চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রামে খেলার মাঠে মেলা, নির্বাসনে খেলাধুলা!

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৩ ২৩:৫৪:৪৬ || আপডেট: ২০১৮-০১-১৪ ১০:০৫:১১

প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস 

চট্টগ্রামে কলেজিয়েট স্কুল মাঠ, পলোগ্রাউন্ড ও জাম্বুরি মাঠ ছিল ফুটবলার ও ক্রিকেটারদের মিলন মেলা। পলোগ্রাউন্ড মাঠে অন্তত দশটা দল অনুশীলন করতো প্রতিদিন সকাল-বিকাল। শুধু তাই নয়, এ মাঠে অনেকগুলো ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হতো।

জাম্বুরি মাঠ আরও ব্যস্ত থাকতো ফুটবলারদের অনুশীলন ও নানা টুর্নামেন্ট আয়োজনে। প্রাণবন্ত থাকতো খেলোয়াড়দের পদচারণায়। চট্টগ্রামের সে তিনটি মাঠই এখন খেলার অনুপযুক্ত।

পলোগ্রাউন্ড মাঠে বছরের বেশির ভাগ সময় জুড়ে থাকে মেলা। জাম্বুরি মাঠ হয়ে গেছে শিশু পার্ক। সেখানে পূর্ত মন্ত্রণালয় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কাজেই সেখানে আর খেলার পরিবেশ নেই।

কলেজিয়েট স্কুলের মাঠ বালিতে ভরা ও অসমতল। এ রকম অনেক মাঠই এখন খেলার উপযোগী নয় চট্টগ্রামে। ফলে মাঠের অভাবে নির্বাসনে যাচ্ছে চট্টগ্রামের খেলাধুলা। এমন মত খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকদের। তাদের মতে, এসব মাঠে খেলে ৮০ ও ৯০ দশকে তৈরী হয়েছে জাতীয় মানের বহু খেলোয়াড়।

চট্টগ্রামের সন্তান জাতীয় দলের ফুটবলার আরমান আজিজ বলেন, পলোগ্রাউন্ড, কলেজিয়েট ও জাম্বুরি মাঠে খেলে বড় হয়েছি আমি। আর এসব মাঠে এখন খেলাধুলাই করতে পারছে না খেলোয়াড়রা। চট্টগ্রামের অন্য সব মাঠের অবস্থাও বেহাল। যার কারনে চট্টগ্রাম থেকে ফুটবল ও ক্রিকেটে এখন আর সেরকম খেলোয়াড় তৈরী হচ্ছে না।

তিনি বলেন, মাঠ না পেলেও চট্টগ্রাম খেলাধুলা হচ্ছে না তা নয়, তবে মাঠের অভাবে প্রয়োজনীয় খেলাধুলা করতে পারছে না এটাই মূল সমস্যা।

চট্টগ্রামের আরেক সাবেক ফুটবলার সমিরণ বড়–য়া বলেন, কলেজিয়েট, পলোগ্রাউন্ড ও জাম্বুরি মাঠ ছাড়াও চট্টগ্রাম শহরে আরো কিছু মাঠ রয়েছে। যারমধ্যে শহীদ শাহজাহান মাঠ, সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের মাঠ কিংবা প্যারেড মাঠেও নেই খেলার পরিবেশ। বিকেলে এসব মাঠে দেখা যায় ছেলেদের মিছিল। শতশত ছেলে নানা গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলছে। আর সেটা কেবলই সময় কাটানোর খেলা।

সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুলের মাঠটি কিছুদিন আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ দেওয়াল তুলে ঘিরে রেখেছে। ফলে সাধারণের সেখানে প্রবেশ সংকুচিত হয়ে গেছে।

আউটার স্টেডিয়াম ছিল এক সময় খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র। এই মাঠেই বসতো স্টার সামার বা স্টার যুব ক্রিকেটের মত আসর। সে মাঠটি প্রথমে খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে, যখন এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে ফ্লাড লাইট স্থাপন করা হয়।

এই ফ্লাডলাইটের দুটি টাওয়ার স্থাপনে চলে যায় মাঠের বিশাল অংশ। মাঠের পূর্ব পাশে মার্কেট নির্মাণ করতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায় আরো কিছু অংশ। ফলে একেবারেই খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে মাঠটি।

