চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রামে টিউশন মিডিয়ার নামে প্রতারণা

প্রকাশ: ২০১৮-০১-২২ ১৯:৪৫:৩১ || আপডেট: ২০১৮-০১-২২ ২৩:২৮:৩৫

ইমরান এমি
সিজিটি টাইমস প্রতিবেদক

হ্যালো, আপনার বাচ্চার জন্য গৃহশিক্ষক লাগবে? সুরেলা কন্ঠে মুঠোফোনে কথাটি বলছিলেন এক তরুণী। কে বলছেন? আমি টিউশন মিডিয়া থেকে বলছি। এটি কোথায় জানতে চাইলে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজারের মতি টাওয়ারে।

পরিচয় জানতে চাইলে তা এড়িয়ে যান মিষ্টি কন্ঠের ওই তরুণী। তবুও প্রশ্নের জবাবে বললাম, হ্যাঁ লাগবে। ব্যস শুরু হলো শিক্ষক বন্ধনা। চবির অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে আমাদের কাছে। যারা আপনার বাসায় গিয়ে বাচ্চাকে পড়াবে।

আপনার বাসা কোথায়? অলঙ্কার মোড়ে। ঠিক আছে আমরা আজই শিক্ষক পাঠিয়ে দিচ্ছি বাসায়। মাসে ৫ হাজার টাকা দিলে চলবে। ঠিক আছে-পাঠান। তবে ওই শিক্ষক তিন দিন বাচ্চাকে পড়াবে। এতে সন্তুষ্ট হলেই তারপর।

আসলেন শিক্ষক। প্রথমদিন দেখা-দেখি। দ্বিতীয় দিন অঙ্ক কষা। তিনটি অঙ্ক রাতে বাসায় এসে দেখলাম বাজারের গাইড বই অনুসারে করা।

বলে রাখছি-আমার বাচ্চা নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের ষষ্ট শ্রেণিতে পড়ে। পরের দিন শিক্ষক আসার পর কথা হলো। একপর্যায়ে শিক্ষক নিজেই স্বীকার করলো সে চবিতে পড়ে না, কোন সময় পড়েওনি। গ্রামের কোন একটা কলেজে ইন্টার পর্যন্ত পড়েছে।

আর টিউশন মিডিয়ার শিখিয়ে দেয়া কথামতে সে চবিতে পড়ে এই মিথ্যা কথাটি বলেছে। এভাবে গরগর করে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরীর অলঙ্কার মোড়ে বসবাসকারী ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সর্বত্র এখন টিউশন মিডিয়ার নামে চলছে প্রতারণা ও হয়রানি। যারা নগরীর কোচিং ও টিউশন মিডিয়া বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্য চকবাজার, কোতেয়ালী, স্টেশন রোড, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ, পাহাড়তলি, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করে।

কথা হয় ওই শিক্ষক লাভলুর সাথে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক দিচ্ছি আর শিক্ষক নিচ্ছি এমন চটকদার বিজ্ঞাপণ দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। যারা মূলত স্কুল-কলেজের মেধাহীন ছাত্র-ছাত্রী। চাকরি না পেয়ে তারা এ রকম প্রতারণায় নেমেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, বুয়েট, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজসহ সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের নামে গৃহশিক্ষক দেওয়ার কথা বলছে। আবার তাদের হাতে পড়ে বেকার ছাত্ররাও নাজেহালের শিকার হচ্ছে। টিউশন মিডিয়ার নামে প্রতারক চক্র টিউশনি দেওয়ার নামে বেকার ছাত্রদের কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সোমবার দুপুরে নগরীর নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ফটকে কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিবাবককে টিউশনি অফার করছিলেন তামিম রায়হান নামে এক যুবক। এ সময় তিনি নিজেকে চুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র বলে পরিচয় দেন। দু‘বেলা খাবার দিয়ে সম্মানী যা দেন তাতে টিউশনি করবেন বলে জানান এক নারী অভিবাককে।

