চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮

মান্না ও সালওয়া

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৩ ১০:৪৫:৩৯ || আপডেট: ২০১৮-০১-১৩ ১০:৪৬:০১

ফজলুর রহমান

ছোটবেলার মস্তিষ্ক বিশেষ ধাঁচে গড়া থাকে। যেন তা নরম কাঁদামাটির মত। কাঁদামাটিকে যেমন ইচ্ছা তেমন করে যেমন পুতল বানানো যায় মস্তিষ্কও থাকে ঠিক তেমনি। যেভাবে মাথার নিউরণে বীজের অনুরণণ ঘটে সেভাবে পরে তা ফুলে-ফলে বিকাশ হয়। এজন্য এ বয়সটাকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয় উন্নত দেশগুলো। ঠিক সে বয়সে পড়া একটি গল্প ছিল। এটি কেবল গল্প নয়। গল্পচ্ছলে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল এক বড় কর্মদীক্ষা।

গল্পটি মহানবী (সা:) ও এক ভিক্ষুককে নিয়ে। অনেকের জানা গল্পটি হলো-এক সুঠাশ দেহের লোক এসে কিছু খাবার ভিক্ষা চাইলেন মহানবী (সা:) এর সম্মুখে। মহানবী (সা:) তাকে দেখলেন। তার কাজ করার শক্তি-সামর্থ্য আছে। এবার লোকটিকে বললেন কেন খাবার ভিক্ষা করছ, এটা তো মর্যাদার কিছু নয়। তোমার বাড়িতে কি আছে? লোকটি বলল, খাবার কেনার জন্য কোন পয়সা নেই, কেবল একটি কম্বল আছে। মহানবী (সা:) বললেন, তোমার কম্বলটি নিয়ে এসো। এরপর কম্বলটি নিয়ে এলে মহানবী (সা:) সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আছো, যে এই কম্বলটি কিনবে? একজন হাত উঠালে তাকে বিক্রি করা হলো। এবার বিক্রির টাকা ওই অভাবী লোকটিকে দিয়ে মহানবী (সা:) বললেন, ‘‘এর অর্ধেক টাকায় খাবার কিনবে বাকি অর্ধেক টাকায় একটি কুড়াল কিনবে। তুমি তো কাজ করে রোজগারের অবস্থায় আছো, কুঠার কিনে কাঠ চেলাই করে বিক্রি করো। এতে যে টাকা আসবে তাতে সচ্ছলতাও আসবে, নিজের টাকায় জীবন চলার আনন্দও আসবে।’’ এই জীবন দর্শন মেনে লোকটি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেয় এবং জীবনতৃপ্তিও পান। এখানে মহানবী (সা:) থেকে বড় শিক্ষা পাই আমরা সকলে। কাজ করে রোজগারের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনই শ্রেষ্ঠ। কর্মবিমুখতা ও অপরের দিকে হাত পেতে চলা অত্যন্ত অমর্যাদাকর। বিশ্বনবী (সা:)র সেই অনন্য দর্শনটি এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল-“Do not beg. Begging is not good at all.”

ইসলামের কালজয়ী দর্শন শুধু পারলৌকিক জীবনকেই সুন্দর করার জন্য বলে না, ইহলৌকিক জীবনকেও করে অমলিন। সর্বকালের সেরা অর্থনীতিবিদ হজরত মুহাম্মদ (সা.) ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় স্তরেই গ্রহণ করেছেন নানা উদ্যোগ। ব্যক্তিগত জীবনে স্বনির্ভরতার জন্য প্রত্যেককে উদ্যোগী হওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন। আবার যারা আয়-রোজগারে অক্ষম তাদের দেখভালের দায়িত্বও দিয়েছেন সচ্ছলদের ওপর। স্বাবলম্বনের পথ ছেড়ে পরাশ্রয়ী হওয়া তিনি কখনো পছন্দ করেননি।

