চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

রাজনীতি কোন পথে?

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৩ ১২:৫৮:২৮ || আপডেট: ২০১৮-০১-১৩ ১৩:৫৫:২৫

সরকারের চার বছর পুরো হলো। আবার এ বছরের শেষে বা আগামী বছরের একেবারে শুরুতেই হওয়ার কথা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রশ্ন, রাজনীতি এখন কোন পথে?

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রচার-প্রচারণায় দৃশ্যমান হলেও বিএনপি আছে চুপ হয়ে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় না হলে তারা নির্বাচনে যাবে কি না তা এখনো স্পষ্ট করে বলছে না দলটি।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘হঠাৎ’ জয়ে উচ্ছ্বসিত জাতীয় পার্টি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছে। ওদিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ না নিলেও বিএনপির সঙ্গে তাদের জোট সম্পর্ক অটুট রেখেছে।

সরকারের চার বছর পূর্তি উৎসবের চেয়ে জাতীয় নির্বাচনই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রীরাও কথা বলছেন নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সক্রিয় আছে আওয়ামী লীগ। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও সরব। সেই তুলনায় বিএনপির রাজনীতি থিতিয়ে গেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

নির্বাচনের চেয়ে বিএনপির চোখ এখন আদালতের দিকেই বেশি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় কী হয় তা-ই দেখার অপেক্ষায় আছে তারা। আবার ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে তারা বোঝার চেষ্টা করবেন আসলে সরকার কী চায়। কারণ, দুর্নীতি মামলায় তারেক রহমানের সাত বছরের কারাদ- হওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের জন্য তিনি এরই মধ্যে অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের বেশি সাজা হলে খালেদা জিয়াও নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন। অবশ্য বিচারিক আদালতের রায়ই শেষ কথা নয়। যদি খালেদা জিয়ার সাজা হয়েই যায়, তারপরও উচ্চ আদালতে আপিল করলে সাজা স্থগিত হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা থাকবে না।

তবে বিএনপির আরেক ভরসা তারেক রহমানের দেশে ফেরা অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা হলে কী হয়, এ নিয়েও উদ্বেগে আছে বিএনপি।

বিএনপি এবার নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না-এমন কথা যেমন বলছে, তেমনি এটাও বলছে যে, চার বছর আগে সরকার যেভাবে ভোট করতে পেরেছে, এবার বিএনপিকে ছাড়া সেটা সম্ভব হবে না। গত ২ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বয়ং এই অবস্থান তুলে ধরেছেন।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করবে? জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় এই সময়কে বলেন, ‘সরকার এ ধরনের কিছু চিন্তা করলে তাদের জন্যই বুমেরাং হবে। জনগণ ৫ জানুয়ারির (২০১৪ সাল) মতো একতরফা নির্বাচন হতে দেবে না। ভোটের অধিকার আদায়ে তারা আন্দোলন গড়ে তুলবে।’

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও বিএনপি সহিংস আন্দোলনে ছিল। ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা ৫৯২টি স্কুলে আগুন, ভোটের দিন অবরোধ ও হরতাল, কেন্দ্রে হামলা, ভোটারদের পিটুনিতে কেন্দ্রে উপস্থিতি নিতান্তই কম ছিল, কিন্তু নির্বাচন ঠেকানো যায়নি।

এ প্রসঙ্গে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিএনপি জনগণকে নিয়ে যে আন্দোলন করেছিল তা ব্যর্থ হয়নি। বরং সরকার যখন বুঝতে পেরেছে তাদের জনভিত্তি কমে গেছে, তখন তারা প্রশাসনের পিঠে চড়েছে। প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিএনপি নেতা-কর্মীদের হামলা-মামলা, গুমের মাধ্যমে কোণঠাসা করে রেখেছে। সরকার তো জনসমর্থনের উপরে না, সরকার আছে একটা শক্তির ওপর। সেটা প্রশাসনিক শক্তি। এটা তারা যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করছে। প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে তারা টিকে আছে। এটাই তাদের একমাত্র শক্তি।’

