চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

ওরা ১১ জন, চট্টগ্রামে ডিবি পরিচয়ে যেভাবে ডাকাতি করেন!

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৩ ২১:৩৯:৩২ || আপডেট: ২০১৮-০১-০৩ ২১:৪৮:২৩

তাঁরা ১১ জন।গোয়েন্দা পুলিশের বেশে ছিনতাই-ডাকাতি করে বেড়ায়। পোশাক, চুল কাটার স্টাইলও পুলিশের মতো। সংঘবদ্ধ এই অপরাধী গ্রুপে আছে একজন সাবেক জনপ্রতিনিধিও।  এছাড়া গ্রুপের সবাই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত।  প্রত্যেকের নামেই বিভিন্ন থানায় মামলা আছে।e

এদের কোমরে পিস্তল ও হাতকড়া। পকেটে ওয়াকিটকি। গায়ে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জ্যাকেট।দলনেতাকে প্রত্যেকে এমনভাবে স্যার বলে সম্বোধন করেন, যেন তিনি উচ্চপদস্থ পুলিশ কমকর্তা।

দেখে কারও চেনার উপায় নেই এরা ভুয়া। চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ কয়েকটি স্থানে তাঁরা ঘুরে বেড়ান। কেউ ব্যাংক থেকে টাকা তুললে পুলিশ পরিচয় দিয়ে টাকার উৎস জানতে চান। একপর্যায়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। গন্তব্য ডিবি কার্যালয় নয়। নির্জন কোনো স্থান নিয়ে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন।

মঙ্গলবার (০২ জানুয়ারি) রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করতে সক্ষম হয় নগর গোয়েন্দা ‍পুলিশ।  প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে অপরাধের কৌশল সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে ডাকাতির ব্যবহৃত একটি অটোরিকশা, দুটি মোটরসাইকেল, একটি ওয়াকিটকি, এক জোড়া হাতকড়া, দুটি জ্যাকেট, একটি খেলনা পিস্তল, ছিনতাই করা দুটি মুঠোফোন এবং সাড়ে ৩২ হাজার টাকা।

গ্রেপ্তার ১১ জন হলেন কাইছার হামিদ (৩১), মামুন উদ্দিন (৩৫), হারাধন দাশ (৩৭), জাহেদুল আজম (৩৫), মো. শাহেদ রানা (৩১), শওকত আলী (৩২), সেলিম মাহমুদ (৪৪), রেজাউল করিম (৫১), মো. রুবেল (৩০), জাসেদুল করিম (৩৫) ও মো. মাসুদ (২৮)। এঁদের মধে৵ সেলিম জেলার রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান আজ বুধবার দুপুরে বলেন, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের স্নাতক সম্মান শ্রেণির ছাত্র ইমতিয়াজ উদ্দিনকে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর নগরের লাভলেন এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে নামানো হয়। এরপর ডিবি পুলিশ পরিচয় দেওয়া কয়েকজন তাঁকে তল্লাশি করে। ইমতিয়াজ তাঁর মামার পাঠানো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাসায় ফিরছিলেন। একপর্যায়ে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় করে নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে নেওয়া হয়। টাকা ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে গোয়েন্দা পুলিশ মাঠে নামে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান আরও বলেন, গ্রেপ্তার ১১ জন এ পর্যন্ত সাত-আটটি এভাবে ডাকাতি করার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা এক বছর ধরে এই কাজ করে আসছেন। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কাউকে হয়রানি করলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জানানোর জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ইলিয়াছ খান বলেন, গ্রেপ্তার ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আদালতে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী বলেন, বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমান ওই ১১ জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত আগামী রোববার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

যে ভাবে সন্ধান মিলে এদের 

গত ২ জানুয়ারি ইমন নামে এক কলেজছাত্রের মামলার সূত্র ধরে পুলিশ অভিযানে নামে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা শওকত আলী।

তিনি বলেন, ইমন গত ২৮ ডিসেম্বর প্রবাসী মামার পাঠানো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাসে উঠেছিলেন। গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ইমনকে বাস থেকে জোর করে নামিয়ে অটোরিকশায় তুলে নেয় তিনজন।

“ইমনের কাছে ইয়াবা আছে এমন অভিযোগ করে তারা তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পলোগ্রাউন্ড এলাকায় পৌঁছে তারা ব্যাগ থেকে এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা কেড়ে ছিনিয়ে নেয়। অটোরিকশাটি কদমতলী-দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারে ওঠার পর ইমনকে তারা মারধর করে গাড়ি থেকে ফেলে চলে যায় বলে ইমনের অভিযোগ। এ সময় ইমন অটোরিকশার নম্বর মুখস্থ করে রাখেন।”

এ ঘটনায় ২ জানুয়ারি নগরীর কোতোয়ালি থানায় ইমন একটি মামলা করেন জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার পর গোয়েন্দা ‍পুলিশ অটোরিকশার সূত্র ধরে অভিযানে নামে।

আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা শওকত বলেন, তারা নগরীর বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আশপাশে অবস্থান নিয়ে সেখানে আসা লোকজনের গতিবধি লক্ষ করে।

“কয়েকজন ব্যাংকের আশপাশে থেকে টার্গেট নির্ধারণ করে দলের অন্য সদস্যদের জানায়। পরে তারা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেয়। সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে সব কেড়ে নিয়ে দ্রুত চলে যায়। আটককৃতরা এ ধরনের অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।”

আটককৃতদের মধ্যে মামুন উদ্দিনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানায় হত্যাসহ ‘কয়েকটি’ মামলা রয়েছে বলে জানালেও অন্যদের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ।

আটক কায়ছার হামিদ রাজু এই দলের নেতৃত্ব দিতেন জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা শওকত বলেন, কায়সার নগরীর এনায়েত বাজার বাটালি রোড এলাকার আব্দুল মালেকের ছেলে।

ডাকাতির পর তারা সবাই নগরীতে নিজেদের বাসাতেই বসবাস করতেন বলে

নগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (উত্তর) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের আর কোনো চক্র সক্রিয় আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিবি লেখা জ্যাকেট ও সরঞ্জাম তারা কিভাবে পেল সে বিষয়েও তদন্ত করা হবে।”