চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

পিথাগোরাস, রবীন্দ্রনাথ ও ‘বিশ্বজোড়া বিশ্ববিদ্যালয়’

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৭ ১৩:৩৯:৪৭ || আপডেট: ২০১৮-০১-১৭ ১৬:২৯:০২

ফজলুর রহমান

তিনি মনে করতেন, কোনো একজন গুরুর কাছে জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না, পুরো বিশ্বই জ্ঞানের ভান্ডার। তাই সামোস শহরে শিক্ষার পাট চুকিয়ে বের হন দেশভ্রমণে। তখন মিসর ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল। তাই মিসর চলে যান। সেখানে পড়াশোনা করেন গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে। ধারণা করা হয়, মিসরের বড় বড় পিরামিড দেখেই তাঁর মাথায় জ্যামিতির একটি ভাবনা আসে। আবিষ্কার করেন তাঁর বিখ্যাত উপপাদ্য। বলা হচ্ছে, গণিতশাস্ত্রেও আদিপুরুষ পিথাগোরাসের কথা। ছোটবেলা থেকেই বিদ্যানুরাগী ছিলেন পিথাগোরাস। তবে মূল শিক্ষাটা পেয়েছেন চারদেয়ালের ক্লাসের বাইরে, ‘বিশ্বজোড়া বিশ্ববিদ্যালয়’-এ।

মহাত্মা গান্ধীর ভাষায়-‘শান্তি নিকেতনই ভারত’। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-‘বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনে একদিন বিশ্ব্ আশ্রয় লাভ করবে’। কি আছে এই নিকেতনে? রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছে একটি ব্রম্ম্য বিদ্যালয় খোলার অনুমতি চাইলে তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুশি হয়ে অনুমতি প্রদান করেন। গুটি পাঁচেক ছাত্র নিয়ে প্রথমে গঠন করা হল ব্রম্ম্যচর্যাশ্রম। সেখানে নিরামিশ আহার আর গাছের ছায়ায় বিদ্যাভাস চলতে থাকে। ১৯১৩ সালে প্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁর নোবেল পুরষ্কারের সব টাকা ব্যায় করলেন এই বিদ্যালয়ের ব্যাপ্তিতে। ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্টিত হল বিশ্বভারতী বিদ্যালয়। এতে মৃনালিনী আনন্দ পাঠশালাতে প্রথম শ্রেণীতে ভর্র্তি করা হয়। আনন্দ পাঠশালা ও পাঠভবনের ক্লাস নেওয়া হয় ছায়াবিথীতে, আমকুঞ্জে, বকুল বিথীতে বা কোন তরুমূলে।

লেখাপড়াকে চারদেয়ালের বাইরে নেয়ার পিথাগোরাসের খ্রিস্টপূর্বকালীন সেই এ্যাডভেঞ্চার কিংবা শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগগুলো এখন ক্রমশ: যথাযথ প্রমাণিত হচ্ছে আধুনিক গবেষণায়।

নতুন এক গবেষণা বলছে, বদ্ধ কোনো শ্রেণিকক্ষের চেয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে পাঠদান করালে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বেশি থাকে। এ ছাড়া পাঠদানে তাদের অংশগ্রহণও থাকে তুলনামূলক বেশি। অবসাদ দূর করা, শরীর সুস্থ রাখাসহ নানা কারণে মানুষ খোলা স্থানে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে সময় কাটাতে পছন্দ করে। এ ক্ষেত্রে উপকারও মেলে। এই হিসেবে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে পাঠদান করালে তুলনামূলক ভালো ফল মিলবে-এমন একটা পূর্বানুমান থেকে গবেষণাটি করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েসের একদল গবেষক। গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি ছাপা হয় ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ সাময়িকীতে।

গবেষণাটি হয়েছে একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর। তাদের সবার বয়স ৯ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এসব শিক্ষার্থীকে প্রথমে একটি বদ্ধ শ্রেণিকক্ষে এক সপ্তাহ পাঠ দান করা হয়। এরপর একই বিষয়ে একই শিক্ষক দ্বারা এক সপ্তাহ পাঠদান চলে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে। তাতে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ছিল তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া পাঠদানের সময় তাদের অংশগ্রহণও শ্রেণিকক্ষের চেয়ে বেশি ছিল। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, কোনো শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে যদি বাইরের সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকে, তবে ওই শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান করালে তুলনামূলক ভালো ফল মিলবে!