ওই নারী অভিবাবক তার বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে বলেন, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও। একপর্যায়ে টিউশনি দিতে রাজী হন নারী অভিবাবক। কিন্তু এ সময় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। চুয়েটের কোন হলে ছিলেন এবং ভাইস চ্যান্সেলরের নাম ভুল বলায় সন্দেহ হয় তার প্রতি। শেষে আরও যাচাই বাছাই করার পর দেখা গেল সে চুয়েটে কোন সময় পড়েনি। এক পর্যায়ে কয়েকজন অভিবাবক তাকে পুলিশে সোপর্দ করতে চাইলে সে পালিয়ে যায়।

ফেরার পথে নগরীর জিইসির মোড়ে সাদিয়া কিচেন এর সামনে এ প্রতিবেদককে ধরে দাড় করান তামিম। বলেন আপনি আমার পেটে লাথি মেরেছেন। এটা ভাল করেননি। কিন্তু তার প্রতারণার বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতারণা না করলে তার পেট চলবে না। আর এভাবে নগরীতে হাজার যুবক বেচে আছে। টিউশন মিডিয়া, কোচিংয়ের নামে প্রতারণা চলছে। আর আমরা করলে সব দোষ।

তিনি বলেন, নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ঘিরে জিইসির মোড়, মুরাদপুর, ষোলষহর দুই নম্বর গেইট এলাকায় একাধিক টিউশন মিডিয়া রয়েছে। যারা শিক্ষক দিচ্ছি আর শিক্ষক নিচ্ছি বিজ্ঞাপণ দিয়ে সবার সাথে প্রতারণা করছে।

এরমধ্যে টিউশন ডটকম টিউশন মিডিয়া নামে একটি চক্র আমাকে টিউশনি দেওয়ার নামে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে নিয়েছে। এরপর টিউশনিতে পাঠানোর সময় বলছে আমি যেন অভিবাকদের বলি, আমি চবির ছাত্র। গণিত ও ইংরেজিতে পারদর্শী। কিন্তু সেটা বলতে অস্বীকার করায় আমার টিউশনিও হয়নি। টাকাও ফেরত দেয়নি। এভাবে চট্টগ্রামে হাজার যুবক ও শিক্ষার্থীর অভিবাবকরা নিত্যদিন প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তবে কিছু অভিবাবক আছে কম শিক্ষিত। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোতে প্রতারণা করে পার পেয়ে যাচ্ছে তারা।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে, জিইসির মোড়ে টিউশন ডটকম মিডিয়ার মালিক মো. রুবেল বলেন, আমরা কোন প্রতারণা করছি না। এটি আমাদের ব্যবসা। প্রতারণা করছে শিক্ষকরা। এদের অনেকে ভুয়া জাল সনদ দিয়ে নিজেদের চবি ও চুয়েটের ছাত্র দাবি করে। কিন্ত বাচ্চা পড়াতে গেলে আপত্তি আসে। বিশেষ করে সচেতন অভিবাবকদের হাতে পড়লে এদের খবর হয়ে যায়। ফলে তাদের টিউশনি আর থাকে না। আর টিউশিনি দেওয়ায় আমরা ফি নিলে সেটা ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টিউশন মিডিয়া পরিচালনার জন্য কোন লাইসেন্সের দরকার হয় না। কোচিং সেন্টার পরিচালনার জন্য লাইসেন্স নিতে হয়। এটা আমরা ছাত্ররা চালায়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন অন্য কথা। তিনি বলেন, কোচিং সেন্টার হোক আর টিউশন মিডিয়া হোক যে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স লাগবে। অনেকে টিউশন মিডিয়ার ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে।

সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামশুদ্দোহা বলেন, যেসব টিউশন মিডিয়ার ট্রেড লাইসেন্স নেই। আর প্রতারণার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।