চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রামে গ্যাসেরও লোডশেডিং! মাটির চুলায় রান্না

প্রকাশ: ২০১৮-০১-২২ ২৩:৫০:২৪ || আপডেট: ২০১৮-০১-২৩ ১০:০৫:০৬

এম আই খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

বিদ্যুতের সাথে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় চলছে গ্যাসেরও লোডশেডিং। শীতের শুরু থেকে দিন দিন বেড়েই চলেছে এই লোডশেডিং। ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি রান্না-বান্নায় ও দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় ঘটছে ছন্দপতন।

নগরীর বাকলিয়া এলাকায় আজ রবিবার সকালে সরজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারে গ্যাসের চুলার পাশে বসানো হয়েছে বিকল্প মাটির চুলা। যেখানে কাগজ আর খড়ি জ¦ালিয়ে রান্না-বান্না করছেন হালিমা খাতুন, রহিমা বেগম, মরিয়ম খাতুন, নাসরিন আজাদ, নওরিণ নাহারসহ অসংখ্য গৃহবধুরা।

জানতে চাইলে তাদের কয়েকজন বলেন, গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকলে সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে। স্কুল থেকে ছেলে মেয়েরা আসবে তাদের জন্য মাটির চুলাতে রান্না করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

রহিমা বেগম জানান, গ্যাস রাত ১০টায় আসে সকাল ৭টায় চলে যায়। এ সময়ে তো রান্না কিংবা খাবারের সময় নয়। প্রয়োজন মতো রান্না করতে না পারলে সংসারে সবাইকে উপোস থাকতে হবে।

একই কথা বলেছেন, নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার গুলজার বেগম, ফরিদের পাড়া এলাকার নিলু আক্তার, সমশেরপাড়া এলাকার লিওন নাহার লিও, মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকার আরজিনা বেগম, মৌসুমি আবাসিক এলাকার সামশুন নাহার, নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার মিতালি দাশসহ অনেক গৃহবধু।

তারা বলেন, চট্টগ্রামে একেবারে যে গ্যাস সরবরাহ নেই তা নয়, তবে কোন কোন সময় সারাদিনেও গ্যাসের দেখা মিলে না। রাত ১০টার দিকে একটু একটু আসলেও সকালে ঘুম থেকে উঠার পর আর গ্যাস আর পাওয়া যায় না। ফলে বিকল্প উপায়ে রান্না সারতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী গৃহবধুরা বলেন, চট্টগ্রামে সারা বছরই গ্যাসের সংকট রয়েছে। তবে শীত মৌসুম আসলে এ সংকট আরো বেড়ে যায়। গরম কালের চেয়ে শীতে গ্যাসের চাহিদা এমনিতেই বাড়ে। কারণ এই সময়ে বারবার খাবার গরম করা, গোসলের পানি গরম করা, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য আলাদা করে বারবার পানি গরম করার কারণে গ্যাসের ব্যবহার বেশি হয়। অথচ এ সময়ে চলে গ্যাসের লোডশেডিং। এতে নগরবাসীর কষ্ট বেড়ে যায় অনেকগুণ।

অন্যদিকে গ্যাসের লোডশেডিংয়ের কারনে অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। যেসব কারখানা উৎপাদন চালু রেখেছে তারাও কাঙ্খিত উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে শিল্পাঞ্চলেও এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব বিরাজ করছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে এর প্রভাব পড়ছে মারাতœকভাবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এম মাহবুব আলম বলেন, গ্যাস সংকটের কারনে চট্টগ্রামে শতাধিক ও সারাদেশে অন্তত আড়াইশ পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অন্যদিকে পর্যাপ্ত উৎপাদন না হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও অনিশ্চয়তা তৈরী হচ্ছে। এতে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও দেখা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক শিল্পমালিক গ্যাসের অভাবে সিএনজি দিয়ে কারখানা চালু রেখেছে। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাটা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে এমন আশ্বাসও দিতে পারছে না গ্যাস সরবরাহ কর্তৃপক্ষ। কারণ চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও সেখান থেকে গ্যাস আহরণ থেকে শুরু করে ব্যবহার যোগ্য পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত বিকল্প কোন উপায়ও দেখা যাচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে।

গ্যাস সংকট নিরসন করা সম্ভব না হলে শিল্পখাতে নিয়মিত উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এর বিরূপ প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। আবাসিক ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্থ হলে এর প্রভাবও স্বস্তিকর হবে না। সুতরাং গ্যাস সংকট নিরসনে বিকল্প উপায় বের করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এমএ মাহবুব আলম।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) এর ব্যবস্থাপক (জোন-৫) আবদুল কাদের সিটিজি টাইমসকে বলেন, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। কিন্তু দৈনিক সরবরাহ করা হয় মাত্র ১৯৫ থেকে ২১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড শীতের শুরুতে সিইউএফএলে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। এ কারণে গ্যাসের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

তবে সম্প্রতি ভোলায় আবিস্কৃত নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন শুরু হলে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট কমে আসবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

কেজিডিসিএলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একদিকে গ্যাস সরবরাহ দিন দিন কমছে। অন্যদিকে শীতের শুরু থেকে চট্টগ্রামে ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। তার উপরে সরবরাহকৃত গ্যাসের অধিকাংশই সিইউএফএলে ইউরিয়া সার উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে। তাই বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে কখন গ্যাস উত্তোলন শুরু হবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোন তথ্য কেজিডিসিএলের কাছে নেই বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।