চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮

সাবেক এমপি ইউসুফ মারাত্মক সেফটিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৮ ২৩:২৫:২৪ || আপডেট: ২০১৮-০১-০৯ ১১:৩৮:১৬

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফ মারাত্মক সেফটিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিমের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন সোমবার সকালে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সাবেক এমপি ইউসুফ স্ট্রোকের রোগী। তিনি এখন প্রায় অবচেতন। মারাত্মক সেফটিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাবেক এই এমপির দুরবস্থার কথা জেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার তার যাবতীয় চিকিৎসার ভার নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামের মরিয়মনগর ইউনিয়নের পূর্ব সৈয়দবাড়ি এলাকায় রাঙ্গুনিয়া কলেজ রোড সংলগ্ন ছোট ভাইয়ের বাড়ি থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় তাকে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তির যাবতীয় কাজ শুরু হয়। হাসপাতালের চতুর্থ তলায় আইসিইউতে ভর্তির পর তার চিকিৎসা শুরু করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. অশোক কুমার দত্তের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম ইউসুফের চিকিৎসা শুরু করেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সাবেক এই সংসদ সদস্য মারাত্মক সেফটিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফের সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন। সব ধরনের খরচ সরকার বহন করবে। তার বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুখ আছে। আগে তিনি ব্রেইন স্ট্রোক করেছিলেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিমের অধীনে তার চিকিৎসা চলছে। প্রয়োজনে তাকে ঢাকায় নেয়া হবে।

ইউসুফের ছোট ভাই সেকান্দর জানান, ২০০৭ সালে মোহাম্মদ ইউসুফ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সে সময় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল ও উপশম হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টায় মোহাম্মদ ইউসুফ প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু একটি মাত্র অপারেশনের অভাবে তার ডান হাত অবশ হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলেন কথা বলার শক্তি। ফুলে যায় শরীর। তবে, তার স্মৃতিশক্তি এখনো প্রখর।

তিনি বলেন, রোগাক্রান্ত হওয়ার পর সদ্য প্রয়াত চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ জেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অনেকেই মোহাম্মদ ইউসুফকে দেখতে চমেক হাসপাতালে যান। নির্বাচনের পূর্বে সংসদ সদস্য প্রার্থীদের অনেকে বাড়িতে আসেন মৃত্যুপথযাত্রী ইউসুফের দোয়া নিতে। কেউ কেউ ১-২ হাজার টাকা সাহায্যও করেছেন। কিন্তু তার অপারেশন কিংবা স্থায়ী চিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।

ইউসুফের এই করুণ পরিণতির একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে। এরপর চন্দ্রঘোনা ক্রিশ্চিয়ান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করেন। এতে কিছুটা উন্নতির পর তাকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থাভাবে সেটা আর হয়নি।

ফলে পরবর্তীতে শরীরের অবস্থার অবনতি ঘটে তার। সেই থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রোগের যন্ত্রণা ভোগ করছেন ইউসুফ। হাঁটাচলা করেন অন্যের ওপর ভর দিয়ে। কাপড় চোপড়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেন প্রায় সময়। অভাবে খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে বেঁচে আছেন তিনি।

কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলা সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফের সাথে রবিবার দুপুরে কথা হয়। এ সময় নিজের চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের খবর পেয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসান তিনি। ভাঙা-ভাঙা শব্দে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে রাঙ্গুনিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন মোহাম্মদ ইউসুফ। এ সময় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত অনেকেই তার পাশে ছিলেন। তাকে ঘিরে থাকত জেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। যারা তাকে পুঁজি করে অনেক ফায়দা লুটেছেন। তদবির করে বদলে নিয়েছেন নিজেদের ভাগ্য। অথচ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে কিছুই করেননি ইউসুফ। দেশের কোথাও তার নামে নেই একখণ্ড জমি। নেই দালান কোটা। নেই ব্যাংক হিসাব। যার কারণে সংসদ থেকে সরাসরি মায়ের পেটের ভাইয়ের কুঁড়ে ঘরে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে।

মোহাম্মদ ইউসুফ ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগর ইউনিয়নের সওদাগর পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন একজন কৃষক ছিলেন। মা মাসুমা বেগম ছিলেন গৃহীনি। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করার পর ঘর ছাড়েন মোহাম্মদ ইউসুফ। রাঙ্গুনিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করেন। যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। ছাত্র ইউনিয়নের হয়ে মোহাম্মদ ইউসুফ একাধিকবার রাঙ্গুনিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী পাশ করে কর্ণফুলী পাটকলের করণিক পদে চাকুরি লাভ করেন। সেখানে তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতি শুরু করেন। শ্রমিক নেতা হিসেবে তিনি শ্রমিকের ভোটে কর্ণফুলী পাটকলে একাধিকবার সিবিএর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৯০’র এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর ৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ করেন তিনি। এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সংসদ থেকে ফিরে এসে রাঙ্গুনিয়ার বহুদলে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তিনি। মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি এতটাই জড়িয়ে পড়েন যে সংসার জীবন গড়ে তোলার কথাও ভুলে যান। এমনকি নিজের শরীরের যত্ন পর্যন্ত নেননি। ফলে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।