তাইওয়ানের একদল গবেষক একটি স্কুলের শিশুদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন, স্কুলের ১২ বছরের মধ্যকার বেশিরভাগ শিশুই কঠিন মায়োপিয়ায় আক্রান্ত। মায়োপিয়া হলো এমন এক ধরনের চোখের অসুখ, যেক্ষেত্রে শিশুরা ক্রমশ কাছের জিনিস কম দেখতে পাওয়া শুরু করে। তখন চশমার সাহায্য নিতেই হয়। ঐ গবেষকদল সে স্কুলের বাচ্চাদের স্কুলের বাইরের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। এক বছর পর তার ফলাফল দাঁড়ায়, মায়োপিয়া আক্রান্তের হার ১৭.৬৫% এ নেমে এসেছে যা কিনা ‘প্লে আউটসাইড স্কুল’গুলোতে ৮.৪১% হয়ে থাকে। বাচ্চারা স্কুলের বাইরে খেলাধুলা করলে বা বেড়াতে গেলে, বেশিরভাগ সময়েই প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকে। সুতরাং বাচ্চাদের সুস্থ স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে প্রকৃতির গুরুত্ব অপরিসীম।

একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের করা অনলাইন সমীক্ষায় ৪,৪০০ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারা ভালো থাকার কারণ খুঁজতে মোট ১৩টি মেট্রিকস ব্যবহার করেছিলেন। সেসব মেট্রিকসের মাঝে অন্যতম ছিল, প্রকৃতির সাহচর্যে থাকা, আউটডোর গেমসে অংশগ্রহণ, সামাজিক কাজে যোগ দেয়া, সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতা ইত্যাদি। দেখা যায়, জীবনে সন্তুষ্টি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অনুভূতি এনে জীবনের গতি সচল রাখতে সেই ১৩টি মেট্রিকসের ১১টিই সরাসরি যুক্ত প্রকৃতির সাথে।

আরেক গবেষক কেলি বিডেনওয়েগ এনভায়রনমেন্টাল জার্নালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণালব্ধ ফলস্বরূপ জানান, ‘‘প্রকৃতির সাথে সংযোগ যত গভীর হবে বা যতটা বেশি সময় প্রকৃতির সঙ্গে কাটাতে পারবো, আমাদের ভাবনার স্বচ্ছতা, চিন্তার গভীরতা ও বোঝার ক্ষমতা ততই উন্নত হবে। এটা সামগ্রিকভাবে জীবনকে গ্রহণ করার ও উপভোগ করার মানসিকতা গড়ে তোলে।”

কঠিন অসুখ থেকে সেরে ওঠার নিমিত্তে অনেক সময় ডাক্তাররা পরামর্শ দেন যেন রোগী কোনো পছন্দসই স্থানে কিছু সময় কাটিয়ে আসেন। এ কথার পেছনে রয়েছে খুব সুন্দর যুক্তি এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল। জাপানের একদল গবেষক বিষয়টির উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ, সবুজ অরণ্য-ছায়া, পাখির কিচির-মিচির ইত্যাদি বিষয়গুলো এন্টি-ক্যান্সার প্রোটিনকে উদ্দীপিত করে থাকে। তাতে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ক্যান্সার উপশম সত্যি সম্ভব। তাছাড়া, চেইন স্মোকাররাও তাদের অতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস নিরাময়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে তাদের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার সুযোগ থাকে বলে জানানো হয়েছে সেই গবেষণায়।

