চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

চট্টগ্রাম ওয়াসা: ব্যাংকের সীল স্বাক্ষর নকল করে ডিমান্ড নোট জালিয়াতি

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০১ ২১:৪৫:৫০ || আপডেট: ২০১৮-০১-০১ ২১:৫০:১৪

মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিটিজি টাইমস

উন্নয়নের গণতন্ত্র, শেখ হাসিনার মূলমন্ত্র। এই স্লোগান রয়েছে ওয়াসার ডিমান্ড নোটের একপাশে। অপর পাশে রয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার লগো। শুরুতে রয়েছে স্বারক নং দিয়ে গ্রাহকের ঠিকানা। এর পরেই বিভিন্ন খাতে গ্রাহক থেকে ওয়াসার পক্ষ থেকে নতুন পানির সংযোগ বাবদ গ্রাহক থেকে নেয়া ধারাবাহিক টাকার বিবরণ। নীচের ডান পাশে রয়েছে অনুমোদনকারী নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর এবং বাম পাশে রয়েছে টাকা গ্রহণকারী ব্যাংকের সীলসহ কর্মকর্তারা স্বাক্ষর।

চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন পানি সংযোগের ডিমান্ড নোটের কপি দেখে যে কেউ বলবেন ডিমান্ড নোটটি জাল না হয়ে অবশ্যই সঠিক। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পুরো কাগজটাই ভেজালে ভরা।
ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, কর্মচারীদের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লেও অলিখিত কারণে হউক কিংবা কর্তৃপক্ষের নজরে গোচরীভূত না হবার কারণে এতো দিন এইসব নানা অপকর্ম দৃশ্যমান হয়নি। অতীতে নানা অপরাধ করে ও শ্রমিক নেতাদের চাপে কিংবা অলিখিত কারণে লঘু শাস্তি পেয়ে পার পেয়ে গেছেন অনেকে এমন অভিযোগ রয়েছে ওয়াসাতে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর ষোলশহর এলাকার হুমায়ুন কবির ওয়াসার নতুন পানির লাইনের সংযোগ নিতে দারস্ত হন তার পূর্ব পরিচিত ইফতেখার রুপুর সাথে। মৌখিক চুক্তি হয় ৩৬ হাজার টাকা। কথা মতো তিনি নগদ টাকা প্রদান করেন রুপুকে। তিনি নগরীর লাভ লেইন এলাকার ওয়াসার সহকারী পাম্প অপারেটর। গত বছর আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি ওয়াসায় নিয়োগ পান।

ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ের বিক্রয় বিভাগের উচ্চমান সহকারী খুরশিদ আলমের সাথে যোগাযোগ করে উক্ত টাকা প্রদান করেন ইফতেখার রুপু।

নির্ধারিত সময় গড়িয়ে গেলেও মো. হুমায়ুন কবিরের চাপে পড়ে ইফতেখার রুপু সংযোগ অতি সত্তর হচ্ছে এবং ডিমান্ড নোটের টাকা ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে জানালে এর প্রমাণস্বরুপ ১৬ হাজার ৫২৫ টাকার ডিমান্ড নোটের ফটোকপি দেয়া হয়।

এতে করে হুমায়ুন কবিরের সন্দেহ হলে জনতা ব্যাংক ওয়াসা শাখায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন এটি ভূয়া। আসলে এই ডিমান্ড নোটের বিপরীতে কোন টাকাই ব্যাংকে জমা হয় নি।

অর্থ্যাৎ ব্যাংক কর্মকর্তার স্বাক্ষর সীল সবই জাল। উক্ত ডিমান্ড নোটের নীচে স্বাক্ষরকারী হিসেবে রয়েছেন মর্ড ১ নিবাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের স্বাক্ষর।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিক্রয় বিভাগের এক কর্মকর্তা সিটিজি টাইমসকে জানান, ‘পাচলাইশ এলাকার সংযোগ দেয়া হয় প্রধান কার্যালয়ের বিক্রয় বিভাগ হতে। নিয়ম অনুযায়ী এখানকার কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকার কথা। কিন্তু মো. হুমায়ুন কবিরের ডিমান্ড নোটে স্বাক্ষর রয়েছে আগ্রাবাদ এলাকার মর্ড ১ এর দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনের।’

ওয়াসার সুত্র জানা যায়, মো. হুমায়ুন কবির এই ব্যাপারে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিলে দুর্নীতিবাজদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে ইফতেখার রুপু ও প্রধান কার্যালয়ের বিক্রয় বিভাগের উচ্চমান সহকারী খোরশেদ আলম তাদের অপরাধ স্বীকার করে মো. হুমায়ুন কবিরকে প্রদেয় টাকা ফেরত দেন।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে খোরশেদ আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সিটিজি টাইমসকে বলেন, ‘আমি এই অপকর্মে জড়িত নই। প্রকৃত ঘটনাটি হচ্ছে আমি ইফতেখার রুপুকে গ্রাহকের মূল ডিমান্ড নোটই দিয়েছিলাম। সে ইচ্ছে করেই মূল ডিমান্ড নোটের উপরি অংশ মূলটি রেখে আগ্রাবাদের অন্য গ্রাহকের ডিমান্ড নোটের নীচের অংশ স্কেনিং করে ফটোকপি করে গ্রাহককে দিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের আমি সাংগঠনিক সম্পাদক। এছাড়া ও দুদকের মামলায় কারা অন্তরীণ তাজুল ইসলামের সাথে আমার ঘনিষ্ট সর্ম্পক ও আমার জনপ্রিয়তা থাকায় ইর্শান্বিত হয়ে চক্রান্ত করে আমাকে ফাসানো হয়েছে’।

ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) বিশ্বজিৎ ভট্রাচার্য্য বলেন, ‘খোরশেদকে ওএসডি করে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপর অভিযুক্ত আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিযুক্ত সহকারী পাম্প অপারেটর ইফতেখার রুপুকে বহিস্কার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘বিক্রয় বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রতি মাসে ১ বার ব্যাংকে ঠিকভাবে টাকা জমা হয়েছে কিনা তা তদারকি করার। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যা করার তা করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন ডিএমডি বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য্য।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ সিটিজি টাইমসকে বলেন, ‘দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। খোরশেদসহ যারা আইন বহির্ভূত কাজে লিপ্ত, তাদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ব্যক্তি স্বার্থে কেউ যদি ওয়াসাকে ব্যবহার করে দুর্নীতি কিংবা কোন অন্যায় করে, তাকে রেহাই দেয়া হবে না। অবশ্যই অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা হবে। কারো কলঙ্কের ভার কখনো ওয়াসা নেবে না বলে জানিয়ে দেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ,কে,এম ফজলুল্লাহ।