সরকারের পক্ষে সমর্থন নাই বলছে বিএনপি। কিন্তু তারা ক্ষমতায় থেকে দেশ চালাচ্ছে দাপটের সঙ্গেই। এর আগেও বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন বাংলাদেশে হয়েছে একাধিকবার। বিএনপি নিজেও একটি নির্বাচন করেছে এবং ২০০৭ সালে আরও একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ প্রধান দলগুলোর বর্জনের মুখে নির্বাচন করে বিএনপি ক্ষমতায় টিকতে পারেনি দুই সপ্তাহও।

আবার আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে মহাজোটের শরিকদের বর্জনের মুখে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে বিএনপি ভোটই করতে পারেনি। তার আগেই সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ ছাড়েন বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। জারি হয় জরুরি অবস্থা। এর দুই বছর পর নির্বাচনে ভরাডুবি হয় বিএনপির।

তারও পাঁচ বছর পর নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে ব্যর্থ হয় বিএনপি। এরও এক বছর পর সরকার পতনের ‘চূড়ান্ত’ আন্দোলনের ডাক দিয়ে খালি হাতে ঘরে ফেরে দলটি। সেই থেকে রাজনীতির মাঠে দৃশ্যত তাদেরকে গুরুত্ব দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বারবার। বিএনপি কি আবারও নির্বাচন ঠেকাতে আন্দোলনে যাওয়ার মতো আছে? কর্মীদেরকে মাঠে নামিয়ে আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার অবস্থান কি তৈরি করতে পেরেছে দলটি?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় স্বীকার করছেন, তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে। কিন্তু তাদের বিপুল জনসমর্থনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে বলেছেন গয়েশ্বর।

‘আবার এখন সরকারের কাছে সকল চাবিকাঠি। এজন্য তারা যা খুশি বলছে। তবে এটাই তো শেষ সরকার না। মানুষের মৌলিক দাবি, সেটা গণতান্ত্রিক অধিকার মানুষকে ফেরত দিতেই হবে। ভোটের অধিকার একদিন না একদিন দিতেই হবে। এখন তারা শক্তি, সামর্থ্য বা অর্থ দিয়ে হয়তো বা কিছুদিন চেষ্টা করবে। এক সময় না এক সময় জনগণের পাওনা জনগণকে দিতেই হবে।’

‘অনেকে বলে চার বছর বিএনপি সংসদের বাইরে। বিএনপি দুর্বল। আমি তাদের বলতে চাই, সংসদের সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক কোনো সম্পর্ক নেই।’

তবে আওয়ামী লীগে হতাশা আছে বলেও মনে করে এই বিষয়টিও ক্ষমতাসীন দলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন গয়েশ^র। বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে সাধারণত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সংখ্যা কমে আসে। কারণ গুটি কয়েক কর্মী সুবিধা নেয়, বাকি কর্মীরা বঞ্চিত হয়। সুতরাং তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বেশি। আর এটা কাজে লাগাবো আমরা।’

বিএনপি নির্বাচন ঠেকাতে পারবে, বিশ্বাস করে না আওয়ামী লীগ

তবে বিএনপি নেতাদের এসব কথাকে হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলছেন, বিএনপি বিরোধীদল ছাড়া নির্বাচন করেছিল, টিকে থাকতে পারেনি। জাতীয় পার্টিও একতরফা নির্বাচন করে গণআন্দোলনের মুখে ঢলে পড়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধীদল ছাড়া নির্বাচন করে টিকে আছে। এ থেকে বোঝা যায়, অন্য দলগুলোর চেয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি অনেক বেশি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চাইলে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে। অতীতেও করেছে। আর যাই হোক মানুষ তো এখন বোকা নয় যে, বিএনপি বলল আর তারা জ¦ালাও পোড়াও করতে রাস্তায় নেমে গেল। তিনি বলেন, ‘নতুন বছরে একটি ভালো ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে বিশ্বাস করি। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। ওই সময় যেন দেশের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকে এই প্রত্যাশাই করব।’

‘বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়ে যাবে, সরকারের ও নির্বাচন কমিশনের সেই প্রস্তুতি রয়েছে। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে দেরি করার সুযোগ নেই।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। বিএনপি না এলেও যথাসময়ে নির্বাচন হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে, শেখ হাসিনার অধীনে নয়।’- ঢাকাটাইমস