয়েছে তেমনি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যেমন প্রাধান্য দেওয়া হবে তেমনি গার্মেন্টের তুলনায় লেদার, প্রযুক্তিনিভর্র ভারী শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অথনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপনের উপযোগী হয়ে উঠবে।

জমি বরাদ্দের আবেদন আর নয় : মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে চলতি জানুয়ারি মাসের পর থেকে আর কোনো জমি বরাদ্দের আবেদন নেবে না বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সংস্থাটি ইতিমধ্যে বেশ কিছু আবেদন নিয়েছে। সেখান থেকে কিছু প্রতিষ্ঠানকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখনো নতুন নতুন আবেদন আসছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দের আবেদন নেওয়ার বিবরণপত্র প্রকাশ করে বেজা। মিরসরাইয়ে জমি দেওয়া হচ্ছে দু’ভাবে সরাসরি কারখানা করার জন্য এবং জমি নিয়ে তা উন্নত করে ইজারা দেওয়ার জন্য। মিরসরাইয়ে মোট ১২৯টি প্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ নিতে আবেদনপত্র সংগ্রহ করেছে। এরপর এখন পর্যন্ত কারখানা করতে জমি বরাদ্দ অথবা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার ৬৫০ একর জমি পাবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৩ হাজার ২০০ একর জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় আছে বেজা। সব মিলিয়ে ৫ হাজার ২৮২ একর জমি শেষ। এ ছাড়া আরও কিছু প্রতিষ্ঠানকে জমি বরাদ্দের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। মিরসরাইয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। সব মিলিয়ে মিরসরাইয়ে এখন পর্যন্ত ১ হাজার কোটি বা ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। মিরসরাইয়ে যারা আবেদন করেছে কিন্তু জমি বরাদ্দ পায়নি তাদের প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে।

বিদ্যুৎ খাতে ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করবে চীনা ব্যবসায়িক গ্রুপ ঃ মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি বিদ্যুকেন্দ্রে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে চীনা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ঝেজিয়াং জিনজুন হোল্ডিং গ্রুপ, যাকে একক হিসেবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বলছেন সরকারি কর্মকর্তারা। এ জন্য সেখানে ১ হাজার একর জমি ইজারা নিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে তারা জমির ইজারামূল্যের একটি অংশ জমা দিয়েছে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, দু-এক মাসের মধ্যেই ঝেজিয়াং জিনদুন হোল্ডিংকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে। তারা আগামী মাসেই জমি উন্নয়নের কাজ শুরু করতে চায়। আর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে চায় ২০২২ সালের মে মাসে। বাংলাদেশে এ চীনা কোম্পানিটির বিনিয়োগ প্রস্তাবের বাস্তব রূপ দিতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছিল। অবশেষে সম্প্রতি তা চূড়ান্ত হয় এবং চীনা কোম্পানিটি জমি ইজারার মূল্য বাবদ শুরুতে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ডলার বেজাকে দেয়। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঝেজিয়াং জিনদুনকে অনুন্নত জমি দিচ্ছে বেজা। তারা এ জমি ইজারা নিচ্ছে ৫০ বছরের এককালীন ইজারামূল্যে। এতে মোট ইজারামূল্য হয় ৬ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৭২ কোটি টাকা। জিনদুনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ বিনিয়োগে বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

এক বছরেই চালু হবে শেখ হাসিনা সরণি : মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) এ যোগাযোগ স্থাপনে শেখ হাসিনা সরণি নামে তৈরি হচ্ছে চার লেনের একটি সড়ক। অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বিনিয়োগকারীদের পণ্য ও কাঁচামাল সহজে পরিবহনের জন্য এই সড়ক করা হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে স্থাপিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়কসহ সব অবকাঠামো দ্রুত নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপন করে দ্রুত পণ্য উৎপাদন করে বাজারে ছাড়তে পারে। সড়কটির কাজ আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হবে। এরই মধ্যে সব ব্রিজ ও কালভার্ট করা হয়েছে। এখন সড়কের মূল কাজ হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক থেকে নতুন করে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এই সড়ক করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। চলতি বছরের মধ্যে এ সড়ক চালু করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক থেকে ১০ কিলোমিটার চার লেনের নতুন সড়ক উন্নয়ন করবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এটি হলে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। সরণির এই অংশের উন্নয়নে ব্যয় হবে ১২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ইজেডের মধ্যে ৪০ কিলোমিটার চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই ৪০ কিলোমিটার ঠিকাদারের মাধ্যমে উন্নয়ন করছে বেজা।

মিরসরাই ইকোনমিক জোন উন্নয়নে ইসবিজি’র সাথে চুক্তি : মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ উন্নয়নে বেজা ও এসবিজি ইকোনমিক জোন লিমিটেডের মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি হয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে বেজা কার্যালয়ে বেজার নির্বাহী সদস্য ড. এম এমদাদুল হক ও এসবিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহাবুবুর রহমান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। উন্নত করে ইজারা দেওয়ার জন্য ৫৫০ একর জমি পেয়েছে এসবিজি ইকোনমিক জোন সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, গ্যাসমিন গ্রুপের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোটিয়াম। জোনটি বাস্তবায়নে আগামী ৫ বছরে প্রায় ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।

মিরসরাই ইকোনোমিক জোনের জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ : গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াটের ডুয়েল ফুয়েল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে সঞ্চালন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ৩২৪ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ মিরসরাইয়ে তাঁরা ১০ হাজার একর জমি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করতে চান। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন হবে প্রায় ৩০ হাজার একর। এখানে উন্নয়নের ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। মিরসরাই শিল্পশহর পরিকল্পনায় ৩০ হাজার একরের মধ্যে ১৬ হাজার একরের বেশি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আরও ১০ থেকে ১২ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় আছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এখানে শিল্প কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। ২০৩০ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্পশহর চালু হবে। বেজা দ্রুত এ জোনের উন্নয়ন কাজ করছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বিনিয়োগকারীদের পণ্য ও কাঁচামাল সহজে পরিবহনের জন্য এই সড়ক করা হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে স্থাপিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়কসহ সব অবকাঠামো দ্রুত নির্মাণ করা হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপন করে দ্রুত পণ্য উৎপাদন করে বাজারে ছাড়তে পারে। এ লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরণি করা হচ্ছে, যা আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হবে। এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি অনেক উদ্যোক্তার কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
পবন চৌধুরী আরো বলেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তি প্রস্তর ফলক উন্মেচনের মধ্য দিয়ে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।

গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও পরিকল্পিত শহর। যেখানে ৩০ হাজার একর জমিতে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। আর মিরসরাইয়ের জনগন সেখানে চাকুরীতে অগ্রাধিকার পাবে। গত ২৬ ডিসেম্বর একনেক সভায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াটের ডুয়েল ফুয়েল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে সঞ্চালন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ৩২৪ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মিরসরাই ইকোনোমিক জোনে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। যেখান থেকে শুধু মিরসরাই নয় চট্টগ্রাম সহ জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।