ডাচ গবেষকরা ২,৫০,৭৮২ জন লোকের উপর গবেষণা চালিয়ে এটা প্রমাণ করেছেন যে, যারা শহরাঞ্চলে ইট-কাঠ-পাথরের মাঝে দিনাতিপাত করেন তাদের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষজন অধিক দীর্ঘায়ু এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অধিক সবুজ আবহাওয়ায় থাকেন। তাদের মানসিক পীড়া তুলনামূলক হারে তাই কম থাকে। এটাই মূলত তাদের দীর্ঘায়ুর প্রধান কারণ।

বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় প্রমাণ দিয়েছেন, চাপ ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক ব্যাপারগুলোর সব চাইতে বড় ওষুধ হচ্ছে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় অতিবাহিত করা। গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মানসিক চাপগ্রস্থ ব্যক্তি চরম হতাশ মুহূর্তে মাত্র ১০ মিনিটের জন্যে হলেও যদি কোনো পার্ক বা খোলামেলা হাওয়াযুক্ত সবুজ পরিবেশের স্থান থেকে হেঁটে আসেন, তবে তার মানসিক দুরবস্থা কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও উপশম হয়। কারণ এতে মস্তিষ্কে তৈরি হয় কিছু ভালো লাগার হরমোন। এ হরমোন আপনাকে মানসিক চাপ উপশমে অসাধারণ কাজ দেবে।

গবেষকরা দেখেছেন, কোনো মানুষ যদি প্রকৃতির কোনো ছবির দিকেও মনোযোগ দেয়, তাহলেও তার স্মৃতি বা মেমরি কিছুটা রিফ্রেশ হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটে। তাহলে বুঝতেই পারছেন, ছবি না হয়ে তা যদি হয় সত্যিকারের প্রকৃতি সান্নিধ্য, তাহলে তো কথাই নেই।

মিশিগান ইউনিভার্সিটির গবেষকগণ কিছু মানুষের উপর জরিপ চালাতে তাদের দু’ভাগে ভাগ করে, একদলকে সবুজ ছায়ায় ঘেরা উদ্যানে আর আরেক দলকে সিটি স্ট্রিটে পাঠিয়ে দেন। যখন তারা ফিরে আসেন তখন তাদের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, যারা সবুজের মাঝে ছিলেন, তাদের স্মৃতিশক্তি আগের তুলনায় ২০% উন্নতি করেছে। আর যারা ছিলেন সিটি স্ট্রিটে, তাদের কোনো রকম উন্নতিই হয়নি। সুতরাং একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রকৃতি মানুষকে তার স্মৃতিশক্তি ঝালিয়ে নিতেও অনেক সাহায্য করে থাকে।

রাতের পৃথিবীর ছবি নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এলইডি ও ফ্লুরোসেন্ট বাতির অতিব্যবহারে অনেক দেশ থেকেই ‘রাত হারিয়ে যাচ্ছে’। এর ফলে ‘উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের জীবনধারণে’ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। রাতের আলোর উজ্জ্বলতা মাপতে বিশেষভাবে বানানো নাসার স্যাটেলাইট রেডিওমিটারের সাহায্যে এই গবেষণা করা হয়েছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে ঝকমকে উপকূল ও মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শহরগুলোতে রাতের আলো চমৎকার দেখালেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ২০১৬ সালে আমেরিকার মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছিল, অতি তীব্র কিন্তু দুর্বল নকশার এলইডি বাতির নীল আলো মানুষের ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন ম্যালাটোনিনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ!

শিক্ষা তথা জীবনযাপনের সাথে প্রকৃতির নিবিড় বন্ধনেই যে মুক্তি সম্ভব, তা উঠে আসছে বিভিন্ন গবেষণায়। আমাদের দেহখানায় চলমান ‘বায়োলজিক্যাল ঘড়ি’ প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশেই বেশি স্বস্তিবোধ করে। অন্য প্রতিবেশে তা বেমানান। অন্যথা হলে তার মরণ ঘন্টাও বেজে যায়!!!

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।