চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ কিশোরের হাতে ‘মোটরবাইক’!

প্রকাশ: ২০১৮-০১-২০ ২১:৩৭:৩৯ || আপডেট: ২০১৮-০১-২১ ১৮:৩৪:০৫

এম আই খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম মহানগরীর এক স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আরমান। প্রতিদিন সে স্কুলে যাওয়া আসা করে মোটরবাইকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলে যাওয়া আসার জন্য শখ করে তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেয় মা-বাবা।

কিন্তু এই মোটর সাইকেল পেয়েই বখে যায় আরমান। মোটর সাইকেলে স্কুলে যাওয়া আসার পরিবর্তে সে যোগ দেয় গ্যাং গ্রুপের নানা অপরাধ কর্মকান্ডে।

স্কুল ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে তার নিজের নামে রয়েছে একটি গ্যাং গ্রুপ। যার সদস্য সংখ্যা ত্রিশের উপরে। নগরীর নিজ বাড়ি এলাকায়ও স্কুল ছাত্রলীগের নামে তার রয়েছে আরও একটি গ্যাং গ্রুপ। যার অন্যতম হচ্ছে মঈন হোসেন।

এই মঈন হোসেনের ছুরিকাঘাতে গত ১৬ জানুয়ারি খুন হয়েছে কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফার (১৫)। সেদিন মোটরবাইকে আরও দু‘জনকে সাথে নিয়ে মঈন হোসেন দ্রুতবেগে জামাল খান আইডিয়াল স্কুলের সামনে পৌছে। সাথে ছিল আরমানও। আরমানের মোটরবাইকেও ছিলেন আরও দুইজন।

আরমান পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও মঈন হোসেন এখনো পলাতক রয়েছে। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্তু হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটারবাইক দুটি জব্দের বিষয়ে তেমন কোন মাথাব্যথা দেখা যায়নি পুলিশের।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসাইন বলেন, হত্যাকান্ডে মোটারবাইক ব্যবহারের বিষয়টি পুলিশের নজরের বাইরে রয়েছে। তবে বিষয়টি নজরে আনা হচ্ছে।

প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে অনেক কিশোর মোটরবাইক চালাতে দেখা যায়। কিন্তু এরা যে অপরাধ কাজে এসব মোটরবাইক ব্যবহার করছে তা পুলিশের নজরে আসেনি। এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন আরও সতর্ক হবে।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল, কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাই স্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল ভিত্তিক এসব কিশোর গ্যাং ছাত্রলীগের নামে সক্রিয়।

যারা নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ডান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে মরিয়া।

শুধু তাই নয়, এসব কিশোর গ্যাং চক্র মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত। নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে থাকে। এসব কর্মকান্ডে মোটরবাইক ব্যবহার হয় বেশি। যা পুলিশের নজরে থাকলেও কিশোর হওয়ার কারনে বিষয়টি তেমনভাবে ভাবা হয়নি।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জাামান এ প্রসঙ্গে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ কিশোরের নিজস্ব মোটরবাইক রয়েছে। ফলে মোটরবাইকে করে যে কোন অপরাধ কর্মকান্ডে ঘটনাস্থলে পৌছে যায় তারা। অপরাধ কর্মকান্ডে এই মোটরবাইক তাদের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, মোটরবাইক হাতে পাওয়া কিশোররা একেবারেই বেপরোয়া। যারা রাস্তায় দাপিয়ে চলে। মোটরবাইকে স্কুলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এদের অনেকে স্কুলের শিক্ষক ও অভিবাকদের মানে না। হেরফের হলে অপদস্তও করে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অর্থ ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। এদের শক্তির মূল বাহন হচ্ছে মোটরবাইক। যা শখের বশে কিনে দিয়েছে মা-বাবা। আবার অনেক কিশোর অপরাধ কর্মকান্ড করে টাকা পেয়ে মোটরবাইক কিনেছে।

তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন দরকার। পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুশাসন পুনরুদ্ধার করতে হবে। রাজনৈতিক ইন্ধন বন্ধ অথবা প্রত্যাহার করতে হবে। ইন্ধনদাতা বড় ভাইদের আইনের আওতায় আনতে হবে।