এরপর নানা সময়ে মেলা আর বছরের বেশির ভাগ সময় অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যায় আউটার স্টেডিয়াম। ফলে খেলাধুলা এক রকম নির্বাসনে চলে যায়। চট্টগ্রামের এই মাঠ সংকট কাটিয়ে উঠার কোন উদ্যোগও নেই বলে অভিযোগ এই ক্রীড়াবিদের।

চট্টগ্রামে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য হারুনর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বাকলিয়ায় একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সেটিকেও গড়ে তোলা যায়নি। ফলে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে মাঠ সংকট ক্রমশ কঠিনতর হচ্ছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে দুটি স্টেডিয়াম রয়েছে। যারমধ্যে ক্রিকেটের জন্য বিশেষায়িত জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু খেলা আয়োজন করা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থাকলে তার জন্য পরিচর্যা করতেই অনেক সময় লেগে যায়। ফলে খুব কম সময় এই স্টেডিয়ামটি ব্যবহার করতে পারে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা। ফলে যত খেলা এই এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে।

এছাড়া রেডিসন ব্লু হোটেল যেখানে নির্মিত হয়েছে সেখানেও অনেক দল অনুশীলন করতো। জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের মাঠটিও ছিল খেলাধুলার উপযোগী। কিন্তু সেখানে ঈদগা নির্মাণ করায় এখন সেই সুযোগ নেই।

ফলে যখন ফুটবল কিংবা ক্রিকেট লিগ শুরু হয় তখন পাগলের মত ছুটতে হয় দলগুলোকে অনুশীলনের জন্য। বেশির ভাগ দলই তখন বেছে নেয় সাগরিকাস্থ মহিলা কমপ্লেক্স মাঠটিকে। এই মাঠটি আবার চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ কিংবা তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট আয়োজনে ব্যবহার হয়ে থাকে।

কিন্তু ফুটবল মৌসুমে অনেকগুলো ফুটবল দল একসাথে অনুশীলন করার কারণে এক সময় সে মাঠটিও হয়ে পড়ে খেলার অনুপযোগী। তারপরও বাধ্য হয়ে সে হতশ্রী মাঠে অনুশীলন চালাতে হয় দল সমূহকে। এই মাঠ সংকটের কারণে ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলাররা হারাচ্ছে অনুশীলনের সুযোগ। ফলে তারা গড়ে তুলতে পারছে না নিজেদের।

সাবেক ক্রিকেটার আদনান ফাহাদ বলেন, আমি একটি দলকে অনুশীলন করাই। কিন্তু খেলোয়াড়দের লং ক্যাচ অনুশীলন করাব তেমন একটি মাঠ খুঁজে পাই না। ফলে স্টেডিয়ামের সামনে ছোট মাঠে বাধ্য হয়ে অনুশীলন করাতে হয়। আর তাতে সঠিকভাবে অনুশীলনটা হয় না খেলোয়াড়দের। যার প্রভাবটা পড়ে মাঠে গিয়ে। দেখা যায় সহজ একটি ক্যাচও ছেড়ে দিচ্ছে।

হালিশহর আবাহনী মাঠটিও এখন আর খেলার উপযোগী নেই। বর্ষার সময় পানিতে ভরে থাকে মাঠটি। আর শুষ্ক মৌসুমে চলে মেলা। এই মাঠটিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম আবাহনীর। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সেখানেও খেলতে পারছেনা খেলোয়াড়রা।

এমন মাঠ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের খেলাধুলা। এই সংকট কবে কাটবে তারও কোন সদুত্তর নেই কারো কাছে। এমতাবস্থায় দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে খেলাধুলার সুযোগ। মাঠ সংকটের কারণে মান স¤পন্ন খেলাধুলা না হওয়ায় বেরিয়ে আসছে না জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার মত কোন ক্রীড়াবিদ।

ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকরা জানান, চট্টগ্রামে অন্তত একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি উঠেছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু কেউ যেন শুনছে না ক্রিড়াবিদ এবং ক্রিড়া সংগঠকদের সে আকুতি। আর আদৌ এ দাবি পুরণ হবে কিনা সেটাই রয়েছে বড় প্রশ্ন হয়ে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়াসংস্থার সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান এ প্রসেঙ্গ বলেন, নগর উন্নয়নসহ নানা কারনে খেলার মাঠ সংকুচিত হচ্ছে ঠিকই। ফলে খেলাধুলা নির্বাসনে যেতে বসেছে। এই সমস্যা উত্তরণে বাকলিয়ায় একটি স্টেডিয়াম তৈরীর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চসিকের সাথে সমন্বয় করে তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।