নিজ হাতে উপার্জনই মহানবীর (সা.) পরম শিক্ষা। হজরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহকে (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি? জবাবে তিনি বলেন, ব্যক্তির নিজস্ব শ্রমলব্ধ উপার্জন ও সততার ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়। (মুসনাদে আহমাদ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারও নিজ পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে বিক্রি করা কারও কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। তাকে (প্রার্থীকে) সে কিছু দিক বা না দিক। ’ (বুখারি, মুসলিম)।

আল্লাহতায়ালা মানুষকে নামাজ আদায়ে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি উপার্জনচিন্তা বাদ দিয়ে অলসভাবে মসজিদে বসে না থেকে নামাজ সমাপনান্তেই জীবিকার সন্ধানে বের হতেও নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা জুমার ১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো। ’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ কুরতুবি (র.) আল জামে লিআহকামিল কোরআনে লিখেছেন, ‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যাবে তখন তোমরা ব্যবসায়িক কাজকর্ম ও অন্যান্য পার্থিব প্রয়োজনাদি পূরণে বেরিয়ে পড়। ’ তাই রিজিকের সন্ধান করা, স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় ব্রতী হওয়া নিশ্চয়ই দুনিয়াদারি নয়, নয় ঐচ্ছিকও বরং তা ফরজ। যারা এ ফরজ পালনে কর্মের পথ অবলম্বন করে সন্ধ্যায় পরিশ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। একটি হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি শ্রমের কারণে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যা যাপন করে সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েই তার সন্ধ্যা অতিবাহিত করে। ’ (তাবারানি; ইসলামে শ্রমিকের অধিকার, পৃষ্ঠা-২)। হালাল উপার্জনের জন্য বের হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করা যায়। তাই তো মহানবী (সা.) হালাল উপার্জনের জন্য বের হওয়া লোকটির জন্য আল্লাহর পথে জিহাদে থাকা লোকের সমান সওয়াবের ঘোষণা করেছেন। হজরত কাব ইবনে আজুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ দিয়ে এক লোক যাচ্ছিল। সাহাবায়ে কিরাম লোকটির শক্তি, স্বাস্থ্য দেখে বললেন, হে আল্লাহর রসুল! এই লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) থাকত! নবী (সা.) বললেন, লোকটি যদি তার বৃদ্ধ পিতামাতা অথবা ছোট ছোট সন্তানের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তায়ই আছে (অর্থাৎ হাত না পেতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করলে সে জিহাদের সওয়াবই পাবে)। (হাইসামি : ৪/৩২৫)। ব্যবসা, শ্রম বিক্রি কিংবা দাওয়াতি কাজ যাই হোক; হোক ঘরে কি বাইরে, সারা জীবনই মহানবী (সা.) থাকতেন কর্মব্যস্ত। কিশোর বয়সেও তিনি বেকার বসে থেকে চাচার সংসারে বোঝা হননি। কৈশোরে চরিয়েছেন মেষ, যৌবনে দেশ থেকে দেশান্তর সফর করে অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও রেখেছেন সফল ব্যবসায়ীর বিরল কৃতিত্বের স্বাক্ষর।

হজরত মুসা (আ.)-এর জাতি ছিল অত্যন্ত দুষ্টু স্বভাবের। তারা আল্লাহ তাআলার কথা মানত না। আল্লাহ তাআলা যখন হজরত মুসা (আ.)-কে আমালেকা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন, তখন তিনি বনি ইসরাইলের ১২ গোত্রের ১২ জন নেতাকে আমালেকা সম্প্রদায়ের রণাঙ্গনের অবস্থা দেখার জন্য প্রেরণ করেন। বায়তুল মাকদাসের অদূরে শহরের বাইরে আমালেকা সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাদের দেখা হয়। সে একাই ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বাদশাহর কাছে নিয়ে গিয়ে বলে, এরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। রাজদরবারে নানা পরামর্শের পর তাদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, যাতে তারা স্বজাতির কাছে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমালেকা জাতির শৌর্য-বীর্যের কথা বর্ণনা করতে পারে। ফলে আক্রমণ করা তো দূরের কথা, এদের দিকে মুখ করার দুঃসাহসও না দেখায়।

বনি ইসরাইলের ১২ জন সর্দার আমালেকা গোত্রের কয়েদখানা থেকে মুক্ত হয়ে ইউশা বিন নুন ও কালিব বিন ইউকান্না ছাড়া অন্যরা সবাই স্বজাতির কাছে সব বলে দেয়, অথচ তাদের সব কথা মুসা (আ.)-এর কাছে বলতে বলেছিলেন। তারা মুসা (আ.)-কে গিয়ে বলল, ‘আপনি ও আপনার পালনকর্তা যান ও উভয়ে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানে বসলাম।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২৪) আল্লাহ তাআলা তাদের এ উক্তির ফলে অসন্তুষ্ট হয়ে ময়দানে ‘তিহ’ (সিনাই উপত্যকায়) যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেই স্থানটি ছিল উদ্ভিদ, বৃক্ষলতা ও পানিবিহীন এক শুষ্ক মরুভূমি। তারা ‘তিহ’ ময়দানে একত্রিত হয়ে আবেদন করে। হে মুসা! সেখানে আমাদের আহারের ব্যবস্থা কিভাবে হবে? তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য মান্না ও সালওয়া নামের আসমানি খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমাদের জন্য মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৭)।

মান্না হলো এমন খাদ্য, যা রাতে কুয়াশার মতো পড়ে জমে যেত ও সুস্বাদু খাদ্যে পরিণত হতো। কারো কারো মতে, মান্না হলো ডুমুর। কারো কারো মতে, আঠালো সুমিষ্ট বস্তু। কারো মতে মধু, কারো মতে সুমিষ্ট পানীয়। কারো মতে, পাতলা রুটি। সালওয়া ছিল এক ধরনের পাখি, যা সূর্যাস্তের পর ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ধরা দিত। তারা এদের গোশত ভক্ষণ করত।

তবে এ খাবার আসা বন্ধ হয়। কেন জানেন? ইহুদিদের আসমানি খাদ্য জমা করে রাখতে নিষেধ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা জমা করে রাখত। আবার একসময় তারা মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাকার খাবার দেওয়ার জন্য দাবি জানায়। এতে তারা বিনা পরিশ্রমের আসমানি খাদ্য হারায় ও আল্লাহর শাস্তির উপযোগী হয়।

এখন সেই বর্ণিত ইহুদীরাও পাল্টেছেন। আর মান্না ও সালওয়ারের আশায় না থেকে কঠোর পরিশ্রম ও জ্ঞানলব্ধ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে বিশ্বে ব্যাপক প্রভাবশালী হিসেবে আর্বিভূত। উন্নত বিশ্বের আজ ক্রমাগত অগ্রগতির মূলেও একই বিষয়। কাজকে ইবাদত তূল্য করে ভাগ্যে পরিবর্তন করেছে পাশ্চাত্যে। যার নমুনা এখনো দেখা যায় উন্নত দেশে গেলে। অথবা ওরকম দেশের কেউ এদেশে এলে। কারো জন্য অপেক্ষা না করে, কোন কাজ ফেলে না রেখে কাজটি নিজে সেরা ফেলাটাই ওদের জন্য বড় মর্যাদার বিষয়। এ বিষয়ে পিছিয়ে আছি আমরা। তাই বলতে হয়, বিনা পরিশ্রমের মান্না ও সালওয়ার পাওয়ার আশায় না থেকে তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভাগ্য উন্নয়ন করাটাই হবে উত্তমতম কাজ। এ কাজে ¯্রষ্টার সন্তুষ্টির সাথে সাথে সৃষ্টি জগতও উপকৃত হয়। এ পথে চলতে পারলেই মধ্যম আয়ের যাত্রা মসৃন হবে। এভাবেই উন্নত দেশ হিসেবে আর্বিভাবের আবেশ আসবে।

লেখক:  সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।